একজন কমিউনিস্টকে ‘মানুষ’ হতে হয়। যে ‘মানুষ’ না সে কমিউনিস্ট হতে পারে না। নামের মানুষ তো সবাই। কামের (কাজ) মানুষ ক’জন! কমিউনিস্ট ক’জন! মানুষের মানবিক গুণাবলী থাকলেই সে ‘মানুষ’ হয়। কিন্তু কমিউনিস্ট হতে গেলে তার আরো বেশি গুণের দরকার হয়।
ইচ্ছে করলে মানুষ যে কেউ হতে পারে। কিন্তু সবার পক্ষে কমিউনিস্ট হওয়া সম্ভব না। কমিউনিস্ট হতে হলে তাকে সর্বক্ষেত্রে কমিউনিস্ট হতে হয়। তার চাল-চলন-কথাবার্তা-আচার-আচরণ-পোশাক-আশাক-ত্যাগ-তিতিক্ষা সবকিছুতে কমিউনিস্ট হতে হয়। তাকে দেশপ্রেমিক হতে হবে, কষ্ট করতে হবে, জেল খাটতে হবে। বিপ্লবের সময় আপনজনের বিরুদ্ধেও দাঁড়াতে হবে। যেমন কমিউনিস্ট পার্টির বহু নেতা ৩০, ২০, ১৫ বছর জেল খেটেছে। আমি নিজেও ১৭ বছর জেল খেটেছি। ১৫ বছর জেল খাটা বহু লোক পার্টিতে আছে- যেটা অন্যকোনো পার্টিতে নেই। সমাজে বহু মানুষ রয়েছে। তাদের জীবনেও সে ইতিহাস নেই।
একজন কমিউনিস্টকে সবসময় মানুষের সার্বিক মুক্তির আন্দোলনে নিয়োজিত থাকতে হয়। শ্রেণিচেতনার ঊর্দ্ধে উঠতে হয়। কথা ও কাজে মিল রেখে চলতে হয়। সবকিছুতেই সাধারণের স্বার্থ দেখে তাকে কাজ করতে হয়। মধ্যবিত্ত শ্রেণিচেতনা ধারণ করে কমিউনিস্ট হওয়া তো দূরের কথা মানুষও হওয়া যায় না! কিন্তু দুঃখের বিষয় হচ্ছে আমাদের পার্টি এখনও মধ্যবিত্তশ্রেণির পার্টি। এটা কৃষক-শ্রমিক-মেহনতি মানুষের কমিউনিস্ট পার্টি হয়ে উঠতে পারেনি। নেতৃত্বেও তাই। যতদিন না এই অবস্থার পরিবর্তন হচ্ছে ততদিন এভাবেই চলবে।
পার্টির কিছু লোক কমিউনিস্ট হয়েছিল। তাঁরা তাঁদের অবদান রেখেছেন। যাঁদেরকে আমরা বিপ্লবী বলি, কমিউনিস্ট বলি। কিন্তু গোটা পার্টিটা কমিউনিস্ট পার্টি হতে পারেনি। তারা চেষ্টা করেছিলো। সেই মতো কাজও হচ্ছিলো। কিন্তু তাঁদের যখন অভাব পড়লো তাদের মতো করে আর কাজ হচ্ছে না। এখন যারা আছে তাদের মতো করে কাজ হচ্ছে। হতাশ হলে চলবে না। কোনো কিছুই স্থির না। সবকিছুর পরিবর্তন আছে। এ অবস্থারও পরিবর্তন হবে। তবু শুধু কথা দিয়ে হবে না। কাজ দিয়ে হবে। কাজ করতে হবে। তোমাদেরও কাজে নামতে হবে। গড়ে তুলতে হবে। বিপ্লব করতে হবে। একটা কথা মনে রেখো, বিপ্লব আকাশ থেকে পড়বে না!
