তত্ত্বগতভাবে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের আছে তিন অঙ্গ। এই তিন অঙ্গের ইংরেজিতে নাম হচ্ছে, লেজিসল্যাটিভ (পার্লামেণ্ট), এক্সিকিউটিভ (সরকা্রী প্রশাসন) ও জুডিশিয়ারী (বিচার বিভাগ)।
পার্লামেণ্টের কাজ আইন প্রণয়ন করা। সরকারী প্রশাসনের কাজ হচ্ছে সেই আইন মোতাবেক রাষ্ট্র পরিচালনা করা। বিচার বিভাগের কাজ হলো আইনের লঙ্ঘন বা অপব্যবহার হলে রাষ্ট্রের সংবিধান অনুসারে তার বিচার করে রায় দেওয়া।
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সুষ্ঠু পরিচালনার জন্যে এই তিন অঙ্গের মধ্যে আপেক্ষিক দূরত্ব ও স্বাধীনতা বজায় রেখে 'ব্যালেন্স অফ পাওয়ার' বা ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষা করা হয়। বিপরীতক্রমে, স্বৈরতান্ত্রিক রাষ্ট্রে এই তিন অঙ্গের মধ্যকার আপেক্ষিক দূরত্ব ও স্বাধীনতা বিলুপ্ত করে সমগ্র রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ এক হাতে ন্যস্ত করা হয়। আর, এটি করা হয় একটি আদর্শ বা দর্শনের ও সেই দর্শনের শ্রেষ্ঠ ধারক কোনো এক ব্যক্তির নামে।
১৯৭১ সালে বাংলাদেশ সৃষ্ট হয়েছিলো একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে বিকশিত হওয়ার স্বপ্ন ও প্রতিশ্রুতি-সহ একটি বিপ্লবের মাধ্যমে। বিপ্লবটি হয়েছিলো বিপ্লবে অনুপস্থিত নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের নামে, যিনি বিপ্লবোত্তর কালে ১৯৭২ সালের জানুয়ারীতে দেশে ফিরে তিন বছরের মধ্যে ১৯৭৫ সালের জানুয়ারীতে সকল বিরোধী রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করে বাকশাল গঠন করে নিজের হাতে সর্বময় ক্ষমতা নিয়ে গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ রাষ্ট্রটিকে ফ্যাসিবাদী স্বৈরতান্ত্রিক রাষ্ট্রে রূপান্তরিত করেন।
১৯৭৫ সালের অগাষ্টে অগণতান্ত্রিক সামরিক অভ্যূত্থানে শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ডের মধ্যে দিয়ে বাকশালী ব্যবস্থার পতন ঘটলেও রাষ্ট্রটি আর প্রকৃত গণতান্ত্রিক রূপ নিতে পারেনি। শেখ মুজিবুর রহমানের পর প্রথম সামরিক একনায়ক জেনারেল জিয়াউর রহমান ও দ্বিতীয় সামরিক একনায়ক জেনারেল হোসেইন মুহাম্মদ এরশাদ নিজ নিজ দল গঠন করে এদিক-সেদিক টুকটাক পরিবর্তন করে বস্তুতঃ রাষ্ট্রটির স্বৈরতান্ত্রিকতা অক্ষুণ্ণ রাখে।
১৯৯০ সালের গণ-অভ্যূত্থান সুযোগ এনে দিয়েছিলো রাষ্ট্রটির গণতান্ত্রিক প্রত্যাবর্তনের, কিন্তু গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্যে যে-গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান প্রয়োজন, তা না থাকার কারণে গণতন্ত্র অদ্যাবধি সুদূর পরাহত। গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান বলতে আমি প্রথমতঃ সকল রাজনৈতিক দল এবং দ্বিতীয়তঃ সরকারী, আধাসরকারী ও বেসরকারী প্রতিষ্ঠানের গণতান্ত্রিক কাঠামো, নেতৃত্ব, পদ্ধতি ও প্রক্রিয়া বুঝাচ্ছি।
গণতন্ত্র যতোটুকু না একটি পদ্ধতি ও প্রক্রিয়া, তার চেয়েও বেশি সংস্কৃতি, যার মূলে আছে তিনটি বিশ্বাস - স্বাধীনতা, ভ্রাতৃত্ব ও সাম্য (ফরাসী বিপ্লবের তিন মন্ত্র)। অর্থাৎ, প্রতিটি ব্যক্তি জন্মগতভাবে স্বাধীন; একটি জাতি সকল মানুষের আছে অভিন্ন মূলতগত আত্মপরিচয়, এবং সেই সুবাদে সকলেই সমান।
বাংলাদেশে ১৯৭১ সালে জাতীয় স্বাধীনতার বিপ্লব সংঘটিত হলেও, সেটি গণতান্ত্রিক বিপ্লব ছিলো না। অন্য জাতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার কারণে, বিপ্লবের আলোকপাতটি ছিলো জাতীয়তার ওপর - ব্যক্তির স্বাধীনতার চেয়েও জাতির স্বাধীনতার বিষয়টিই একমাত্র গুরুত্ব পেয়েছিলো। আর, সেকারণেই বিপ্লবে অনুপস্থিত থেকেও শেখ মুজিবুর রহমান বিপ্লবে গঠিত রাষ্ট্রটির প্রাধান হয়ে জাতির নামে ব্যক্তি-স্বাধীনতা খর্ব করে একনায়ক হতে পেরেছিলেন।
বাংলাদেশে যতোদিন পর্যন্ত শেখ মুজিবুর রহমান বা জিয়াউর রহমান রাজনীতির আদর্শ পুরুষ হয়ে 'আদর্শ' যুগাতে থাকবেন, ততোদিন পর্যন্ত এদেশে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা পাবে না। এই অপ্রিয় সত্যটি না বুঝে বাঙালী যতোই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করুক, শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হতে বাধ্য।
দুর্ভাগ্যবশতঃ বাংলাদেশে মার্ক্সবাদী, জাতীয়তাবাদী, সামরিকবাদী ও ইসলামাদী-সহ কোনো বাদীরাই গণতান্ত্রিক নয়। জনগণের মুক্তির জন্যে নতুন রাজনৈতিক ধারণা ও দল গঠন করতে হবে।
২৩/০৮/২০১৭
লণ্ডন, ইংল্যাণ্ড
EmoticonEmoticon