মঙ্গলবার, ২১ নভেম্বর, ২০১৭

জাসদ-জন্মে লজ্জা নেই আছে গৌরবঃ চৌধুরীর মিথ্যাচার উন্মোচন

তথাকথিত বাম-বুদ্ধিজীবী ভূতপূর্ব অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী জাসদের জন্মকে কলঙ্কিত করে কী বলেছেন, তা এবছরের ১২ই জানুয়ারী মুক্তমনায় প্রকাশিত হয়েছে তাঁর এক সাক্ষাতকারে। সেই সাক্ষাতকারে তিনি বলেছেনঃ

"দেশ স্বাধীন হওয়ার পরে মুজিব বাহিনী দেশে এসে দুই ভাগ হলো, একটা সিরাজুল আলম খানের আরেকটা শেখ মনির নেতৃত্বে। সিরাজুল আলম খান শেখ মুজিবের কাছে যেতে পারছেন না, বা শেখ মুজিব তাকে সে ভাবে মূল্য দিচ্ছেন না। তার ইচ্ছে তিনি পার্টির সেক্রেটারি হবেন। যখন তা পারছেন না, তখন শক্তি দেখানোর জন্য, জাসদ সংগঠন করেন। দাম বাড়ানোর জন্য। কিন্তু শেখ ডাকলেই তিনি চলে যাবেন, শেখের ডাকের জন্য অপেক্ষা করছেন। মুজিব বাহিনী কিন্তু দুটোই। সিরাজুল আলম খান কোন স্লোগান পাচ্ছেন না খুঁজে। মুজিববাদতো মনিরা নিয়ে নিয়েছে। অন্য কোন স্লোগান নেই। তখন যা আমরা কোনদিন এদের কাছ থেকে শুনিনাই, সেই বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের স্লোগান শুনলাম। শুধু সমাজতন্ত্র নয়, বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র। ছাত্রলীগের ছেলেরা বলছে। এই স্লোগান দিয়ে তারা শক্তি সঞ্চয় করছে।"

একজন অধ্যাপক অধ্যাপনা থেকে অবসর নিলেও, এমেরিটাস হলেও, নিম্ন সংস্কৃতির রাজনীতিকের মতো দায়িত্বহীন মন্তব্য করতে পারেন না। আমি দৃঢ়তার সাথে বলছি, প্রোফেসার এমেরিটাস সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী উপরে যা বলছেন, তা সর্বৈব মিথ্যা।

আমি আমার এই লেখার মধ্য দিয়ে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর এই মিথ্যাকে উন্মোচিত করে জাসদের (বাসদেরও - যেহেতু বাসদের সৃষ্টি জাসদ থেকে) জন্মের প্রতি ছুড়ে দেওয়া কলঙ্কের দাগ মোচন করবো।

(এক)
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী তাঁর সাক্ষাতকারে জাসদের প্রতিষ্ঠাতা সিরাজুল আলম খান সম্পর্কে যে বললেন, তিনি পার্টির [আওয়ামী লীগের] সেক্রেট্যারী হতে চেয়ে না পেরে জাসদ করেছেন, তার পক্ষে তিনি কোনো ঐতিহাসিক প্রমাণ দিতে পারেননি।

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী যে বস্তি-সংস্কৃতির প্রতি ঘৃণা প্রকাশ করে এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃতির সাথে তার সাদৃশ্য নির্দেশ করে একবার বাংলা একাডেমীতে বক্তৃতা করেছিলেন, সেই সংস্কৃতির মতো করেই তিনি ঘাটুয়া প্রকারের আলাপচারিতায় জাসদের জন্মকে কলঙ্কিত করের অপচেষ্টা করেছেন।

জাসদের স্রষ্টা সিরাজুল আলম খানকে এক পদলোভী ও নির্বোধ হিসেবে চিত্রিত করে তিনি বুঝিয়েছেন যে, জাসদ প্রতিষ্ঠার মূলে ছিলো শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগে সেক্রেট্যারীর পদ না পাওয়ার হতাশা। কিন্তু চৌধুরীর এই প্রমাণহীন দাবী যে কতো মিথ্যা তার প্রমাণ আমরা পাই সিরাজুল আলম খানের রাজনৈতিক পদ-পদবীর প্রতি তাঁর মনোভাব কী, তা থেকে।

