বুর্জোয়া নেতারা যেভাবে সর্বদা আত্মপ্রচারে মগ্ন থাকেন, বিশ্ব শ্রমিক শ্রেণির কালজয়ী দর্শন-মার্কসবাদ মেনে চলা একজন কমিউনিস্ট নেতার এদেশে সে সৌভাগ্য হয় না- যদিও দেশের পরিবর্তনকারী ঘটনায় তাদের ভূমিকা অসামান্য। নড়াইলের আফরা গ্রামে জন্ম নেয়া তেভাগা আন্দোলনের অগ্রপথিক, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ও বাংলাদেশ ওয়ার্কার্স পার্টির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি বিপ্লবী অগ্নিপুরুষ কমরেড অমল সেন তাদেরই একজন। জমিদার পিতা জিতেন্দ্রনাথ সেনের সন্তান হয়েও তিনি শ্রমজীবী মানুষের পক্ষে বিপ্লবী হয়েছেন। ব্রিটিশ শাসন, পাকিস্তান পিরিয়ড ও পরবর্তীতে স্বাধীন বাংলাদেশ- এ তিন কাল ধরে প্রতিটি ভিন্ন ভিন্ন সময়ে এদেশের রাজনীতি, সমাজ সম্পর্ক ও আন্দোলন-সংগ্রামে তিনি যে ভূমিকা রেখে গেছেন তা অল্প কথায় লিখে ব্যাখ্যা করা অসম্ভব।
★কমরেড অমল সেন বিপ্লবের দীক্ষা গ্রহণ করেন কৈশোর জীবনেই। নবম শ্রেণির ছাত্র থাকা অবস্থায় সম্পর্ক গড়ে তোলেন বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী সংগ্রামে যুক্ত হয়ে তিনি ‘অনুশীলন’ সমিতির সঙ্গে। ১৯৩৩ সনে খুলনার বিএল কলেজে ছাত্রাবস্থায় অবিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে যুক্ত হন এবং এ বছরের শেষভাগে নড়াইলের এগারখান অঞ্চলে তাঁকে কৃষক আন্দোলন গড়ার দায়িত্ব অর্পিত হয়। তিনি এই অঞ্চলের জমিদারদের বিরুদ্ধে কৃষক আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন। তাঁর নিজ পিতার জমিদারির বিরুদ্ধে কৃষক আন্দোলন তাকে আরো ব্যাপক পরিচিত করে তোলে।
★সম্পত্তির সামান্যতম লোভও তাঁকে স্পর্শ করেনি। পারিবারিক সূত্রে যে সম্পত্তির অধিকারী হয়েছিলেন তা তিনি গ্রহণ করেননি। নড়াইলে তাঁদের যে বিরাট দোতালা বাড়ি ও জায়গা জমি ছিল তার প্রায় সবই অন্যরা ভোগ করছে। এ নিয়ে তাঁর কোন চিন্তাভাবনা ছিল না। তাঁর পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা পশ্চিমবঙ্গে বাস করেন। সেখানে তাঁর মা অমল সেনের নামে এক টুকরা জমি রেখেছিলেন। মা’র মৃত্যুর পর তিনি কলকাতায় গিয়ে এ সম্পত্তিটিও অন্যদের নামে লিখে দিয়ে আসেন। তিনি মনে করতেন- ‘ব্যক্তিগত সম্পত্তির অধিকারী হবো অথবা সম্পদ বাড়ানোর চেষ্টা করবো অথচ কমিউনিস্ট থাকবো, এটা হতে পারে না।’
★এরপর সব ছেড়েছুঁড়ে যশোর-নড়াইলের সীমান্তবর্তী এগারোখানের বাকড়ী গ্রামের একেবারে গরিব কৃষক কমরেড রসিক ঘোষের বাড়িতে গিয়ে ওঠেন। কমরেড রসিক ঘোষের পরিবারই হয়ে উঠেছিল তাঁর পরম আত্মীয় এবং স্থায়ী ঠিকানা। এ প্রসঙ্গে কমরেড হায়দার আকবর খান রণো বলেছেন- ‘আমি নিজেও কমরেড অমল সেনের সঙ্গে কমরেড রসিক ঘোষের বাড়িতে গেছি এবং থেকেছি। দেখেছি নড়াইলের এগারখান অঞ্চলের গরিব ভূমিহীন শ্রমজীবিদের বাড়িতে থাকতেই তিনি তৃপ্তি ও আরাম বোধ করতেন। ঐ অঞ্চলের সবচেয়ে গরিব মানুষগুলো অমল সেনকে তাদেরই একজন মনে করতো”।
★শোষিত শ্রেণির ছেলেমেয়েরা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে স্কুলে পড়বে এই চিন্তা থেকে তিনি নড়াইলের বাকড়ী গ্রামে একটি স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। জমিদারদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে গরিব সন্তানদের জন্য স্কুল প্রতিষ্ঠা সেসময় শ্রেণি সংগ্রামেরই অংশ ছিল।
