মুনজুরুল হক লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
মুনজুরুল হক লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

শুক্রবার, ১৮ মে, ২০১৮

নির্বাচনপন্থী এবং নির্বাচনবিরোধী উভয় ‘কমিউনিস্ট’ই শেষ বিচারে ভোটবাজ!

আধুনিক ইয়োরোপে যখন মোটামুটি ইলেকশনে ‘ফেয়ারনেস’ ছিল, তখনকার শাসকশ্রেণির মধ্যে নির্বাচনী টুলসটাকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা ছিল তার পরও মার্কস বুর্জোয়া নির্বাচন প্রসঙ্গে বলেছেনঃ “প্রত্যেক বিপ্লবেরই মুল প্রশ্ন হচ্ছে রাষ্ট্র-ক্ষমতা দখলের প্রশ্ন। আর সর্বহারা বিপ্লবের মূল প্রশ্ন হচ্ছে শক্তি প্রয়োগের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্র-ক্ষমতা দখল ও বুর্জোয়া রাষ্ট্র-যন্ত্রকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করণ, সর্বহারাশ্রেণীর একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠা এবং সর্বহারা রাষ্ট্র দ্বারা বুর্জোয়া রাষ্ট্রের স্থলাভিষিক্তকরণ।
মার্কসবাদ সব সময়ই হিংসাত্মক বিপ্লবের অনিবার্যতার কথা ঘোষণা করেছে। মার্কসবাদ দেখিয়ে দিয়েছে, হিংসাত্মক বিপ্লব হলো সমাজতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠার ধাত্রীমাতা, বুর্জোয়া একনায়কত্বের স্থলে সর্বহারা একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠা করার একমাত্র পথ, এবং সর্বহারা বিপ্লবের সার্বজনীন নিয়ম।“

বাংলাদেশের কমিউনিস্ট নামধারীরা মার্কসের এই চিরন্তন অমোঘ সত্য আর দৃঢ় নির্দেশনা গুলে খেয়ে বসে আছেন।
কথা হচ্ছে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি বা সিপিবি’কে নিয়ে তারা খুলনায় মেয়র নির্বাচনে ৫৩৪টি ভোট পেয়েছে। সেটা নিয়েই ফেসবুক-এ গত দুদিন ধরে ট্রল চলছে।

সিপিবি’র পক্ষ থেকে এই ৫৩৪ ভোটের সাফাই চলতে পারে। ‘কোয়ানন্টিটি নয় কোয়ালিটি বড় কথা’ বা এই ধরণের ফাঁপা ব্যাখ্যা ট্যাখ্যাও আসতে পারে, কিন্তু দগদগে বাস্তবতা হল ভোটের মাধ্যমে যারা জয়ী হয়ে রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করতে চায় তারা আর কোথাও না হোক অন্তত সেই ভোটের বিষয়ে সর্বশক্তি নিয়োগ করবে সেটাই প্রত্যাশিত। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে এরা না ঘর কা, না ঘাট কা! ভোটেও জামানত বাজেয়াপ্ত আর বল প্রয়োগ তো তারা কশ্মিণকালেও করবে না বলে দিয়েছে। তার পরও একটি বিষয়ে তারা হিপো নয়- সশস্ত্র সংগ্রামের কথা বলে ভোট করে না, সশস্ত্র সংগ্রামের বিরোধীতা করেই ভোট করে।

এদের নিয়ে যারা হাসি তামাশা করছে তাদের অনেকেই কমিউনিস্ট নামধারী, কিংবা সোস্যাল ডেমোক্র্যাট। এদের কেউ কেউ সশস্ত্র বল প্রয়োগে বিশ্বাসী এবং কেউ নিরস্ত্র গণঅভ্যুত্থান কেউ সশস্ত্র গণঅভ্যুত্থানে বিশ্বাসী। তারা সেই মত পার্টিতেও অনুশীলন করে। এই পার্টি/গ্রুপ/দল/গোষ্ঠিগুলো গত ৪০/৫০ বছরে কোনো গণঅভ্যুত্থান গড়ে তুলতে পারেনি। এদের কেউ কেউ ভোটে দাঁড়িয়ে নিজের পরিবারের সবার ভোটও পায়নি!
তার পরও এদের ভোটের মোহ কাটে না! ভোট যেন স্বচ্ছ নিরপেক্ষ আর শান্তিপূর্ণ হয় সে জন্য সারা বছর ঘ্যান ঘ্যান করে বিলাপ করতে থাকে। কেউ কেউ কিম্ভূতকিমাকার অশ্বডিম্ব- ‘না ভোট’ এর দাবী করে!