আমরা বিশ্বব্যাপী রাজনৈতিক দলগুলোতে দেখি, যে-ব্যক্তি নেতৃত্বের আশা করে আদি দল ছেড়ে নতুন দলে গড়েন, তিনি নতুন দলের মধ্যে তাঁর অপূরিত আশা পূরণ করেন। বুদ্ধিমান মানুষেরা যদি আমার এই পর্যবেক্ষণকে একটি সাধারণ সত্য হিসেবে মানেন, তারা নিশ্চয় এটিও মানবেন যে, সিরাজুল ইসলাম চৌধূরীর দাবী যদি সত্য হতো, আওয়ামী লীগের সেক্রেট্যারী হতে না-পারা সিরাজুল আলম খান তাঁর নবগঠিত জাসদের সেক্রেট্যারী বা প্রেসিডেণ্ট হতেন।

কিন্তু বাস্তবে আমরা কী দেখি? সিরাজুল আলম খান জাসদের না ছিলেন প্রেসিডেণ্ট, না ছিলেন সেক্রেট্যারী। তিনি যদি পদ চাইতেন, আওয়ামী লীগের সেই পদ না পেলেও জাসদ গঠন করে তিনি সেই পদ প্রাপ্তির খায়েশ মেটাতে পারতেন।

এটিই সত্য যে, সিরাজুল আলম খান জাসদের প্রতিষ্ঠাত হলেও, জাসদের কোনো পদেই তিনি ছিলেন না। বস্তুতঃ জাসদের অভ্যন্তরে এটি সিরাজুল আলম খানের প্রতি বড়ো একটি সমালোচনা যে তিনি নেতার পদে আসীন না হয়ে রাজনীতি পরিচালনা করতে চেয়েছেন।

সুতরাং এহেন সিরাজুল আলম খানের জাসদ প্রতিষ্ঠাকে যদি সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর মতো একজন বুদ্ধিজীবী আওয়ামী লীগের সেক্রেট্যারী হতে না পেরে করেছেন বলে বুঝে থাকেন ও বুঝাতে চান, তা যদি তাঁর নির্বুদ্ধিতা না হয়, তা অসততা নিশ্চয়।

(দুই)
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর দাবী মতে, 'মুজিববাদ' স্লৌগান শেখ ফজলুল হক মণি নিয়ে যাওয়ার কারণে সিরাজুল আলম খান আর স্লৌগান খুঁজে না পেয়ে শুধু সমাজতন্ত্রের নয়, বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের স্লৌগান দিয়েছেন। এটি এমন একটি ফালতু ও বাজারী মন্তব্য, যা সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর মতো একজন বুদ্ধিজীবীর মুখ নিঃসৃত ভাবতেই আমার রুচিতে বাঁধছে।

উপরের দাবী কি সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী কোনো প্রমাণ দিয়ে করেছেন? না। তাহলে তিনি এমন দাবী কেনো করেছেন? কারণ, তিনি নিজেই বলেছেন যে, তিনি সিরাজুল আলম খানদের কাছ থেকে তিনি সমাজতন্ত্রের স্লৌগান আগে শুনেননি। অর্থাৎ, তিনি যা শুনেননি, সিরাজুল আলমেরা তা বলেননি।

কীভাবে শুনবেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী? তিনি কি শোনার মতো সামাজিক অবস্থানে ছিলেন? কিংবা রাজনৈতিক অবস্থানে?

তিনি কি ১৯৭১ সালের ২রা মার্চে তাঁরই বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনে, তাঁরই  বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র-ছাত্রী সংসদ ডাকসুর ভিপি ও সিরাজুল আলম খানের অনুসারী আসম আব্দুর রবের পতাকা উত্তোলন দেখেছিলেন বা উত্তোলনের কথা কথা শুনেছিলেন?

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর কি সেই উত্তাল দিবসের পরের দিবসে ৩রা মার্চে ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সিরাজুল আলম খানের অনুসারী শাহজাহান সিরাজ কর্তৃক পল্টন ময়দানে পঠিত স্বাধীনতার ইশতেহার শুনেছিলেন বা সেই পাঠের কথা জেনেছিলেন?

