রবিবার, ২৯ অক্টোবর, ২০১৭

বাংলাদেশে জন্ম নেওয়া এক জ্যোতির্বিজ্ঞানী ।

বাংলাদেশে (তৎকালিন পূর্ব বঙ্গে) জন্ম নেয়া এমন এক জ্যোতির্বিজ্ঞানী যিনি বিশ্বব্যাপী স্বীকৃৃতি পাওয়ার পরও আমাদের অনেকের কাছে অপরিচিত। তিনি দেখিয়ে গিয়েছেন সামাজিক প্রতিকূলতা ও পিছিয়ে পড়া অবস্থা থেকেও কি করে বিশ্ব মানের গবেষণা করা যায় শুধুমাত্র আগ্রহ, নিষ্ঠা ও একাগ্রতা থাকলে। এই বিজ্ঞানীর নাম রাধাগোবিন্দ চন্দ্র। তিনি ভারতবর্ষের পর্যবেক্ষণমূলক জ্যোতির্বিজ্ঞানের পথ নির্দেশক। ১৮৭৮ সালের ১৬ জুলাই যশোর জেলার সদর উপজেলার বকচর গ্রামে এক দরিদ্র পরিবারে তাঁর জন্ম। ৬ষ্ঠ শ্রেণীতে পড়াকালীন অক্ষয়কুমার দত্তের লেখা ‘ব্রহ্মান্ড কী প্রকান্ড’ পড়ে তিনি জ্যোতির্বিজ্ঞান চর্চার প্রতি আকৃষ্ট হন। এই আকর্ষণ তাঁর এতটাই তীব্র হয় যে তিনি স্কুলের পাঠের প্রতি অমনযোগী হয়ে পড়েন। তিনি যশোর জিলা স্কুলের ছাত্র ছিলেন। কিন্তু তিন বারের চেষ্টাতেও তিনি প্রবেশিকা বা এন্ট্রান্স পরীক্ষায় পাশ করতে পারেননি। শেষবার পরীক্ষা দেন ২৩ বছর বয়সে, কিন্তু অকৃতকার্য হয়ে পরীক্ষায় ইস্তফা দেন। ২ বছর পর যশোর কালেক্টরেট অফিসে খাজাঞ্চির চাকরি নেন। প্রমোশন পেয়ে পরবর্তীতে ট্র্যাজারী ক্লার্ক এবং চাকরী জীবনের শেষ পর্যায়ে কোষাধ্যক্ষের পদ পান।
১০ বছর বয়স থেকে তিনি আকাশ পর্যবেক্ষণ শুরু করেন। কিন্তু সঠিক জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক শিক্ষা না থাকায় শুরুতে অসুবিধা হলেও ১৪ বছর বয়সেই তিনি আকাশের তারা চেনার বিষয়ে সিদ্ধ হয়ে উঠেন। ১৯১০ সালে আকাশে হ্যালির ধূমকেতু দেখা গেলে রাধাগোবিন্দ প্রথমে খালি চোখে ও পরে দূরবীন দিয়ে পর্যবেক্ষণ করে একাধিক প্রবন্ধ লিখেন। এই লেখায় নিখুঁত পর্যবেক্ষণ, বর্ণনা ও বিশ্লেষণের ক্ষমতা অনেকের নজরে আসে। ১৯১২ সালে নিজের অল্প মাইনের চাকরি থেকে টাকা বাঁচিয়ে এবং জমি বিক্রি করে তিনি বিলাত থেকে ৩ ইঞ্চি ব্যাসের একটি দূরবীন সংগ্রহ করেন। এই দূরবীন দিয়ে তিনি নিয়মিত আকাশ পর্যবেক্ষণ করতেন। ১৯১৮ সালের ৭ জুন তিনি আকাশে একটি উজ্জ্বল তারা দেখতে পান যা তারার মানচিত্রে ছিলনা। তিনি এই পর্যবেক্ষণের কথা হার্ভার্ড মানমন্দিরে জানান এবং এভাবেই নোভা অ্যাকুইলা-৩ আবিষ্কৃত হয়। ১৯১৯ সাল থেকে ১৯৫৪ সালের মধ্যে তিনি মোট ৩৭,২১৫টি বিষম বা পরিবর্তনশীল বা Variable তারা পর্বেক্ষণ করেন এবং এই তথ্য আভসো (AAVSO- American Association Variable Star Observer)-কে প্রদান করেন। বিষম তারা কি? আমরা যখন আকাশ দেখি তখন তারাদের মিটিমিটি করতে দেখি। এটা হয় আমাদের বায়ুমন্ডলের জন্য। বায়ুমন্ডলের বাধায় তারার আলো সরাসরি নিরবিচ্ছিন্নভাবে আসেনা বিধায় এই মিটিমিটি দেখা। কিন্তু বায়ুমন্ডলের কারণে এই মিটিমিটি দেখা উপেক্ষা করলে নিজ কারণেই অনেক তারার আলো