শনিবার, ১৯ আগস্ট, ২০১৭

রুশ বিপ্লব কী সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব ছিল ?

সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন কে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র বলা হয়। যদিও এখানে নানা মত পার্থক্য আছে যে একটি মাত্র দেশে সমাজতন্ত্র হয় কিনা। আমরা যদি ক্লাসিক মার্ক্সবাদের দিকে তাকাই তবে রুশ বিপ্লবের অনেক কিছুই মার্ক্সবাদের সাথে যায় না। তাহলে কী রুশ বিপ্লব কে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব বলতে পারি? এখানে কিছুটা বিশ্লেষণের প্রয়োজন আছে। কমরেড লেনিন বলেছিলেন, 'যদি কেউ বিশুদ্ধ সমাজবিপ্লব দেখতে চায়, তবে সে কখনো বিপ্লবের দেখা পাবে না'। এখন আমরা যদি খেয়াল করি রুশ বিপ্লবের দিকে তবে তার আলোকে বলতে পারি এটি কোন বিশুদ্ধ সমাজ বিপ্লব ছিল না। বাস্তবে নির্দিষ্ট দারিকমা মেনে বিশুদ্ধ বিপ্লব আশা করা বোকামি। সেই কারণে রুশ বিল্পব কে বলতে পারি সমাজতন্ত্র অভিমুখী বিপ্লব। হর্থাৎ যেই বিপ্লবের লক্ষ্য ছিল সমাজতন্ত্রের পথে যাত্রা। কিন্তু সাবেক জার সাম্রাজ্যে একটি পশ্চাদপদ দেশে সমাজতান্ত্রিক কাঠামো নির্মাণ করা কঠিন ছিল। কারণ মার্ক্সীয় তত্ত্ব থেকে আমরা জানি সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব শুরু হবে উন্নত পুঁজিবাদী দেশ থেকে। তার কারণ উন্নত পুঁজিবাদী দেশে শ্রমিক শ্রেণী একটি শক্তিশালী অবস্থানে থাকে এবং পুঁজিবাদী অর্থনীতির বিকাশ এমন মাত্রায় পৌছায় যে সেখানে ক্ষমতা দখলের মধ্য দিয়ে সমাজতন্ত্রের পথচলা শুরু করা যায়। কিন্তু রাশিয়ার মত একটি দেশে সমাজতন্ত্র নির্মাণ করা কঠিনই বটে।