★তাঁর এ কর্মকান্ড পার্টি নেতাদের নজর কাড়ে। এক বছরের মধ্যে অর্থাৎ ১৯৩৪ সালে তিনি কমিউনিস্ট পার্টির সভ্যপদ অর্জন করেন। ঐ সময় এঘারোখানসহ নড়াইলের বিভিন্ন অঞ্চলে কৃষক আন্দোলন গড়ার গুরুদায়িত্ব তাঁর উপর অর্পন করা হয়। ‘হাটখোলা আন্দোলনে’ সক্রিয়ভাবে তিনি কৃষকের পাশে দাঁড়ান। এর পাশাপাশি মৎসজীবিদের সংগঠিত করে ‘মৎসজীবি সমিতি’ গঠন করেন।১৯৩৫ সনে অমল সেন তৎকালীন অবিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যপদ লাভ করেন।
★কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ কমিউনিস্ট পার্টি ১৯৩৭ সালে তাঁকে ‘যশোর-খুলনা আঞ্চলিক কমিটি’তে অন্তর্ভুক্ত করে। পরবর্তীতে ১৯৪২ সালে খুলনা-বরিশাল-যশোর অঞ্চলকে নিয়ে যে গেরিলা টিম গঠন করা হয় কমরেড অমল সেনকে সে টিমেরও সদস্য করা হয়। ১৯৪৪ সালে কমরেড হেমন্ত সরকারের গ্রাম বড়েনদারে এক রাজনৈতিক প্রশিক্ষণে কমরেড মোজাফ্ফর আহমদ এসেছিলেন। এখানেই উপমহাদেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা কমরেড মোজাফ্ফর আহমদের সান্নিধ্যে আসার সুযোগ হয় অমল সেনের।
★১৯৪৬ এর ঐতিহাসিক তেভাগা আন্দোলনের কিংবদন্তী পুরুষ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন সকলের ‘বাবুদা’ হিসেবে। ১৯৪৮ সনে তিনি কমিউনিস্ট পার্টির যশোর জেলা সম্পাদক নিযুক্ত হন। ১৯৪৭ সনে সদ্য ভারত-পাকিস্তান বিভক্তির পর পাকিস্তানী মুসলিম লীগ সরকারের রোষানলে পড়ে গ্রেফতার হন এবং ১৯৫৬ সন পর্যন্ত কারারুদ্ধ থাকেন। অবশেষে যুক্তফ্রন্ট সরকারের আমলে তিনি মুক্তি পান। ১৯৫৮ সালে সামরিক আইনজারির পর তিনি পুনরায় গ্রেফতার হন এবং ১৯৬৭ সালের ডিসেম্বর মাসে কারমুক্ত হন। মুক্তি পাওয়ার পর পরই যশোর জেলা কমিটির সদস্য হিসেবে নড়াইল অঞ্চলে দায়িত্বপ্রাপ্ত হন। কিন্তু বেশিদিন তাঁকে বাইরে থাকতে দেয়নি স্বৈরাচারী সরকার। আবারও কারারুদ্ধ করা হয় এবং ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর ঢাকা জেল থেকে মুক্তি পান। কমরেড অমল সেন ছিলেন শোষক-নির্যাতকদের কাছে মূর্তিমান বিপ্লবী। তাই ১৯৭০ সালে আবারও কারান্তরালে যেতে হয়।১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ তারিখে পাক হানাদার বাহিনীর হামলার পরপরই বীর জনতা জেল ভেঙ্গে তাঁকে বের করে।
★আজীবন বিপ্লবী, অকৃতদার, নিঃস্বার্থ বিপ্লবী কমরেড অমল সেন ১৯৭১ সালে তিনি যখন জেল থেকে বের হলেন তখন কমরেড সুখেনের নেতৃত্বাধীন ই. পি. সি. পি (এম. এল)-এর সভ্য ছিলেন। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধ সংক্রান্ত নীতি নিয়ে মতবিরোধ বাধায় তিনি দলত্যাগ করেন এবং পরে কলকাতা চলে যান। তখন বিভ্রান্ত বাম আন্দোলনের কর্মীদের সংগঠিত করে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে ঐক্যবদ্ধ করার অভিপ্রায়ে একটি ‘খোলা চিঠি’র মাধ্যমে আহ্বান জানান। এ সময় তিনি মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। পাশাপাশি ভারতে বসেই এদেশের বিপ্লবীদের ঐক্যবদ্ধ করার অব্যাহত প্রচেষ্টা চালান এবং ‘বিপ্লবীদের সমন্বয় কমিটি’ গড়ে তোলেন।