এদের আরেকটি ‘পরিপক্ক’ অংশ এক সময় সশস্ত্র সংগ্রামের কথা বলত এবং কোথাও কোথাও প্রাকটিসও করত, তারাও এখন প্রেসক্লাবে ট্রেড ইউনিয়ন-এর দাবীতে ব্যানার হাতে ফটোসেশসন করে! অথচ ট্রেড ইউনিয়ন হলো শ্রমিক শ্রেণির বৈপ্লবীক শক্তির মুখে নাইট্রিক এসিড ঢেলে দেয়া। শ্রমিক শ্রেণিকে পঙ্গু অথর্ব করে দেয়া।

ভোট, বিশেষ করে এই অঞ্চলের (যেখানে সামন্ত, ধর্মীয়, গোঁড়ামি আর কিঞ্চিত আধুনিকতা ককটেল হয়ে এক চোলাই তৈরি করেছে) শাসকদের কাছে ‘পৈত্রিকসূত্রে পাওয়া’ বা ‘এজমালি অধিকারে পাওয়া’ ক্ষমতা। যা দিয়ে তারা নিজেদের নিরঙ্কুশ ক্ষমতা নিশ্চিত করবার পর সামান্য দুচারটি আসন গৃহপালিতদের জন্য বরাদ্দ রাখে। যারা ভোটে জেতার জন্য এমন কোনো নৃশংসতা নেই যা গ্রহণ করে না! একটি ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনেও দু’দশটা লাশ ফেলে দেয়া তাদের কাছে বাদামের খোসা ফেলার মত!

এইরকম পরিবেশ-পরিস্থিতিতে যে বাম কমিউনিস্ট দলগুলো ‘ভোটে জিতে জনগণকে মুক্ত করব’ বলে তারা শুধু নিরেট নির্লজ্জ শাসকশ্রেণির চাটুকারই নয়, মিথ্যুক এবং প্রতারকও বটে।

অ্যাটমোস্ফীয়ারে কখনোই ভ্যাকিউম থাকে না। এই ধরণের নিবীর্জ নির্বিষ ভীতু আপোষকামীরা ক্ষয়িষ্ণু হতে হতে যে ভ্যাকিউম তৈরি করেছে সেটা পুরণ করেছে উগ্র ধর্মী মৌলবাদীরা। তারাই এখন চাপাতি, তলোয়ার আর বোমা মেরে ‘জালিমের’ হাত থেকে ‘মজলুমকে’ মুক্ত করার ধাপ্পাবাজী করতে পারছে।

এত কথা লিখে কি হয়?শেষ করি মহান শিক্ষাগুরু কার্ল মার্কসের একটি অমর উক্তি দিয়ে- “এসব ভদ্রলোকেরা কখনো কি বিপ্লব দেখেছেন? বিপ্লব হল নিঃসন্দেহেই সবচেয়ে কর্তৃত্বপরায়ণ ব্যাপার- যত কর্তৃত্বমূলক হওয়া সম্ভব; বিপ্লব হল এমন একটা কাজ যা দ্বারা জনসাধারণের একাংশ বন্দুক, বেয়োনেট আর কামান মারফত, অর্থাৎ সর্বাপেক্ষা কর্তৃত্বমূলক উপায়ে তাদের ইচ্ছা চাপিয়ে দেয় অপরাংশের উপর। আর বিজয়ী দলকে অবশ্যই তার প্রভুত্ব বজায় রাখতে হবে সন্ত্রাসের [terror] মাধ্যমে, যে বিজয়ী দলের অস্ত্র প্রতিক্রিয়াশীলদের মনে সঞ্চার করে ত্রাসের। বুর্জোয়াদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র জনগণের কর্তৃত্ব প্রয়োগ না করলে প্যারি কমিউন কি একদিনের জন্যও টিকে থাকত?

