শুক্রবার, ১৮ মে, ২০১৮

নির্বাচনপন্থী এবং নির্বাচনবিরোধী উভয় ‘কমিউনিস্ট’ই শেষ বিচারে ভোটবাজ!

আধুনিক ইয়োরোপে যখন মোটামুটি ইলেকশনে ‘ফেয়ারনেস’ ছিল, তখনকার শাসকশ্রেণির মধ্যে নির্বাচনী টুলসটাকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা ছিল তার পরও মার্কস বুর্জোয়া নির্বাচন প্রসঙ্গে বলেছেনঃ “প্রত্যেক বিপ্লবেরই মুল প্রশ্ন হচ্ছে রাষ্ট্র-ক্ষমতা দখলের প্রশ্ন। আর সর্বহারা বিপ্লবের মূল প্রশ্ন হচ্ছে শক্তি প্রয়োগের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্র-ক্ষমতা দখল ও বুর্জোয়া রাষ্ট্র-যন্ত্রকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করণ, সর্বহারাশ্রেণীর একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠা এবং সর্বহারা রাষ্ট্র দ্বারা বুর্জোয়া রাষ্ট্রের স্থলাভিষিক্তকরণ।
মার্কসবাদ সব সময়ই হিংসাত্মক বিপ্লবের অনিবার্যতার কথা ঘোষণা করেছে। মার্কসবাদ দেখিয়ে দিয়েছে, হিংসাত্মক বিপ্লব হলো সমাজতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠার ধাত্রীমাতা, বুর্জোয়া একনায়কত্বের স্থলে সর্বহারা একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠা করার একমাত্র পথ, এবং সর্বহারা বিপ্লবের সার্বজনীন নিয়ম।“

বাংলাদেশের কমিউনিস্ট নামধারীরা মার্কসের এই চিরন্তন অমোঘ সত্য আর দৃঢ় নির্দেশনা গুলে খেয়ে বসে আছেন।
কথা হচ্ছে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি বা সিপিবি’কে নিয়ে তারা খুলনায় মেয়র নির্বাচনে ৫৩৪টি ভোট পেয়েছে। সেটা নিয়েই ফেসবুক-এ গত দুদিন ধরে ট্রল চলছে।

সিপিবি’র পক্ষ থেকে এই ৫৩৪ ভোটের সাফাই চলতে পারে। ‘কোয়ানন্টিটি নয় কোয়ালিটি বড় কথা’ বা এই ধরণের ফাঁপা ব্যাখ্যা ট্যাখ্যাও আসতে পারে, কিন্তু দগদগে বাস্তবতা হল ভোটের মাধ্যমে যারা জয়ী হয়ে রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করতে চায় তারা আর কোথাও না হোক অন্তত সেই ভোটের বিষয়ে সর্বশক্তি নিয়োগ করবে সেটাই প্রত্যাশিত। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে এরা না ঘর কা, না ঘাট কা! ভোটেও জামানত বাজেয়াপ্ত আর বল প্রয়োগ তো তারা কশ্মিণকালেও করবে না বলে দিয়েছে। তার পরও একটি বিষয়ে তারা হিপো নয়- সশস্ত্র সংগ্রামের কথা বলে ভোট করে না, সশস্ত্র সংগ্রামের বিরোধীতা করেই ভোট করে।

এদের নিয়ে যারা হাসি তামাশা করছে তাদের অনেকেই কমিউনিস্ট নামধারী, কিংবা সোস্যাল ডেমোক্র্যাট। এদের কেউ কেউ সশস্ত্র বল প্রয়োগে বিশ্বাসী এবং কেউ নিরস্ত্র গণঅভ্যুত্থান কেউ সশস্ত্র গণঅভ্যুত্থানে বিশ্বাসী। তারা সেই মত পার্টিতেও অনুশীলন করে। এই পার্টি/গ্রুপ/দল/গোষ্ঠিগুলো গত ৪০/৫০ বছরে কোনো গণঅভ্যুত্থান গড়ে তুলতে পারেনি। এদের কেউ কেউ ভোটে দাঁড়িয়ে নিজের পরিবারের সবার ভোটও পায়নি!
তার পরও এদের ভোটের মোহ কাটে না! ভোট যেন স্বচ্ছ নিরপেক্ষ আর শান্তিপূর্ণ হয় সে জন্য সারা বছর ঘ্যান ঘ্যান করে বিলাপ করতে থাকে। কেউ কেউ কিম্ভূতকিমাকার অশ্বডিম্ব- ‘না ভোট’ এর দাবী করে!