★১৯৬৬ সালে পার্টিতে এক ভাঙ্গন সৃষ্টি হয়েছিল। চীনপন্থি অর্থাৎ পিকিংপন্থি এবং রুশপন্থি অর্থাৎ মস্কোপন্থি বলে সাধারণভাবে পরিচিতি হয়েছিল দুটি অংশ। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সনে কমিউনিস্ট আন্দোলনে চীনপন্থী ও মস্কোপন্থী ধারার বিপরীতে ‘লেনিনবাদী কমিউনিস্ট পার্টি’ গড়ে তোলেন এবং পার্টির সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। কমরেড অমল সেনের হাতে গড়া ‘লেনিনবাদী কমিউনিস্ট পার্টি ‘পরবর্তীতে ‘ওয়ার্কার্স পার্টি’ নাম ধারণ করে। তিনি ওয়ার্কার্স পার্টির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হিসেবে দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালন করেন।
★ এ তাত্ত্বিক নেতার ইতিহাস, দর্শন, অর্থনীতি এমনকি সাহিত্যের ক্ষেত্রেও ছিল অবাধ বিচরণ। তাঁর লেখা বেশ অনেকগুলো কবিতা আছে। কৃষক জীবনের আলেখ্য, সুখ-দুঃখ সংগ্রাম, ছোট কৃষক কন্যার আকাঙ্খা, কৃষক বধূর মন-বাসনা, দারিদ্র তাড়িত কৃষকের সংগ্রামী মেজাজ ইত্যাদি অত্যন্ত সাবলীল ভাষা ফুটে উঠেছে এই সব কবিতায়। রাজনৈতিক জীবনে কমরেড অমল সেন তার সময়ে বাম-ডান বিচ্যুতির বিরুদ্ধে কমিউনিস্ট কর্মীদের সমাজ বিপ্লবের দিশা দেখিয়েছেন তাঁর ‘জনগণের বিকল্প শক্তি’ নামক চিন্তা সূত্র দিয়ে। সোভিয়েত সমাজতন্ত্রের বিপর্যয়ের পূর্বেই ১৯৭৭ সনে তার মূল্যবান চিন্তা নিয়ে প্রবন্ধ লেখেন ‘কমিউনিস্ট বিশ্ব সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের সমস্যা প্রসঙ্গে’, পরবর্তীতে কমিউনিষ্ট আন্দোলনের বিভ্রান্তি ও সোভিয়েত ইউনিয়নের ভাঙ্গনের প্রেক্ষাপটে সেই চিন্তার যথার্থতাও খুঁজে পাওয়া যায়। কমিউনিস্ট পার্টি এবং জীবনবোধের অনুশীলনে ‘কমিউনিস্ট জীবন ও আচরণ রীতি প্রসঙ্গে’ তাঁর রচিত বইটি এদেশের কমিউনিস্টদের জন্য একটি অবশ্য পাঠ্য। ‘নড়াইল তেভাগা আন্দোলনে সমীক্ষা’ নামক প্রবন্ধেও তিনি তেভাগা আন্দোলনের গভীর বিশ্লেষণ তুলে ধরেছেন।
★কমরেড অমল সেনের প্রবল আকাঙ্ক্ষা ছিল এদেশেই তিনি মৃত্যুবরণ করবেন। সেজন্য তিনি কিছুতেই কলকাতায় বা অন্য কোথাও অস্ত্রপাচার বা বড় ধরনের চিকিৎসার জন্য যেতে রাজী হতেন না।অবশেষে ২০০৩ সালের ১৭ জানুয়ারী ৮৯ বছর বয়সে ঢাকার কমিউনিটি হাসপাতালে বৃহস্পতিবার বেলা ২ টা ২৫ মিনিটে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। ১৮ জানুয়ারী শনিবার বিকাল ৩টায় ৩১/এফ, তোপখানা রোডস্থ ওয়ার্কার্স পার্টির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে কমরেড অমল সেনের মরদেহ রাখা হয়। এখানে পার্টি ও সহযোগী সংগঠনসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের হাজার হাজার নেতাকর্মী এবং সমাজের সর্বস্তরের মানুষ শেষ শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেন। ১৯ জানুয়ারী পার্টির প্রবীণ তাত্ত্বিক নেতা কমরেড হায়দার আকবর খাঁন রণো’র নেতৃত্বে দলীয় নেতাকর্মীরা মরদেহ নিয়ে নড়াইল যান এবং বাকড়ী গ্রামে যথাযোগ্য মর্যাদায় কমরেড অমল সেনকে সমাহিত করা হয়।
★কমরেড অমল সেন একটা কথা প্রায়ই বলতেন, “শ্রমজীবী জনগণের কাছে পুরোপুরি আত্মসমর্পণ করতে হবে। তবেই মুক্তি মিলবে।"
হে কমরেড অমল সেন, আপনাকে লাল সালাম ।

EmoticonEmoticon