সোমবার, ১৪ মে, ২০১৮

শ্রদ্ধাঞ্জলি

ভারতবর্ষে কমিউনিস্ট পার্টি জন্মের পর থেকে পঞ্চ নদ আর হিমালয় থেকে কম জল গড়িয়ে সাগরে পড়েনি, কেবল এই অঞ্চলে সামন্ত, বুর্জোয়া, ধর্মাশ্রয়ী শাসকশ্রেণির অনিঃশেষ শোষণ থেকে মানুষকে মুক্ত করা যায়নি। প্রবল পরাক্রমশালী ব্রিটিশরাজ খেদাতে পারলেও ভারতবাসী স্বজাতির লুটেরা-শোষক-নিপীড়কদের হঠাতে পারেনি।
একজনই শুধু পেরেছিলেন সাময়ীক সময়ের জন্য। তিনিই সর্বপ্রথম ভারতবর্ষের আজন্ম নিপীড়িত-শোষিত ভূমিহীন কৃষককে জমির মালিকানার স্বাদ দিয়েছিলেন। কিছু সময়ের জন্য পশ্চিবঙ্গের কিছু অঞ্চলের ভূমিহীনরা ভূমির মালিকানা পেয়েছিল। নিজ ভূমিতে সোজা হয়ে দাঁড়িয়েছিল যে মানুষটির জন্য, তিনি চারু মজুমদার। ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (এম-এল) এর প্রতিষ্ঠাতা। নেতা-কর্মীরা যাকে আপন করে ‘চারুদা’ বলে ডাকতেন। এত বছর পরও যিনি ভারতের তথা এই অঞ্চলের কমিউনিস্ট বিপ্লবের অথোরিটি।
 
উপমহাদেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনের আর এমন একজন শীর্ষস্থানীয় নেতার নাম করা যাবে না যিনি শত্রুর হাতে বিপ্লবের জন্য, মানুষের মুক্তির জন্য প্রাণ দিয়েছেন। মুজফ্ফর আহমেদ নন, ডাঙ্গে, রণদিভে, অজয় ঘোষ, রাজেশ্বর রাও, নাম্বুদ্রিপাদ কেউই নন। চারু মজুমদারই ছিলেন প্রথম শীর্ষস্থানীয় একজন নেতা যিনি কারার ঐ লৌহ কপাটের অন্তরালেও নয়, খোদ পুলিশ প্রসাশনের হেড কোয়ার্টার্সেই প্রাণ দিয়েছেন ২৮ শে জুলাই ১৯৭২ সালে। ধরা পড়ার মাত্র এগার দিনের মাথায়। মারা যাওয়ার সময় তাঁর বয়স হয়েছিল মাত্র ৫৪ বছর। আরও ২০ বছর বাঁচলে কী হতে পারত আমর
আজ ১৪ মে তাঁর জন্মদিন। যে মানুষটি কার্ডিয়াক অ্যাজমা নিয়ে প্রায়শই মুখ দিয়ে রক্তক্ষরণ হওয়া অবস্থায় অক্সিজেন সিলিন্ডার ও পেথিড্রিন ইঞ্জেকশনসহ দু:সহ আন্ডারগ্রাউন্ড জীবন কাটিয়েছেন ৩টি বছর!
এই ব্যতিক্রমী ব্যক্তিত্বের বিভিন্ন দিকগুলো আলোচনা আমাদের সাধ্যের মধ্যেই সীমিত। টলস্টয়ের কথায় ‘জীবন শিল্পের চেয়ে মহান’। এতবড় মাপের মানুষ , যিনি একটা ঐতিহাসিক সময়কে প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন, তাঁকে সামগ্রিক উপলব্ধি নিয়ে অনুধাবন করতে গেলে যে দক্ষতা ও সময় প্রয়োজন ছিল তার অধিকারী আমরা ছিলাম না। তবে আশা এইটুকু যে, মুক্ত ভারতের তথা মুক্ত উপমহাদেশের যে স্বপ্ন তিনি ও তাঁর সহকর্মীরা দেখেছিলেন তাকে সফল করতে হলে অনেক কাজের মধ্যে চারু মজুমদারকে উপলব্ধির স্তরকে উন্নত করাটাও একটা কাজ,
আশার কথা এই বোধ ক্রমশঃ সঞ্চারিত হচ্ছে। আর তাঁকে জানা মানেই তাঁর দুর্দমনীয় স্পিরিট ও প্রাসঙ্গিকতা বোঝা।
বসন্তের বজ্র নির্ঘোষ খ্যাত মহান নকশালবাড়ি কৃষক সংগ্রামের রূপকার, বর্ণচোরা সংশোধোনবাদী-নয়াসংশোধোনবাদীদের কবর রচনাকারী এবং শ্রেণীসংগ্রামের উচ্চতর রূপের প্রবক্তা ও প্রয়োগবিদ এবং ভারতবর্ষের বিপ্লবের অথোরিটি মহান নেতা কমরেড চারু মজুমদার লাল সালাম।