এদের আরেকটি ‘পরিপক্ক’ অংশ এক সময় সশস্ত্র সংগ্রামের কথা বলত এবং কোথাও কোথাও প্রাকটিসও করত, তারাও এখন প্রেসক্লাবে ট্রেড ইউনিয়ন-এর দাবীতে ব্যানার হাতে ফটোসেশসন করে! অথচ ট্রেড ইউনিয়ন হলো শ্রমিক শ্রেণির বৈপ্লবীক শক্তির মুখে নাইট্রিক এসিড ঢেলে দেয়া। শ্রমিক শ্রেণিকে পঙ্গু অথর্ব করে দেয়া।

ভোট, বিশেষ করে এই অঞ্চলের (যেখানে সামন্ত, ধর্মীয়, গোঁড়ামি আর কিঞ্চিত আধুনিকতা ককটেল হয়ে এক চোলাই তৈরি করেছে) শাসকদের কাছে ‘পৈত্রিকসূত্রে পাওয়া’ বা ‘এজমালি অধিকারে পাওয়া’ ক্ষমতা। যা দিয়ে তারা নিজেদের নিরঙ্কুশ ক্ষমতা নিশ্চিত করবার পর সামান্য দুচারটি আসন গৃহপালিতদের জন্য বরাদ্দ রাখে। যারা ভোটে জেতার জন্য এমন কোনো নৃশংসতা নেই যা গ্রহণ করে না! একটি ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনেও দু’দশটা লাশ ফেলে দেয়া তাদের কাছে বাদামের খোসা ফেলার মত!

এইরকম পরিবেশ-পরিস্থিতিতে যে বাম কমিউনিস্ট দলগুলো ‘ভোটে জিতে জনগণকে মুক্ত করব’ বলে তারা শুধু নিরেট নির্লজ্জ শাসকশ্রেণির চাটুকারই নয়, মিথ্যুক এবং প্রতারকও বটে।

অ্যাটমোস্ফীয়ারে কখনোই ভ্যাকিউম থাকে না। এই ধরণের নিবীর্জ নির্বিষ ভীতু আপোষকামীরা ক্ষয়িষ্ণু হতে হতে যে ভ্যাকিউম তৈরি করেছে সেটা পুরণ করেছে উগ্র ধর্মী মৌলবাদীরা। তারাই এখন চাপাতি, তলোয়ার আর বোমা মেরে ‘জালিমের’ হাত থেকে ‘মজলুমকে’ মুক্ত করার ধাপ্পাবাজী করতে পারছে।

এত কথা লিখে কি হয়?শেষ করি মহান শিক্ষাগুরু কার্ল মার্কসের একটি অমর উক্তি দিয়ে- “এসব ভদ্রলোকেরা কখনো কি বিপ্লব দেখেছেন? বিপ্লব হল নিঃসন্দেহেই সবচেয়ে কর্তৃত্বপরায়ণ ব্যাপার- যত কর্তৃত্বমূলক হওয়া সম্ভব; বিপ্লব হল এমন একটা কাজ যা দ্বারা জনসাধারণের একাংশ বন্দুক, বেয়োনেট আর কামান মারফত, অর্থাৎ সর্বাপেক্ষা কর্তৃত্বমূলক উপায়ে তাদের ইচ্ছা চাপিয়ে দেয় অপরাংশের উপর। আর বিজয়ী দলকে অবশ্যই তার প্রভুত্ব বজায় রাখতে হবে সন্ত্রাসের [terror] মাধ্যমে, যে বিজয়ী দলের অস্ত্র প্রতিক্রিয়াশীলদের মনে সঞ্চার করে ত্রাসের। বুর্জোয়াদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র জনগণের কর্তৃত্ব প্রয়োগ না করলে প্যারি কমিউন কি একদিনের জন্যও টিকে থাকত?


EmoticonEmoticon