ক্লাস ফাইভে পড়া সময়কার ঘটনা। আমি তখন নানা বাড়িতে থেকেই পড়ি। বাড়ি থেকে স্কুল হাঁটা পথে মিনিট পাঁচেকের পথ। ভজা আসতো মাইল দেড়েক দূরের রাজাগাঁও থেকে। বাড়ির পাশেই রাজগাঁওয়ের মহাশ্নশান। একদিন সকালে স্কুলে গেলাম, যাবার কিছুক্ষণ পরেই দেখলাম ভজা আসছে দৌড়ুতে দৌড়ুতে। কাছে আসতেই দেখলাম শার্টের একটা পকেট ভেজা। বলল, হা কর! হা করা মাত্রই একটা মিষ্টি জোর করে মুখে ঢুকিয়ে দিলো। খেতে খেতেই জানতে চাইলাম, কিসের মিষ্টি? বললো, ভোগের মিষ্টি! শ্মশানে পেয়েছে। শুনেই তো আমার হাত পা ঠান্ডা হয়ে গেলো। ওই দিন রাতে আর ঘুমাতে পারিনি, ভয়ে কাঁপুনি দিয়ে জ্বর এলো। এই বুঝি, শ্মশান কালী খপ করে ধরে আমার মুন্ডু চিবিয়ে খায়! দিনদুয়েক পরে ভালো হয়ে স্কুলে গেলাম। শ্নশান কালীর ভয়ে জ্বর এলেও মিষ্টির লোভ ছাড়তে পারলাম না। ভজাকে বললাম, এরপর থেকে খেয়াল রাখবি, যখনি কেউ মিষ্টি ভোগ দেবে, আমায় খবর দিবি। দিনকয়েক পরে স্কুলে গিয়ে খবর পেলাম, ভজা আজ আর স্কুলে আসবেনা। আমাকে তাড়াতাড়ি তার বাড়ি যেতে বলেছে! সাথে সাথে মিষ্টির স্বাদ জিভে চলে এলো। মনে মনে আশান্মিত হলাম, মিষ্টি বোধহয় খাওয়া যাবে আজ! মামাতো ভাই খোশনের হাতে বইপত্র গছিয়ে আমি দৌড়ুতে দৌড়ুতে চললাম ভজার কাছে ভোগের মিষ্টি খেতে। গিয়ে দেখি, ভজা শ্মশানের এক কোনে মিষ্টির এক হাড়ি নিয়ে বসে আছে! বলল, তোর অপেক্ষায় ছিলাম, একটাও খাইনি। দ্বিরুক্তি না করে দুজনে লিপ্ত হলাম মিষ্টি খাওয়ার প্রতিযোগীতায়। পেট ভরে মিষ্টি খাওয়ার পরেও দেখা গেলো, হাড়িতে মিষ্টি পরে আছে গোঁটা চারেক। দুজনে পকেটে দুটো করে ভরে রওয়ানা দিলাম, চৌধুরীদের পেয়ারা বাগানে, উদ্দেশ্য চুরি করে কচকচিয়ে পেয়ারা চিবোনো। পথের মধ্যেই পরে হাবলুদের বাড়ি। হাবলু আমাদের আরেক সহপাঠি। ইয়া লম্বা, কালো করে চেহারা,নাক থ্যাবড়া, মাথার ঝাকড়া চুল যেন কাঁকের বাসা! তো হাবলু যেমন ছিল লিকলিকে সিং, তেমনি ভারী বজ্জাত! সারাক্ষণই আমাদের পেছনে লাগতো আর হেডমাস্টারের কাছে নালিশ দিতো। ঘটনাচক্রে ওই দিন হাবলুও স্কুলে আসেনি। বেটাকে ডেকে এনে পথে দুটো মিষ্টি খাইয়ে দিলাম। মিষ্টি খেতে খেতে জানতে চাইলো, কিসের মিষ্টি? বললাম, ওটা ভোগের মিষ্টি। শ্মশানে পেয়েছি। কালীকে ভোগ দেয়া হয়েছিল। তুই কালীর মিষ্টি খেয়েছিস, রাতে কালী এসে তোর ঘাড় মটকাবে। বলতে বলতেই গোঁ গোঁ করে হাবলু বেটা অজ্ঞান হয়ে ধপাস করে মাটিতে পরে গেলো। তখন কে জানতো যে বেটার ফিটের ব্যমো? এদিকে ততক্ষণে আমার পগাড় পার। পরদিন থেকে নিয়মিত স্কুলে গেলেও দিন পনেরো হাবলুর দেখা পেলাম না। খবর পেলাম, বেটাকে ভূতে ধরেছে! অনেক মোল্লা কবিরাজ ধরে ভূত ছাড়ানো হয়েছে! এগুলো শুনে ভজা আর আমি হাসি। এরপর সুস্থ হয়ে পরে হাবলু স্কুলে এলেও আমাদের সাথে আর লাগতে সাহস করেনি। বহুদিন ও আমাদের থেকে দূরে দূরে থেকেছে।
শুক্রবার, ২৮ জুলাই, ২০১৭
এতে সদস্যতা:
মন্তব্যগুলি পোস্ট করুন (Atom)
EmoticonEmoticon