আমাদের আমলের কমিউনিস্ট তুমি পাবে না, আমাদের মধ্যে দেশপ্রেমের প্রতিযোগিত হতো কে কতো বেশি দেশপ্রেমিক হতে পারে, তুমি তো এখন আমাদের মতো কমিউনিস্ট পাবে না। এটাতো মধ্যবিত্তের পার্টি, শ্রমিকশ্রেণির পার্টি না। সেজন্য তারা শুধু কিভাবে টাকা কামাই করবে, কিভাবে বউ ফুটানি করবে সেই চিন্তা করে। এই দেশের কমিউনিস্ট পার্টি দাঁড়াতে হলে মধ্যবিত্ত চরিত্র থেকে বের হয়ে আসতে হবে। তবুও আমি হতাশ হইনি। তবে কাজ করতে হবে। গোটা পার্টিটা মধ্যবিত্তের শ্রেণি, মধ্যবিত্ত মানে ভোগের শ্রেণি। মধ্যবিত্তকে শ্রমিককে রূপান্তরিত করতে হবে। সোভিয়েত ইউনিয়ন, রাশিয়া যদি সাহায্য না করতো তাহলে তো ৯ মাসে দেশ স্বাধীন হতো না। এখন দেশ স্বাধীন হয়েছে বলে সবকিছু ৯ মাসে করা যাবে না।-সূত্র: বিপ্লবী জসিমউদ্দিন মণ্ডল’ বই থেকে উক্ত অংশটুকু নেয়া হয়েছে।
বৃহস্পতিবার, ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৭
কমরেড জসিমদ্দীনের কথাঃ
রোহিঙ্গা পূর্বপুরুষ'দের ৩'টি ঐতিহাসিক ভুল !
★ ১ম ভুল ||
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় রোহিঙ্গারা সমর্থন করেছিল জাপানীদের। আর পুরো মায়ানমারের জনসমর্থন ছিল ব্রিটিশদের প্রতি। সে যুদ্ধে জিতেছিল জাপান। কিন্তু জাপান যখন চলে যায় রোহিঙ্গারা হয়ে পড়ে একঘরে। তারপর হতেই দ্বন্দ্ব দেখা দেয় মায়ানমার এবং রোহিঙ্গাদের সাথে। এক সময়ে ব্রিটিশদের দখলে আসে এ ভূখণ্ড। তারা মায়ানমারের ১৩৯টি জাতিগোষ্ঠীর তালিকা প্রস্তুত করে। কিন্তু তার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত ছিল না রোহিঙ্গাদের নাম।
★ ২য় ভুল ||
১৯৪৭ সালে তাদেরকে মায়ানমারে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার কথা বলা হয়েছিল। তখন রোহিঙ্গারা পূর্ব পাকিস্তানের (বাংলাদেশ) সাথে থাকার কথা জানায়।
১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি মায়ানমার স্বাধীনতা অর্জন করে এবং বহুদলীয় গণতন্ত্রের পথে যাত্রা শুরু হয়। সে সময়ে পার্লামেন্টে রোহিঙ্গাদের প্রতিনিধিত্ব ছিল। এ জনগোষ্ঠীর কয়েকজন পদস্থ সরকারি দায়িত্বও পালন করেন। কিন্তু ১৯৬২ সালে জেনারেল নে উইন সামরিক অভ্যুত্থান ঘটিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করলে মায়ানমারের যাত্রাপথ ভিন্ন খাতে প্রবাহিত হতে শুরু করে।
★ ৩য় ভুল ||
১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে যখন পাক হানাদার বাহিনী নিরস্ত্র বাঙ্গালীদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল সে সময়ে রোহিঙ্গারা আরেকটি ভুল করে বসে। মায়ানমারের এই রোহিঙ্গারা মুসলমান হিসাবে সমর্থন করলো পাক হানাদার বাহিনীকে। দেশ স্বাধীনের পর বাঙ্গালীর সহানুভূতিও হারিয়ে ফেলে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী। বাংলাদেশ জন্মের পর এই রোহিঙ্গারা একূল অকূল দু’ কূলই হারায়।
ইতিহাসের ঘূর্ণিপাকে দু’ কূল হারিয়ে অথৈ সাগরে ভাসতে লাগলো ওরা। মায়ানমার মানুষের কাছে পরিচিত হতে থাকলো এক ‘বেঈমান জাতি’ হিসাবে। রোহিঙ্গাদের দেশ বিভক্ত হবার এই ভুল সিদ্ধান্তই ছিল ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ভুল। পূর্বপুরুষ'দের এ দুটি ঐতিহাসিক ভুলের খেসারতে ধুঁকে চলেছে আজোবধি এ প্রজন্ম।
কারণ, এ ভুল'কে কাজে লাগিয়েই বার্মিজ পুঁজিবাদ' মানুষকে উস্কে জাতিগত বিভেদ সৃষ্টি করে চলেছে।