রবিবার, ৪ মার্চ, ২০১৮

কমরেড স্তালিনের ৬৫তম মৃত্যুবার্ষিকীতে তাঁর প্রতি পার্টিজান শ্রদ্ধা।

১৯৫৩ সালের ৫ মার্চ মস্কোর উপকণ্ঠে রাষ্ট্রীয় খামার বাড়িতে  জোসেফ স্তালিন মারা যান। সরকারি ভাষ্য অনুযায়ী, ৭৪ বছর বয়সী স্তালিনের মৃত্যুর কারণ ছিল মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ, কিন্তু খুব শিগগিরই তার মৃত্যুর সাথে সোভিয়েত সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মচারীদের জড়িত থাকার গুজব ছড়িয়ে  পড়তে থাকে, আর পরবর্তীকালে নবনিযুক্ত শাসক কর্তৃপক্ষ খোলাখুলি ঘোষণা করে, যে সোভিয়েত ইউনিয়নের ইনটেলিজেন্স দফতরের তৎকালীন মুখ্য পদাধিকারী লাভ্রেন্তি বেরিয়ার চক্রান্তের শিকার হয়েছিলেন স্তালিন, আসলে কী ঘটেছিল?

২৮ ফেব্রুয়ারি স্তালিন তার খামার বাড়িতে বেরিয়া ও নিকিতা ক্রুশ্চভ কমিউনিস্ট পার্টির পলিটব্যুরোর কয়েকজন সদস্যকে জড়ো করেছিলেন। কী নিয়ে সেখানে কথাবার্তা হয়েছিল জানা না গেলেও, এটুকু জানা আছে যে বাক্যালাপ চলেছিল ভোর ৪টা পর্যন্ত, তারপরে যে যার গন্তব্যে রওনা দেন আর স্তালিন যান শয্যাকক্ষে, ১ মার্চ মধ্যাহ্নের পর স্তালিনের প্রহরীরা উদ্বিগ্ন হতে শুরু করে। স্তালিন তার মহল থেকে বেরোননি বা  কাউকে ডেকেও পাঠাননি। নির্দেশ মতো, না ডাকলে প্রহরীদের স্তালিনের কাছে যাওয়ার অধিকার ছিল না। অবশেষে রাত ১১টার সময় একজন দেহরক্ষী সাহস করে স্তালিনের কাছে গিয়ে তাকে মেঝেতে পড়ে থাকতে দেখে। তখনো তার দেহে প্রাণ ছিল কিন্তু বাকশক্তি লোপ পেয়েছিল, সন্ত্রস্ত প্রহরীরা তাকে ডিভানে শুইয়ে বেরিয়াকে ফোন করতে শুরু করল, বেরিয়ার অনুমতি ছাড়া স্তালিনের জন্য ডাক্তারদের কল করা ছিল নিষিদ্ধ। বেরিয়াকে দীর্ঘক্ষণ ধরে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না (প্রসঙ্গত, যেটা বেশ আশ্চর্য্যজনক) অবশেষে রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা দফতরের প্রধানকে অতি কষ্টে খুঁজে পাওয়া গেল, তিনি এলেন ও গটগট করে ঢুকলেন সেই ঘরে, যেখানে অচৈতন্য অবস্থায় শায়িত ছিলেন স্তালিন।

