ক্ষুদিরাম বসু,(৩ ডিসেম্বর ১৮৮৯-১১ আগস্ট ১৯০৮) মেদেনীপুর জেলার কেশপুর থানার মোহবনী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ব্রিটিশ ভারতীয় জাতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের বিপ্লবী। প্রায় দুইশত বৎসর অবিভক্ত ভারতের জনগণকে শাসন শোষণ আর নির্যাতনের যে ষ্ট্রিমরুলার চালিয়েছিল, তার থেকে মুক্তি পেতে নানা সময় নানা আন্দোলন দানা বেধেছিল। সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলন ছিল তার মধ্যে একটি শক্তিশালী আন্দোলন। ক্ষুদিরাম বসু ছিলেন সেই সশস্ত্র আন্দোলনের একনিষ্ঠ লড়াকু কর্মী। ১৯০৪ সালে ক্ষুদিরাম বোনজামাই অম্রিতার সাথে মেদেনীপুর চলে আসেন। সেখানেই কলেজিয়েট স্কুলে ভর্তি হন। দৃঢ়চেতা ডানপিটে সাহসী ক্ষুদিরাম স্কুলে থাকা অবস্থায় বিপ্লবী সত্যেন্দ্রনাথ বসুর হাত ধরে বিপ্লবী যুগান্তর দলে যোগ দেন। একসময় বিপ্লবী ইস্তেহার "সোনার বাংলা" বিলি করে গ্রেফতার হন। ১৯০৬ সালে কাসাই নদীর বন্যায় ত্রানকাজের সাহায্যে এগিয়ে এসে তাঁর মানবিক গুণের পরিচিয় দেন।
শিক্ষক সত্যেন্দ্রনাথ বোস এর অনুপ্রেরণায় বিপ্লবী কাজে আত্মনিয়োগ করেন। ১৬ বছর বয়সে ইংরেজ কর্মকর্তাকে লক্ষ করে পুলিশ স্টেশনে বোমা পুঁতে রাখেন। একের পর এক বোমা হামলা করে ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে ত্রাস সৃষ্টি করেন। অবশেষে মুজাফফরপুরে ইউরোপিয়ান ক্লাবে বোমা হামলায় তিনজনকে হত্যার দায়ে গ্রেফতার হন। অপর সঙ্গী প্রফুল্লচাকী নিজে গুলি ছুড়ে আত্মহত্যা করেন। ১৯০৮ সালের মে মাসে ক্ষুদিরামের বিচার শুরু হয়। বিচারের রায়ে তাঁকে ফাঁসি দেওয়া হয়। হাসি মুখে ফাঁসির দড়ি বরণ করে নেন এই অকুতোভয় কিশোর বিপ্লবী। কী স্পৃহা আর ত্যাগের মহিমা! শুধুমাত্র বিদেশী অত্যাচার থেকে মুক্তি চেয়েছিলেন। মুক্তির এই সোপান যুগে যুগে বিপ্লবীরা রচনা করেন। সশস্ত্র বিপ্লবীদের কাজকে তখন সন্ত্রাসবাদী আন্দোলন বলা হত। তখনো সুবিধাবাদী ভারতীয় এই কাজকে নিন্দার চোখে দেখতো। কিন্তু আজ? কী মহৎ কর্মই না করেছিলেন সেই অগ্নিযুগের সন্তানরা। ব্রিটিশ শাসকদের এমনিতে বিদায় করা যাবে না, এই সত্য বুঝেছিলেন ক্ষুদিরাম, সূর্যসেন, প্রীতিলতারা। তাই মুক্তির আহবানে কর্তব্য কাজে অবহেলা করেন নি? আর আমরা? নিজ সুবিধা সবকিছু বজায় রেখে যদি কিছু করার মুরোদ হয়? এখানেই বড় বিপ্লবীর সাথে আমাদের তফাৎ। বড় বিপ্লবী নিঃশঙ্কচিত্তে মৃত্যুকে বরণ করে হাসিমুখে আর আমরা? নিজের জীবনের মায়া ত্যাগ করতে পারি না।
ক্ষুদিরামকে নিয়ে যে গাণ ছিল তা আজও বিপ্লবীদের দোলা দেয়-
‘একবার বিদায় দে-মা ঘুরে আসি।
হাসি হাসি পরব ফাঁসি দেখবে জগৎবাসী।
কলের বোমা তৈরি করে
দাঁড়িয়ে ছিলেম রাস্তার ধারে মাগো,
বড়লাটকে মারতে গিয়ে
মারলাম আরেক ইংল্যান্ডবাসী।
শনিবার বেলা দশটার পরে
জজকোর্টেতে লোক না ধরে মাগো
হল অভিরামের দ্বীপ চালান মা ক্ষুদিরামের ফাঁসি
দশ মাস দশদিন পরে
জন্ম নেব মাসির ঘরে মাগো
তখন যদি না চিনতে পারিস দেখবি গলায় ফাঁসি’
হাসি হাসি পরব ফাঁসি দেখবে জগৎবাসী।
কলের বোমা তৈরি করে
দাঁড়িয়ে ছিলেম রাস্তার ধারে মাগো,
বড়লাটকে মারতে গিয়ে
মারলাম আরেক ইংল্যান্ডবাসী।
শনিবার বেলা দশটার পরে
জজকোর্টেতে লোক না ধরে মাগো
হল অভিরামের দ্বীপ চালান মা ক্ষুদিরামের ফাঁসি
দশ মাস দশদিন পরে
জন্ম নেব মাসির ঘরে মাগো
তখন যদি না চিনতে পারিস দেখবি গলায় ফাঁসি’
আজ ভারত স্বাধীন হয়ে তিনটি দেশে রূপ নিয়েছে। কিন্তু তিন দেশের জনগণের বড় অংশ নিজস্ব এবং সাম্রাজ্যবাদী শোষক শ্রেণী দ্বারা নির্যাতিত। তার মানে মুক্তির লড়াই এখনো শেষ হয়নি? যথদিন অত্যাচার নির্যাতন থাকবে তথদিন ক্ষুদিরামরা বার বার জন্ম নিবে। ক্ষুদিরাম যে ত্যাগ আর বিপ্লবের বীজ বপন করে গেছেন সেখান থেকেই জন্ম নিবে আজকের যুগের বিপ্লবীরা। ঐ সময়ের আহবান ছিল জাতীয় স্বাধীনতার লড়াই আর আজকের আহবান হল শোষণ মুক্তির লড়াই। সেই লড়াইয়ে শত শত তরুণ বিনাদ্বিধায় আত্মনিয়োগ করবে সেটাই ক্ষুদিরাম দিবসের শিক্ষা। লাল সালাম হে বীর.....

EmoticonEmoticon