কিন্তু রুশ দেশে যে কাজ হয়েছিল বিপ্লবের রাজনৈতিক শক্তি শক্তিশালী হয়ে গিয়েছিল। বলশেভিক মেনশেভিক পার্টির বাইরেও সেখানে অনেকগুলো সমাজতান্ত্রিক দল, শ্রমিক সংগঠন ছিল যাদের অনেকের ই লেনিনের সাথে বিপ্লবের প্রশ্নে মত পার্থক্য থাকলেও সমাজতান্ত্রিক চিন্তাধারা নির্মাণে সবার কমবেশি ভূমিকা ছিল। আমরা জানি রাশিয়ায় ১৯১৭ সালের ফেব্রুয়ারি বিপ্লবের আগে রাশিয়া একটি সামন্ততান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা জার সাম্রাজ্যের অধীনে ছিল। তাঁদের বেশকিছু উপনিবেশ ছিল। আবার ১ম বিশ্বযুদ্ধে জারের রাশিয়া জার্মানির সাথে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। দুনিয়ার পুঁজিবাদী দেশগুলো দুইভাগ হয়ে যায়। একদিকে ফ্রান্স, ইংল্যান্ড, রাশিয়া অন্যদিকে জার্মানি, তুরষ্ক, জাপান। ফলে শ্রমিক শ্রেণীর কাছে মূখ্য হয়ে উঠে তাঁরা সাম্রাজ্যবাদী দানবদের যুদ্ধ সমর্থন করবে না নিজ নিজ দেশে গণ সংগ্রাম গড়ে তুলবে। জার্মান সমাজতান্ত্রিক তাত্ত্বিক কার্ল কাউটস্কি পিতৃভূমি রক্ষার পক্ষে মত দেন। হর্থাৎ কাউটস্কি জার্মান সাম্রাজ্যবাদের আগ্রাসনকে সমর্থন দিয়ে দেন। কিন্তু লেনিন দেখান যে শ্রমিক শ্রেণীর কোন পিতৃভূমি নেই, সে লড়াই করবে নিজ নিজ দেশের বুর্জোয়াদের সাথে শাসকদের সাথে। আবার যুদ্ধে রাশিয়ার সৈন্যরা নানাভাবে পরাজিত এবং হতাশ হচ্ছিল। জারের প্রতি তাঁদের ক্ষোভ তৈরি হয়। ফলে দুর্বল জার সাম্রাজ্যের পতন ঘটে ১৯১৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে। তখন দুর্বল পুতুল সরকার ক্ষমতায় বসে। এরা ছিল বুর্জোয়া ও বামপন্তী মিলে একটি অন্তবর্তীকালীন সরকার যারা যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেয়। কিন্তু ফেব্রুয়ারি বিপ্লবের পরে লেনিন ক্ষমতা দখলের ঘোষণা দেন। তখন মেনশেভিক পার্টি, স্যোসাল রেভ্যুলুশনারী পার্টি সহ প্রায় সবাই লেনিনের বিরোধিতা করে। এমনকি বলশেভিকদের মধ্যেও মতবিরোধ শুরু হয়ে যায়। মেনশেভিকদের যুক্তি ছিল রাশিয়া সমাজতন্ত্রের জন্য উপযুক্ত নয়। বাস্তবে মার্ক্সবাদী তত্ত্ব মতে রাশিয়া সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের অনুকূলে ছিল না, তাঁদের পুঁজিবাদী অর্থনীতির বিকাশ, অবকাঠামোগত অবস্থা, জনগণের সাংস্কৃতিক মান সমাজতন্ত্রের জন্য উপযুক্ত ছিল না। লেনিন দেখালেন সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধে বুর্জোয়া দেশগুলো দুর্বল হয়ে পড়েছে। ফলে যদি কোন এক জায়গায় শ্রমিক শ্রেণী ক্ষমতা দখল করে তবে সারা ইউরোপে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব হয়ে যাবে। বাস্তবে তখন একটা সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু ইংল্যান্ডে বুর্জোয়ারা দুর্বল হলেও তখনো তাঁদের অবস্থা নাজুক হয়নি রাশিয়ার মত। আবার শ্রমিক শ্রেণী ঐক্যবদ্ধ শক্তিশালী অবস্থানে ছিল না। জার্মানিতে স্যোসাল ড্যেমক্রেট এবং কমিউনিস্টদের মধ্যে বিরোধ ছিল। ফলে সেখানে দুইভাগ হয়ে যায়। কিন্তু রাশিয়ায় শ্রমিক শ্রেণী তুলনামূলক দুর্বল হলেও তাঁদের ঐক্যবদ্ধ একটা অবস্থান ছিল। আবার সেখানে নারী শ্রমিকদের ভাল উপস্থিতি ছিল যা অনেকটা আমাদের গার্মেন্টস নারী শ্রমিকের মত। ফলে মূলত মার্চ মাস থেকে নারী শ্রমিকের ধর্মঘট বিপ্লবের সূচনা করে। ফলে বিভিন্ন জায়গায় ধর্মঘট অবরোধ শুরু হয়ে যায়। আবার সৈন্যদের মধ্যে ভাগ হয়ে যায়। সৈন্যদের একটা অংশ বিপ্লবকে সমর্থন জানায়। অন্যদিকে কৃষকরাও বিপ্লবকে সমর্থন করে। ফলে সহজেই দুর্বল বুর্জোয়া সরকারকে পরাজিত করে বলশেভিক পার্টি ক্ষমতা দখল করে। যদিও একে বিশুদ্ধ সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব বলা যায় না। তবে রুশ বিপ্লবে শ্রমিক শ্রেণীর উপস্থিতি ছিল লক্ষণীয়। লেনিনের উদ্দ্যেশ্য ছিল রাশিয়ায় ক্ষমতা দখল করে জার্মানিসহ অন্য দেশগুলোতে শ্রমিকশ্রেণী ক্ষমতা দখল করে ফেলবে। লেনিন এও বলেছিলেন 'জার্মানিতে বিপ্লব না হলে আমরা ভুক্ষে মারা যাব'। বাস্তবে বিপ্লবের পরে রাশিয়ার অবস্থা এত নাজুক ছিল যে তখন এই ব্যবস্থাকে ঠিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। যুদ্ধের ফলে অর্থনীতি একেবারেই ধ্বংসপ্রাপ্ত, চারিদিকে হাহাকার, দুর্ভিক্ষ! লেনিন যুদ্ধ থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করার জন্য জার্মানির কাছে রাশিয়ার কিছু অংশ ছেড়ে দিয়ে চুক্তিতে যেতে বাধ্য হন। তখন একদিকে যুদ্ধ-বিধ্বস্ত দেশ অন্যদিকে শুরু হয়ে যায় গৃহযুদ্ধ। আবার সাম্রাজ্যবাদী শক্তির অবরোধ এবং খাদ্যের অভাবে দুর্ভিক্ষ। ফলে যখন বিপ্লবের ৭২ দিন পার হয়ে ৭৩ দিন হয়ে যায় তখন লেনিন বলেছিলেন ' আমরা প্যারি কমিউন থেকে একদিন বেশি পার করলাম'। এই অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য লেনিন নতুন পুঁজিবাদী কর্মসূচী চালু করেন যার নাম দেওয়া হয় NEP ( new economic policy)। এটা মূলত রাষ্ট্রীয় অধীনে বড় বড় শিল্পের মালিকানা রেখে ছোট ছোট মালিকানাকে উৎসাহ দেওয়া হয়। এটা মোটেই সমাজতান্ত্রিক কর্মসূচী নয় তবে পিছিয়ে থাকা পুঁজিবাদী দেশে শিল্পায়নের জন্য এটি কার্যকর ছিল। কারণ তখন রুশ দেশে যে বাস্তবতা ছিল তখন এর চেয়ে ভাল উপায় বোধয় ছিল না। আবার বিপ্লবকে রক্ষার জন্য কোন কোন ক্ষেত্রে কঠোর হতে হয়েছে। ফলে লেনিন খুনি কিলার ছিলেন বলে লাভ নেই। কারণ কিছু দুর্বৃত্তের বিরুদ্ধে অবস্থান না নিলে বিপ্লবকে বাঁচিয়ে রাখা যেত না।

