বাংলাদেশের ইতিহাসে ১৪ ফেব্রুয়ারি একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন। এই দিনে ছাত্রদের রক্তে রক্তাক্ত হয়েছিল ঢাকার রাজপথ। সামরিক স্বৈরশাসক এরশাদের হাতে গড়ে ওঠা মজিদ খানের শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্যের মিছিলে গুলি চালায় পুলিশ বাহিনী। প্রাণ দেয় জাফর জয়নাল কাঞ্চন দীপালীসাহা সহ অনেকেই।
এই ফেব্রুয়ারি মাস আমাদের কাছে আরেকটি কারণে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই মাসের ২১ তারিখ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে ছাত্ররা আন্দোলন গড়ে তোলে। ভাষা আন্দোলন দুই পর্ব গড়ে ওঠে। প্রথম পর্ব ছিল ১৯৪৭ সালের শেষের দিক থেকে ১৯৪৮ সালের সময় পর্যন্ত। যা শুরু হয়েছিল ‘তমদ্দুন মজলিস’ নামে একটি সাংস্কৃতিক সংগঠন দ্বারা। এর আগে ১৯৪৭ সালের ১৪ ই আগষ্ট পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম হয়। পাকিস্তান জন্মের সাথে সাথে রাষ্ট্রভাষার প্রশ্ন সামনে চলে আসে। পাকিস্তানের শাসক শ্রেণী উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার পরিকল্পনা করে। কিন্তু গোটা পাকিস্তান রাষ্ট্রের দুই তৃতীয়াংশ জনগণের ভাষা বাংলাকে উপেক্ষা করা হয়। বাংলাভাষার বিকাশ বৃহত্তর বাংলার জনগণের মাধ্যমে হিন্দু মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের ভূমিকা থাকলেও পাকিস্তানি শাসকরা বাংলাকে হিন্দু ভাষার লেবাছ দিতে চেয়েছিল এবং উর্দুকে মুসলমানের ভাষার লেবাছ দিতে চেয়েছিল। উর্দু পাকিস্তানের কোন অঞ্চলের ককথ্যভাষা ছিল না, ছিল অভিজাত শ্রেণীর ভাষা। আর বাংলা ছিল একেবারে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ভাষা আর সংস্কৃত ছিল অভিজাত শ্রেণীর ভাষা। বাংলাভাষা উচ্চারণের সাথে তার অক্ষরের একটি মৌলিক সংযোগ থাকলেও বাংলার অক্ষর পরিবর্তনের চেষ্টাও হয়েছিল। অক্ষর পরিবর্তনের কিছু প্রোজেক্ট হাতে নিয়েছিল তখনকার পাকিস্তান শিক্ষাবিভাগ যা শেষপর্যন্ত প্রতিষ্ঠা পায়নি। প্রথমে ছাত্র আন্দোলনের মধ্য দিয়ে ভাষা আন্দোলন শুরু হলেও আস্তে আস্তে তা গণ আন্দোলনে রূপ নেয়। যা পাকিস্তান রাষ্ট্র এবং স্বাধীন বাংলাদেশের খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কেননা পরবর্তীতে দেখা গেছে আইয়ুব খানের শিক্ষানীতির বিরোদ্ধে ছাত্ররা আন্দোলন শুরু করেছিল যার পরিণতিতে ৬৯ এর গণ অভ্যুত্থান সূচিত হয়।
ঠিক এভাবে দেখা গেছে এরশাদের স্বৈরশাসনের বিরোদ্ধে প্রথমে ছাত্ররা আন্দোলন শুরু করেছিল। পরে রাজনৈতিক দলগুলো আন্দোলনে নামে। কিন্তু ছাত্ররা আন্দোলনকে শক্তি জুগিয়েছে। যার ফলে ৯০ এর স্বৈরশাসকের পতন ঘটে।
কিন্তু শত প্রাণের বিনিময়ে যে গণতন্ত্রের লড়াই, যে সার্বজনীন শিক্ষার আন্দোলন আজো বাস্তবায়িত হয়নি। সংসদীয় গণতন্ত্রের নামে স্বৈরতন্ত্র এখনো আমাদের ঘাড়ে বসতি স্থাপন করেছে। শিক্ষাকে বানিজ্যিক পণ্যে পরিণত করা হয়েছে, ধারাবাহিক প্রশ্নফাঁসের মধ্য দিয়ে শিক্ষার গুণগত মানকে তলানিতে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। এর সাথে শিক্ষার সাম্প্রদায়িকরণ, অবৈজ্ঞানিক কূপমুণ্ডুক ধারণা শিক্ষার মধ্যে নিয়ে আসা হয়েছে। বাংলাকে উপেক্ষা করে শিক্ষার বিভিন্ন মাধ্যম রাখা হয়েছে। ফলে আজকের দিনের ছাত্র সমাজের কর্তব্য ফুরিয়ে যায় নি। ছাত্রদের ঐতিহাসিক দায়িত্ব হল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে গণতান্ত্রিক পরিবেশ, শিক্ষার বাণিজ্যকরণ, পণ্যায়ণের বিরোদ্ধে লড়াই করার সাথে সাথে সাধারণ জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকারের পক্ষে লড়াই গড়ে তোলা। গণতন্ত্রের পতাকা আজ খামছে ধরেছে সেই পূরানো শকুন। তাঁদের হাত থেকে ক্ষমতা ছিনিয়ে এনে জনগণের হাতে ক্ষমতা ফিরিয়ে দেওয়া। যেই কাজ করবে আজকের লড়াকু ছাত্র সমাজ। তাঁদের সাহসী প্রদক্ষেপের দিকে তাকিয়ে আছে গোটা জাতি।
EmoticonEmoticon