স্তালিনের কন্যা স্ভেতলানা আলুলায়েভা তার পিতার জীবনের অন্তিম মুহূর্তগুলোর স্মৃতিচারণা করেছেন। মৃত্যুর ঠিক পূর্বক্ষণে স্তালিন হঠাৎ চোখ মেললেন, তাকালেন তাকে ঘিরে থাকা মুখগুলোর দিকে, তারপর বাঁ হাতটা তুললেন, উপরের দিকে অঙ্গুলিনির্দেশ করলেন, নাকি কোনো সঙ্কেত দিলেন! যাই হোক, তার কয়েক মুহূর্ত পরেই স্তালিন শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

বেরিয়ার পক্ষে ক্ষমতা জবরদখল করা সম্ভব হয়নি। ১৯৫৩ সালেরই ২৬ জুন তাকে গ্রেফতার করা হয় ও অনতিবিলম্বে গুলি করে হত্যা করা হয়। কে-জি-বিতে তার ঘনিষ্ঠ সহকারীদেরও খতম করা হয়. দেশের শাসন ক্ষমতায় জোসেফ স্তালিনের উত্তরসূরি হন নিকিতা ক্রুশ্চভ । তিনিই বিপজ্জনক প্রতিদ্বন্দ্বীকে সমূলে উৎপাটিত করার পরে বেরিয়া ও তার ঘনিষ্ঠদের স্তালিনের বিরুদ্ধে চক্রান্ত করে তাকে হত্যা করার জন্য দোষারোপ করেছিলেন. ততদিনে কে-জি-বির শিখণ্ডী ও তার সাকরেদরা কেউ আর জীবিত ছিল না, সুতরাং তাদের যে কোনো অপরাধে অভিযুক্ত করা যেতে পারত।

খুব সম্ভবত আজ আমরা সুনিশ্চিত করে বলতে পারব না, যে স্তালিন গত হয়েছিলেন বেরিয়ার চক্রান্তের ফলে নাকি তার স্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছিল। অথবা হয়তো বা চক্রান্ত হয়েছিল, কিন্তু তার সংগঠক আদৌ বেরিয়া ছিলেন না ?

সমাজতান্ত্রিক শিল্পায়নে লেনিনের কর্মসূচি বাস্তবায়িত করে সোভিয়েত ইউনিয়ন নিজেকে একটি পশ্চাৎপদ কৃষিপ্রধান দেশ থেকে বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাশালী শিল্প-সমৃদ্ধ দেশে রূপান্তরিত করেছিল; এমন এক শিল্প-শক্তি অর্জন করেছিল যার দ্বারা নিঃস্বার্থ সাহায্য দেওয়া সম্ভব হয়েছিল ইয়োরোপের জনগণতান্ত্রিক দেশগুলো ও চীনের অর্থনীতি পুনর্গঠিত করতে; এমন এক শিল্প-শক্তি যা ভারত ও অন্যান্য প্রাচ্য দেশকে পূর্বতন সাম্রাজ্যবাদী শাসকদের দ্বারা চাপানো ঔপনিবেশিক পশ্চাৎপদতা কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করেছে।

ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ছড়িয়ে থাকা কৃষকদের একক জমিজমাকে বৃহৎ যন্ত্রচালিত সমাজতান্ত্রিক খামারে ঐক্যবদ্ধ করার লেনিনের পরিকল্পনাকে বাস্তবায়িত করা হয়েছিল। এইসব পরিকল্পনাগুলোর বাস্তবায়নের জন্য সেগুলোকে নির্দিষ্ট রূপ দেওয়ার ও আরও ব্যাপ্ত করার কার্যকরী নেতৃত্বদানে জে ভি স্তালিন এক বিশিষ্ট ভূমিকা পালন করেছিলেন।

মার্কসবাদ-লেনিনবাদের বিকাশে স্তালিনের অনেকগুলো তাত্ত্বিক রচনা খুবই উল্লেখযোগ্য ছিল। এইসব রচনায় তাঁর চিন্তার-পাণ্ডিত্যের তুলনাহীন সহজ সরল প্রকাশ, অগ্রণী শ্রমিকদের মধ্যে সমাজতান্ত্রিক চেতনা সঞ্চারে এবং সমগ্র কমিউনিস্ট প্রজন্মকে গড়ে তোলার কাজে বিপুল অবদান রেখেছিল।