সুশীল সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী সম্ভবতঃ পতাকা উত্তোলন কিংবা স্বাধীনতার ইশতেহার পাঠের প্রতি ভ্রুক্ষেপ না করে সুবোধ শিক্ষকের মতো সমগ্র 'একাত্তরের গোলমাল' কালে শিক্ষকতা করে গিয়েছেন। তাই তিনি সিরাজুল আলমদের কাছ থেকে সমাজতন্ত্রের কথা শুনতে পাননি। অথচ গোটা জাতি স্বাধীনতার ইশতেহার 'সমাজতন্ত্র' শুধু নয়, 'কৃষক-শ্রমিক রাজ কায়েম'-এর কথাও শুনেছে।

হে প্রোফেসার এমিরিটাস সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, আপনি এবার আমার কাছ থেকে শুনুন সেই স্বাধীনতার ইশতেহারের অংশ বিশেষঃ

"৫৪ হাজার ৫শত ৬ বর্গমাইল বিস্তৃত ভৌগলিক এলাকায় ৭ কোটি মানুষের জন্যে আবাসিক ভূমি হিসাবে স্বাধীন ও সার্বভৌম এ রাষ্ট্রের নাম হবে 'বাংলাদেশ'। স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ গঠনের মাধ্যমে নিম্নলিখিত তিনটি লক্ষ্য অর্জন করতে হবে।

১, স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ গঠন করে পৃথিবীর বুকে বাঙালীর ভাষা, কৃষ্টি ও সংস্কৃতির পূর্ণ বিকাশের ব্যবস্থা করতে হবে।

২, স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ গঠন করে অঞ্চলে অঞ্চলে ব্যক্তিতে ব্যক্তিতে বৈষম্য নিরসন করে সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি চালু করে কৃষক, শ্রমিক রাজ কায়েম করতে হবে।

৩, স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশে গঠন করে ব্যক্তি, বাক ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা সহ নির্ভেজাল গণতন্ত্র কায়েম করতে হবে।"

শাহজাহান সিরাজের পঠিত স্বাধীনতার ইশতেহারের দ্বিতীয় লক্ষ্য হিসেবে সমাজতন্ত্র ও কৃষক-শ্রমিক রাজের কথা ঘোষিত হয়েছে, তা কি সেদিন 'মুজিবাদ' না পেয়ে ঘোষিত হয়েছিলো? না। তারও পেছনে কাহিনী আছে।

১৯৭০ সালের ১২ই অগাষ্টে অনুষ্ঠিত ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটীর সভায় সিরাজুল আলম খানের অনুসারী নেতারা সমাজতন্ত্রকে তাদের লক্ষ্য হিসেবে প্রস্তাব গ্রহণ করেন। সুনির্দিষ্টভাবে, কেন্দ্রীয় কমটীর অন্যতম নেতা স্বপন কুমার চৌধুরী 'স্বাধীন সমাজতান্ত্রিক বাংলা দেশ' গড়ার প্রস্তাব দিলে তা সেই সভায় গৃহীত হয়।

স্পষ্টতঃ তথাকথিত বাম-বুদ্ধিজীবী হিসেবে নন্দিত এই সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী ১৯৭১ সালের সবচেয়ে অগ্রসর চিন্তার ধারক ও  বাহকদের কথা শুনতে পাননি। কারণ, তিনি শুনতে চাননি। তিনিও অনেকের মতো অন্ধ ও বধির হয়ে ১৯৭১ সালের উত্তাল দিনগুলোতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করে গিয়েছেন।

জাসদ-বাসদের যে লোকেরা ১৯৭১ সালের ২রা মার্চে স্বাধীনতার পতাকা উত্তোলনের ও ৩রা মার্চের স্বাধীনতার ইশতেহার পাঠের এবং ১৯৭২ সালের ৩১শে অক্টোবরের জাসদ প্রতিষ্ঠার ইতিহাসকে উত্তরাধিকার মনে করেন, তাদের উদ্দেশে বলবোঃ সেই ইতিহাস লজ্জার নয়, সেই জন্ম লজ্জার নয় - মহান বিপ্লবী গৌরবের।

আমি সেই বিপ্লবী গৌরবের উত্তরাধিকারকে সমস্ত দায়িত্ব নিয়ে সীমাহীন স্পর্ধার সাথে প্রোফেসার এমিরিটাস সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর মিথ্যাভাষণকে উন্মোচিত করে ইতিহাসের আঁস্তাকুড়ে নিক্ষেপ করলাম!

বিপ্লব দীর্ঘজীবী হোক!


EmoticonEmoticon