ধারাবাহিকভাবে পরিবর্তিত হয়। এদের বিষম/পরিবর্তনশীল/Variable তারা বলে। এরা দুই ধরণের। যাদের আকার ও তাপমাত্রার পরিবর্তনের কারণে আলোর তীব্রতার পরিবর্তন হয় তাদের Cepheid Variable Star বলে। আবার যুগল তারা (Binary Star) আরেক প্রকারের বিষম তারা। এই তারাগুলি ঘুরবার সময় একটি আরেকটির আড়ালে চলে যায়, আবার ফিরে আসে। ফলে আমরা দেখি উভয় তারার উজ্জ্বলতার কম-বেশি হয়। এই যুগল তারাদের Eclipsing Variable Star বলে। বিজ্ঞানী রাধাগোবিন্দ চন্দ্রের পর্যবেক্ষণ এতো নিখুঁত ছিলো যে তা সেসময় বিষম তারার শ্রেণীবিভাগ তৈরীতে সহযোগীতা করেছিল। তাঁর পর্যবেক্ষণলব্ধ তথ্য নিয়মিত ব্যবহার হতো নানান জ্যোতির্বিজ্ঞান বিষয়ক রিপোর্ট ও জার্নালে।
১৯২৬ সালে হার্ভার্ড মানমন্দির থেকে তাঁকে একটি ৬ ইঞ্চি ব্যাসের দূরবীন পাঠানো হয়। দূরবীনের সাথে মানমন্দিরের পরিচালক হ্যারল্ড শার্পলির লেখা একটি চিঠি, "বিদেশ থেকে পরিবর্বনশীল তারা সম্পর্কে আমরা যেসব তথ্য পেয়ে থাকি তার মধ্যে আপনার দান অন্যতম। আপনাকে আমার আন্তরিক শ্রদ্ধা জানাচ্ছি।"
তিনি আভসোর সম্মানসূচক সদস্যপদ লাভ করেন এবং ১৯৪৬ সালে এই সংস্থার সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ জ্যোতির্বিজ্ঞানী হিসাবে তালিকাভূক্ত হন। ১৯২৮ সালে তাঁর কাজের জন্য ফরাসি সরকার তাঁকে OARF (Officer d'Academic Republic Francis) পদক প্রদান করেন। এছাড়াও তিনি ব্রিটিশ এস্ট্রোনোমিকাল এসোসিয়েশন, আমেরিকান মেটেওর সোসাইটি, আমেরিকান মিউসিয়াম অব ন্যাচেরাল হিস্টোরী এবং ফ্রান্সের লিঁও অবজারভেটরী’র সম্মাননা ও সদস্যপদ লাভ করেন।
২০১৫ সালে একশ বছরের উল্লেখযোগ্য বিষম তারা পর্যবেক্ষকের তালিকা প্রকাশ করেছে আভসো। তালিকার মোট ৬৬ জনের মধ্যে তিনিই একমাত্র উপমহাদেশীয়।
বিষম তারা ছাড়াও তিনি বিভিন্ন গ্রহ, চন্দ্র ও সূর্য গ্রহণ, উল্কা ইত্যাদি সম্পর্কেও নিখুঁত পর্যবেক্ষণ তথ্য সংগ্রহ করেছেন।
জ্যোতির্বিজ্ঞান বিষয়ে রাধাগোবিন্দের ৪টি বই প্রকাশিত হয়, (১) ধূমকেতু, (২) সৌরজগৎ, (৩) সবিতা ও ধরণী, (৪) নক্ষত্রজগৎ। এর মধ্যে প্রথমটি ছাড়া বাকিগুলো তাঁর মৃত্যুর পর প্রকাশিত হয়। এছাড়াও তিনি দেশ-বিদেশের নানা বিখ্যাত জার্নালে লিখেছেন।
এতো সহজ-সরল, নির্বিবাদী, জ্ঞানসাধক মানুষটিকেও উপমহাদেশের দ্বি-জাতী তত্ত্বের রাজনীতির শিকার হতে হয়েছিলো। দেশ বিভাগের পর নিজ জন্মভূমি না ছাড়লেও ১৯৬০ সালে যশোর জেলা প্রশাসণ তাঁকে দেশ ছেড়ে ভারতে চলে যেতে বাধ্য করে। দেশ ছাড়ার সময় তারা তাঁর দূরবীণ নিতে দেয়নি। পরে আমেরিকা ও ফরাসী সরকারের চাপে তারা তাঁর দূরবীন ফিরিয়ে দেয়। ভারতেও তিনি তাঁর যথাযোগ্য মর্যাদা পাননি। ১৯৭৫ সালের ৩ এপ্রিল ৯৭ বছর বয়সে প্রায় বিনা চিকিৎসায় বারাসাতে মৃত্যুবরণ করেন। শেষ বয়সে তাঁর আর্থিক অনটন ছিলো।


EmoticonEmoticon