মার্ক্সবাদী দর্শনের ভিত্তি হচ্ছে ডায়ালেক্টিক্স। আমি নিশ্চিত নই, মার্ক্সবাদের অনুসারীরা ডায়ালেক্টিসের অর্থ কীভাবে বুঝেন এবং বুঝান।
কার্ল মার্ক্সের সহযোগী ও মার্ক্সবাদের সহ-প্রণেতা ফ্রেডরিখ এঙ্গেলস তাঁর বিখ্যাত 'ডায়ালেক্টিক্স অফ নেইচার' গ্রন্থে ডায়ালেক্টিক্সের তিনটি সূত্রের কথা বলেছেন, যাদের মধ্যে প্রথমটি হচ্ছে, 'The law of the unity and conflict of opposites' - অর্থাৎ, বিপরীতের ঐক্য ও দ্বন্দ্বের সূত্র।
মার্ক্সবাদীরা পুঁজিবাদী সমাজের দুই বিপরীত শ্রেণীর কথা বলতে গিয়ে, বুর্জোয়া বা ধনিক-বণিক শ্রেণী, ও প্রলেটারিয়েট বা সর্বহারা শ্রমিক শ্রেণীর দ্বন্দ্বের কথা বলেন।
সমাজে শুধু শ্রেণী-দ্বন্দ্ব বুঝলে ডায়ালেক্টিক্সের প্রথম সূত্রের শেষাংশ বুঝা হয়, কিন্তু প্রথমাংশ বুঝা হয় না। কারণ, ডায়ালেক্টিক্সের প্রথম সূত্র অনুসারে, প্রথমেই আসে বিপরীতের ঐক্য, তারপর দ্বন্দ্ব। ঐক্য না থাকলে দ্বন্দ্ব সম্ভব নয়।
এর অর্থ হচ্ছে এই যে, বুর্জোয়া শ্রেণী ও শ্রমিক শ্রেণী যদি একটি জায়গায় অভিন্ন আইডেণ্টিটি বা আত্মপরিচয়ে সংগঠিত না হয়, সেখানে শ্রেণী-সংগ্রাম সম্ভব নয়। প্রশ্ন হচ্ছে এই আত্মপরিচয়ের জায়গাটা কী?
মার্ক্সবাদের ওপর প্রভাব বিস্তারী ফরাসী বিপ্লবে 'স্বাধীনতা-সাম্য-ভ্রাতৃত্ব'র ঘোষণা ব্যক্তি মানুষকে শুধু স্বাধীন করেনি, একের সাথে অন্যের সমতা ও ভ্রাতৃত্ব তথা অভিন্ন সামষ্টিক আত্মপরিচয় দিয়েছিলো। এটিই ছিলো জাতিবোধের দার্শনিক ভিত্তি।
পৃথিবীতে ফরাসী বিপ্লব না হলে, সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব হতো না। অর্থাৎ, জনগণের মধ্যে অভিন্ন আত্মপরিচয় না গড়ে উঠলে, সাম্যের ধারণা আসা সম্ভব নয়। আর, সাম্যের ধারণা না এলে, অন্যের অধীনতা অস্বীকার করে স্বাধীনতার ধারণা আসতে পারে না।
অর্থাৎ, শ্রমিক শ্রেণীকে ভাবতে হবে তারা বুর্জোয়া শ্রেণীর সাথে একটি জায়গায় সমান, এবং সমান বলেই তারা বাস্তবে সাম্যের অধিকার চেয়ে সংগ্রাম করছে। আর, সেই জায়গাটা হচ্ছে অভিন্ন আত্মপরিচয় তথা জাতিগত আত্মপরিচয়।
এই অভিন্ন জাতিগত আত্মপরিচয়ের জায়গাটা - অর্থাৎ ডায়ালেক্টিসের প্রথম সূত্রের প্রথমাংশ - ঠিক না হলে শ্রমিক শ্রেণী অন্যান্য শ্রেণীর সাথে একাত্মও হওয়ার মনোবৈজ্ঞানিক ভিত্তি পায় না। তাই, বিশ্বের যতোগুলো সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব সম্পন্ন হয়েছে, তা সমগ্র জনগণের জাতীয়তাবাদী সাম্য ও স্বাধীনতার সংগ্রামের পথে অভ্যন্তরীণ বঞ্চনার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে হয়েছে।
সমাজ মনোবৈজ্ঞানিকভাবে এটি পরীক্ষিত সত্য যে, শুধু বস্তুগত বঞ্চনায় মানুষ বিদ্রোহ করে না, যদি না তার মধ্যে বঞ্চনার বোধ তৈরি হয়। আর, বঞ্চনার বোধ তৈরিই হয় না, যদি না তার মধ্যে অধিকার বোধ তৈরি হয়। মানুষের ভেতের একের ওপর অন্যের অধিকার বোধ তৈরি হয় না, যদি না তারা অভিন্ন আত্মপরিচয়ে সমান ও স্বাধীন বোধ করে।
আমি বলতে চাই, সফল শ্রেণী সংগ্রামে নিপীড়িত শ্রমজীবী মানুষকে উদ্বুদ্ধ করতে হলে জাতিগত আত্মপরিচয়বোধ, অভিন্ন জাতির অংশ হিসেবে সমতাবোধ এবং তার ভিত্তিতে অধীনতা ও বঞ্চনা অস্বীকার করে স্বাধীনতা ও অধিকারবোধে উদ্দীপ্ত করতে হবে।
শ্রেণী-সংগ্রামীরা যতোদিন পর্যন্ত এই ডায়ালেক্টিক্স না বুঝতে পারেন, ততোদিন পর্যন্ত তার সমাজ বিপ্লব করার মতো শ্রেণী-সংগ্রাম গড়ে গড়ে তুলতে সক্ষম হবে না।
০৩/০৯/২০১৭
লণ্ডন, ইংল্যাণ্ড
EmoticonEmoticon