শুক্রবার, ৩০ নভেম্বর, ২০১৮

কৃষকের ৮২০ টাকা খরচের ধান ৬৭৫ টাকায় কিনতে আমাদের লজ্জা করে না!

Tags

সুন্দরী চ্যানেল-ক্রু'র সামনে ঘাবড়ে যেতে পারে, সলজ্জ গদগদও হতে পারে, তাই বলে মিথ্যা বলবে?
কিছুদিন আগে একটি চ্যানেল উত্তরবঙ্গে ধানের বাম্পার (কথাটা শুনলে গা ঘিন ঘিন করে! ইতরগুলো রাজধানীতে বসে এক্সেল অন করে পরিসংখ্যানের বাম্পার মারে!) ফলন নিয়ে রিপোর্ট করেছিল। কৃষকের মুখে চোঙা ধরতেই তারা গড়গড় করে বলে দিল-
'এইবার হামার ফোলোন ভালো হইছে, ভালো দাম পামো, নাভও ভালো হবি।'
চোঙা চলে গেল মিলারের অফিসে। যথারীতি তোয়ালে পেনস্ট্যান্ড প্লাস্টিকের ফুল দেখানো শেষে মিলার বলল-
'এইবার ফোলোন ভালো হইছে, কৃষকও ভারো দাম পাবি, সোরকার ন্যায্য দামে ধান কিনিবে, আমাদের বেবসাও ভালো হোবে, লাভও হোবে।'

সূত্রমতে এটি একটি পজেটিভ নিউজ। বিএডিসি, সরকারের পারচেজ কমিটি, কৃষি বিষয়ক সংসদীয় কমিটি, জেলা প্রশাসক, কৃষি অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের মিলিত প্রচেষ্টাতেই এধরণের নিউজের জন্ম হয়।

এবার প্রকৃত চিত্রটি দেখা যাক- সরকারী সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রতি মণ ধানের ক্রয়মূল্য ৬০০ থেকে ৬৭৫ টাকা। যদিও সরকারী মূল দর ২৬ টাকা প্রতি কেজি। তাতে মণ প্রতি দাম হয় ১০৪০ টাকা, কিন্তু সরকার এই টাকায় কিনবে মিলারদের কাছ থেকে। তারা শুকনো ধান-ভেজা ধান ফর্মেটে ফেলে চিটা-ধুলা বাদে যে টাকায় কিনবে তাতে গড়ে ৬৭৫ টাকাই কৃষক পাবে। বাকিটা সব মধ্যস্বত্ত্বভোগীর বখরা! অর্থাৎ এই দামের বেশি দামে কেউ ধান কিনবে না। মিলার এবং ব্যাপারিরা চেষ্টা করবে এর চেয়ে কম দামে কিনতে। তারা তা পাবেও, কারণ ছোট কৃষক ধান মজুদ করতে পারে না।

এই ধানের উৎপাদন ব্যয় কত? এই হিসেবটা রাজধানীতে শত শত বিশেষজ্ঞ কর্মকর্তারা করেন না। তারা একটা গড় কস্ট ধরে নেন। (মোটে লাখ খানেক টাকা বেতনে আর কত করবেন!) ক্ষুদে কৃষক যে সময়-অসময়ে বাড়তি শ্রম দেয়, রাত-দিন চৌপ্রহর পাহারা দেয়, সেই সব খুচরো কস্ট বাদেই প্রতি মণ ধানের উৎপাদন খরচ-৮০০ থেকে ৮২০ টাকা! তাহলে একুনে চাষার লোকসান-গড়ে ২০০ টাকা। এই দামে ধান বিক্রি না করে ক্ষুদে কৃষকের উপায় নেই। তাদের দাদনের টাকা শোধ করতে হবে, পানির দাম মেটাতে হবে। সারা বছরের ধার শোধ করতে হবে। তবে যারা একটু সচ্ছল সেই কৃষকরা কেউ কেউ প্রতি বছর ধানে আগুন ধরিয়ে প্রতিবাদ করে। আমাদের নির্লিজ্জ মিডিয়া সেই সব খবর ছাপে। ততোধিক নির্লজ্জ চ্যানেল-ক্রুরা হাসি মুখে সেই খবর প্রচার করে। এই ওভারডোজের পলিটিক্স গেলা নিওপলিটিক্যাল ভূষি মালগুলো নির্বিকার এইসব খবর হজম করে। রাষ্ট্র পরিচালকগণ নির্লজ্জ মিথ্যায় সদম্ভ ঘোষণা করে- তারা কৃষকদরদী, শ্রমিকদরদী!

প্রতি বছর এই একই বিরক্তিকর এবং বুক মোচড়ানো কষ্টকর খবর পরিবেশিত হয়ে আসছে। তাতে করে এই দেশ-জাতির কোথাও কোনো পালকও নড়ে না, হাই তোলাও বন্ধ হয় না। মিডল ক্লাস প্যারাসাইটরা এই খবরের মধ্যেও টকশো’র এলিমেন্টস পেয়ে বরং নোট করতে থাকে! 

অন্য যে কোনো সমাধান এখানে ফেল করেছে। অন্য যে কোনো প্রতিকার এখানে অসম্ভব, কারণ এই  কৃষকদের নিয়ে মুক্তি টুক্তি আর বিপ্লব টিপ্লবের কথা বলে গুরুগম্ভির পাণ্ডিত্যভাব নেয়া বামপন্থীরাও এই ইস্যুটা নিয়ে মাঠে নামে না। "কৃষকের উৎপাদিত ফসলের ন্যায্য মূল্য দিতে হবে" শিরোনামে একটা লিফলেট লিখে দায়িত্ব শেষ করে।

অথচ খুব কার্যকর একটা প্রতিকার হতে পারত যদি কৃষক ধান ফলানো বন্ধ করে দিতে পারত। তারা তা পারে না। তাদেরকে ধান না হোক অন্য যে কোনো ফসল ফলাতেই হবে, কারণ সেটাই তার কাজ। এই কাজ করে যে পারিশ্রমিক পায় সে কারণে করে? তা তো করেই, সেই সঙ্গে আরও একটি বিষয় আছে যা মধ্যবিত্ত মগজে খেলবে না, তা হলো উৎপাদনের সৃষ্টিশীলতা। ফসল ফলানো আর একটি ফুটফুটে সন্তান জন্ম দেওয়া একই রকম গৌরবময়। এদেশের কোটি কোটি কৃষক প্রতিদিন প্রতিমুহূর্তে সেই গৌরবময় সৃষ্টিশীলতা দেখিয়ে চলেছে…. আর তাতেই বাকি কোটি কোটি প্যারাসাইটের মুখের অন্ন হচ্ছে!
আমাদের রাষ্ট্র পরিচালকগণ কি অপেক্ষায় আছেন, কবে থেকে কৃষক ভারতের মত এখানেও আত্মহত্যা শুরু করে….? কৃষক তো রোজই মরছে। মরবেও। আবার বেঁচে উঠবে। আপনারা যেদিন মরা শুরু করবেন, তখন থেকে আর বাঁচতে পারবেন না। মরতেই থাকবেন।


EmoticonEmoticon