আবার দুনিয়ার বিভিন্ন দেশে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রচার হয়েছে রুশ বিপ্লবের পরে। লেনিনের উদ্দ্যোগে কমিউনিস্টদের তৃতীয় আন্তর্জাতিক গড়ে তোলা হয়। সেখান থেকে দুনিয়ার বিভিন্ন দেশে কমিউনিস্ট পার্টি গড়ে ওঠে। ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টি ১৯২০ সালে মানবেন্দ্রনাথ রায়ের উদ্দ্যোগে বর্তমান কাজাখিস্তান এ গড়ে ওঠে। চীনে প্রায় একই সময় কমিউনিস্ট পার্টি গড়ে উঠেছিল। কিন্তু চীনের কমিউনিস্ট পার্টি কমরেড মাও সেতুং এর নেতৃত্বে ১৯৪৯ সালে বিপ্লব করতে পারলেও ভারতে বিপ্লব করতে পারেনি। ফলে রুশ বিপ্লবের ফলে যে কাজটি হয়েছে তা দুনিয়া জুড়ে কমিউনিস্ট চিন্তাধারা বিকশিত হয়েছে। কারণ মার্ক্স এঙ্গেলস ইউরোপ এবং আমেরিকায় তাঁদের চিন্তাধারা ছড়িয়ে দিতে পারলেও একসময় তা সংশোধনবাদের কবলে পড়ে। সেখান থেকে কমরেড লেনিন তা নতুন উচ্চতায় দাঁড় করান এবং বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দেন। এই দিক দিয়ে রুশ বিপ্লবের গুরুত্ব কম নয়। আবার সোভিয়েত ইউনিয়নে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার যে সীমাবদ্ধতা ধরা পড়েছে তা হল শুধুমাত্র একটি দেশে সমাজতন্ত্র বেশিদিন চলে না। তাকে অন্যদেশে বিপ্লবে সহযোগিতা করতে হয়; ব্যক্তি আমলাতন্ত্র, পার্টি আমলাতন্ত্র থেকে শ্রমিক শ্রেণীর গণতন্ত্র না থাকলে তা ভেঙ্গে পড়তে পারে। বর্তমান অবস্থায় দাঁড়িয়ে লেনিনের অনেক কাজের সমালোচনা করা যায় কিন্তু যে পরিস্থিতির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে তাঁকে এই কাজ করতে হয়েছিল তা উপলব্ধি করা জরুরী। ফলে আজকের দিনের কাজ হল রুশ বিপ্লবের দুর্বলতাগুলো এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের সীমাবদ্ধতা নিয়ে বেশি বেশি আলোচনা।

( মূল তথ্যসূত্রঃ www.marxists.org এবং লেনিনের বিভিন্ন রচনা)


EmoticonEmoticon