রবিবার, ১২ নভেম্বর, ২০১৭

এক নামের এক বুর্জোয়া দলের বিপরীতে এক নামের চার বিপ্লবী দল!

বাংলাদেশে বুর্জোয়া-দল বলে যে-দলগুলোকে সে-দেশের প্রলেতারিয়েত বা সর্বহারার দল বলে দাবীদারেরা নির্দেশ করে, তাদের অন্যতম হচ্ছে আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী।

প্রলেতারিয়েত বা সর্বহারা শ্রেণীর প্রতিনিধিত্বের দাবীদারেরা বলেন, বুর্জোয়া শ্রেণী স্বার্থের কারণে পুঁজিবাদী সমাজ ও রাষ্ট্র টিকিয়ে রাখতে শ্রেণীগত ঐক্য রক্ষা করলেও, গোষ্ঠীগত স্বার্থের তাদের বিভিন্ন দল থাকে; বিপরীতক্রমে সর্বহারা শ্রেণীর স্বার্থ এক ও অভিন্ন হওয়ার কারণে তাদের স্বার্থরক্ষাকারী দল একটির বেশি হওয়ার কথা নয়। কথাটা যৌক্তিক।

কিন্তু বাস্তবতা হলো এই যে, ‘বুর্জোয়া’ আওয়ামী লীগ ১টা, বিএনপি ১টা, জামায়াতে ইসলামী ১টা। আর তার বিপরীতে ‘প্রোলেতারিয়েত’ ওয়ার্কার্স পার্টি আছে কমপক্ষে ২টা; জাসদ ৩টা, বাসদ ৪টা। সংখ্যাটা যদি কম বলে থাকি, দুঃখিত।

আর, সবচেয়ে ইণ্টারেষ্টিং বিষয়টি হচ্ছে, সর্বহারা শ্রেণীর দাবীদার নামে এই দলগুলোর নেতৃত্বে সর্বহারা শ্রেণী-মূলের একটি ব্যক্তিকে দেখবেন না। এদের অধিকাংশই ‘খান’, ‘চৌধুরী’, ‘ভুঁইয়া’, ‘সরকার’ (একজন হিন্দু আছেন, তিনিও ‘চক্রবর্তী’), ইত্যাদি সামন্ত পটভূমি থেকে আগত, যারা এখনও সর্বহারা সংস্কৃতি তো দূরের কথা, বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিটি পর্যন্ত অর্জন করতে পারেননি।

এরা পশ্চিমা বুর্জায়া সংস্কৃতিতে চর্চিত ভিন্নমত পোষণ করতে ঐক্যমত ধারণ (agree to disagree) করার কালচার ও টেম্পার পর্যন্ত রপ্ত করতে পারেনি। মুখে যাই বলুন না কেনো, যে-সমস্ত কারণ তাঁরা বার-বার ভেঙ্গেছে, তার মূল কারণের সাথে জনগণের কিংবা সর্বহারা শ্রেণীর বোধিত কোনো সম্পর্ক আছে বলে প্রমাণিত নয়।

বাঙালী জাতি দেখতেই পাচ্ছে, বাংলাদেশের শোষিত শ্রমিক-কৃষক-সহ সর্বহারা ও দরিদ শ্রেণী-সমূহ কেনো রাজনৈতিক সংগ্রামে বাস্তবে প্রতিনিধিত্ব করতে পারছে না। বাস্তবেই, এই শ্রেণীগুলোর কোনো দল আজও পর্যন্ত গড়ে ওঠেনি। গড়ে উঠবে কিনা কিংবা কেউ গড়ে তুলতে চায় কিনা, সেটিও স্পষ্ট ও বিশ্বাসযোগ্যভাবে দৃশ্যমান বা জ্ঞাত নয়।

এই দলগুলোর প্রতিটি ক্ষুদে বলে কখনও কখনও বিভিন্ন কম্বিনেইশনে জোট গড়ে, জোট ভাঙ্গে, ওকে ছেড়ে তাকে ধরে এবং সকলে মিলে সকলকে বামপন্থী নামে নির্দেশ করে, আর শোষিত শ্রমিক-কৃষক-সর্বহারার মুক্তির জন্যে বামগণতান্ত্রিক ঐক্যের জন্যে তারস্বরে আকাশ-বাতাস প্রকম্পতি করে। এদের সৌভাগ্য যে, সর্বহারা শ্রেণীর লোকেরা এদের গুরুত্ব দেয় না; দিলে ঐ সর্বহারা শ্রেণীর লোকেরা এদেরকে চ্যালেইঞ্জ করতো।

নেতাদের অধীনস্থ যে-সকল ‘কর্মী’ আছেন, তাঁদের জন্যে আমার সত্যিই খারাপ লাগে। আমি দেখেছি, ‘কর্মী’রা কর্মচারীর মতো ঐ সমস্ত সামন্ত প্রকৃতির নেতাদের শ্রদ্ধা করেন এবং প্রশ্নাতীত আনুগত্য ও ‘আদর্শ’র নেতাদের মুখের কথাই সত্য বলে বিশ্বাস করেন।

আমি মনে করি, যতোদিন না পর্যন্ত এই ‘কর্মী’বাহিনীর মধ্যে ক্রিটিক্যাল থিংকিং জন্ম নেবে, ততোদিন পর্যন্ত নেতাদের কথা ও কাজের মধ্যে অসংগতি বুঝতে সক্ষম হবেন না। আর বিষয়াদির মধ্যে দ্বন্দ্ব ও অসংগতি বুঝতে সক্ষম না হলে, তাঁরা সঠিকভাবে সঠিক প্রশ্ন করতে পারবেন না; আর সঠিকভাবে সঠিক প্রশ্নটি না করতে পারলে তাঁরা কখনও সত্যকে ধারণ করতে পারবে না।

সমাজের বৈপ্লবিক পরিবর্তন যদি সম্ভব হয়, তার গতিপ্রকৃতি মানুষের বোধগম্য হতে বাধ্য। আর, বোধের জন্য প্রশ্ন করতে শিখতে হবে, সত্যে পৌঁছার পদ্ধতি শিখতে হবে। কিন্তু আমি আন্তরিকভাবে চাই, তাঁরা ‘ক্রিটিক্যাল আঈ’ সম্পন্ন হোন এবং ক্রিটিক্যাল চিন্তা ও ক্রিটিক্যাল প্রশ্ন করতে সক্ষম হোন।

১১/১১/২০১৭
লণ্ডন, ইংল্যাণ্ড


EmoticonEmoticon