ভারতীয় উপমহাদেশে হিন্দু মুসলমান দাঙ্গায় বহু মানুষের জীবন হারিয়েছে। এই দাঙ্গার মূল কারিগর ছিল রাজনীতি। হর্থাৎ ধর্মকে যতদিন রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করেছে তার উদ্দেশ্যে, ততদিন মানুষ তার বলি হয়েছে। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার ভয়াবহ রূপ আমরা জেনেছি ১৯৪৬ সালের কলকাতার দাঙ্গা। সেখানে মুসলিমলীগের একটি আন্দোলনকে কেন্দ্র করে হিন্দু মহাসভা সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাস শুরু করে। ফলে সেখানে মুসলমানরাও দাঙ্গায় জড়িত হয়। হাজার হাজার মানুষ দাঙ্গার ফলে মারা যায়। কলকাতার দাঙ্গার রেশ ধরে নোয়াখালী ও ভারতের বিভিন্ন জায়গায় দাঙ্গা ছড়িয়ে গিয়েছিল। হাজার হাজার মানুষের রক্তে রাজপথ রঞ্জিত হলেও এতে কার লাভ হয়েছে? সাধারণ মানুষ অকাতরে জীবন দিলেও মূলত লাভ হয়েছিল জিন্নাহ আর নেহেরুদের। উনারা সহজে ভারতকে কাঁটাছেড়া করেছিলেন। ফলে এই সাম্প্রদায়িকতার হাত দিয়ে বাংলা বিভক্ত হল। পূর্ব বাংলা পাকিস্তানের সাথে আর পশ্চিম বাংলা ভারতের সাথে। দুই বাংলার একই ভাষাভাষী মানুষের হৃদয় পুড়েছিল এই সাম্প্রদায়িকতার হাত ধরে। ভারত পাকিস্তান আলাদা দেশ হবার পরেও এই দাঙ্গা বন্ধ হয় নাই। সামান্য কোন উপলক্ষ পেলে তা মাথাচাড়া দিয়ে উঠে। ১৯৫০ সালে পশ্চিমবঙ্গে আবারও দাঙ্গা বাঁধে যার রেশ ধরে পূর্ব বঙ্গে দাঙ্গার সূত্রপাত ঘটলেও বেশি মাথাছাড়া দিয়ে উঠতে পারে নাই।
খুলনায় একটি ঘটনা ঘটেছিল এরকম। যদিও এটাকে সাম্প্রদায়িক বলা যাবে না। তারপরও সাম্প্রদায়িকতার রেশ ছিল। তখনকার সময় সরকারীভাবে কৃষকদের কাছ থেকে ধান সংগ্রহ করা হত যাকে বলা হত লেভী। এই লেভির মূল্য ছিল বাজার মূল্য থেকে অনেক কম। গরীব কৃষকরা সহজে লেভি দিতে চাইতো না। খুলনায় তখন ছিল কমিউনিস্ট প্রভাবিত কৃষক সমিতির ভাল কাজ। ফলে গরীব হিন্দু কৃষকরা আন্দোলন শুরু করে। সরকারের পক্ষ থেকে দমনপীড়ন শুরু হয়। কৃষকরা প্রতিরোধ গড়ে তুললে পুলিশের সাথে আনসার বাহিনী সেখানে নিযুক্ত করা হয়। কিন্তু সংগঠিত কৃষকদের পিছু হঠানো যায় নাই। তখন আনসাররা স্থানীয় মুসলমানদের লেলিয়ে দিয়েছিল নিম্নবর্গের হিন্দু কৃষকদের বিরুদ্ধে। ফলে কৃষক আন্দোলনকে দমন করতে মূলত সাম্প্রদায়িকতার কৌশল।
সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বাঁধলে ধর্ম বা ধার্মিকদের লাভ হয় না, লাভ হয় এর থেকে ফায়দা লুটা সুবিধাবাদী লোকদের। কারণ গরীব হিন্দু গরীব মুসলমানকে মারলে দুইজন গরীব মারা গেল। আর রাজনৈতিক সুবিধা নিল নেতারা। যে সব দেশে রাষ্ট্র নাগিরিকদের নিরাপত্তা দিতে পারেনা বরং ধর্মকে রাজনৈতিক ইজম হিসেবে ব্যবহার করা হয় তা স্রেফ রাজনৈতিক স্বার্থে। এখানে ধর্মের লাভ কিছুই হয় না, বরং ক্ষতি হয় ধর্মের প্রতি মানুষের ঘৃণা বৃদ্ধি পায়।
পশ্চিমবঙ্গের আসানসোলে সাম্প্রদায়িক উস্কানি দিয়ে এক মুসলমান ইমামের ছেলেকে হত্যা করেছে গেরুয়া বাহিনী। কিন্তু ইমান সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার উত্তেজনা থেকে মানুষকে রক্ষা করেছেন। এখানেই তার মহত্ত্ব।
আমরা চাই এই পৃথিবী মানুষের বাসযোগ্য হয়ে উঠুক। মানুষের প্রতি মানুষের হিংসা বিদ্বেষ শোষণ নিপীড়ন বন্ধ হোক। প্রত্যেক জাতি সম্প্রদায়ের প্রতি শ্রদ্ধাশীল আচরণ করুন। নিজেকে শ্রেষ্ঠ মনে করা, নিজের ধর্ম শ্রেষ্ঠ মনে করা ধাম্ভিকতা, তা পরিহার করুন। নিজের আশেপাশের ভিন্ন ধর্মের, ভিন্ন জাতির মানুষের প্রতি আন্তরিক হয়ে উঠুন দেখবেন পৃথিবী সুন্দর হয়ে উঠেছে, মানুষের বসবাসের উপযোগী হয়ে উঠেছে। সাম্প্রদায়িকতা নিপাত যাক, দাঙ্গাবাজ নিপাত যাক, মনুষ্যত্ব মুক্তি পাক।
EmoticonEmoticon