সোভিয়েত ইউনিয়নে মানবসমাজের ইতিহাসে সবচেয়ে জটিল সমস্যার অন্যতম, জাতি সম্পর্কিত সমস্যার সমাধানকল্পে অবিচ্ছেদ্যভাবে স্তালিনের নাম জড়িয়ে আছে।

জাতি-সম্পর্কিত সমস্যা প্রসঙ্গে লেনিনের শিক্ষাকে স্তালিন আরও ব্যাপক ও উন্নত করেছিলেন। জার শাসনে নিপীড়িত জাতিসমূহ নবজীবনে জেগে উঠেছে; প্রতিটি ক্ষেত্রে অগ্রগতি ঘটিয়েছে এবং সোভিয়েত ইউনিয়নকে জাতিসমূহের একটি পরিবারে পরিণত করেছে।

স্তালিন ইয়োরোপের শ্রমিকশ্রেণির দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন প্রাচ্যের দেশগুলোর জাতীয় মুক্তি আন্দোলনের প্রতি, যে আন্দোলনগুলো ছিল সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে বিশ্বজোড়া সংগ্রামে এক বিপুল বিপ্লবী তাৎপর্যপূর্ণ। সেই ১৯১৮ সালেই এক বিশেষ তত্ত্ব সূত্রায়িত করেছিলেন যার যথার্থতা বিগত ৩৮ বছরের ইতিহাস বহন করে যে অক্টোবর বিপ্লব সৃষ্টি
অমর হয়ে থাকবে তাঁর নাম।

স্তালিনের শিক্ষা বলে, শান্তি তখনই সুরক্ষিত হতে পারে যদি বিশ্বের জনগণ শান্তির স্বার্থ নিজেদের হাতে তুলে নেয় ও তার জন্য লড়াই করে এবং সারা বিশ্বজোড়া লক্ষ লক্ষ শান্তিকর্মীদের এক নতুন যুদ্ধের প্ররোচনাকারীদের বিরুদ্ধে সংগ্রামে চালিত করে। সোভিয়েত ইউনিয়নই হলো আজ শান্তি ও জনগণের মধ্যে মৈত্রীর দৃঢ় রক্ষক।

১ মে, ১৯৪৫ কমরেড স্তালিনের নেতৃত্বে সোভিয়েত লালফৌজ বার্লিনের রাইখ্স্ট্যাগে রক্তপতাকা উড়িয়ে মানবজাতির চরমতম শত্রু ফ্যাসিবাদের পরাজয় ঘোষণা করেছিলেন।

এর পরের ইতিহাস পৃথিবীকে বারে বারে চমকে দেয়ার ইতিহাস। গোটা বিশ্ব অবাক বিস্ময়ে দেখল এক অকুতোভয় যোদ্ধা জাতি কী বিপুল বিক্রমে পৃথিবীকে রক্ষা করল। গোটা পৃথিবীকে এক রক্তপিপাসু জাতির দাসত্ব করা থেকে বাঁচাল রেড আর্মি, বিশেষত কমরেড স্তালিনের তীক্ষè ক্ষুরধার বুদ্ধি, অকপট দেশপ্রেম আর জনগণের ওপর অগাধ বিশ্বাস।

জানা যায় যুদ্ধে তাঁর প্রিয় পুত্রকে বন্দী করে জার্মানরা। বন্দী বিনিময় করতে চায় তাদের ফিল্ড মার্শাল ফ্রেডরিখ পউলাসের সাথে। তিনি রাজি হননি! এই একটি ঘটনাই প্রমাণ করে দেয় স্তালিনের কাছে দেশ আর নিজের সন্তানের মধ্যে কোনটি গুরুত্বপূর্ণ? লাল ফৌজের সর্বাধিনায়ক স্তালিন বললেন : I will not trade a Marshal for a Lieutenant!

যারা গড় চিন্তাধারায় তাঁর ‘স্বজনপোষণ’ নিয়ে কুৎসা করে তাঁরা অবশ্য কল্পনাও করতে পারেননি যে দেশের জন্য স্তালিন উৎসর্গ করে দেবেন নিজের ছেলেকেই!

দুনিয়ায় শ্রেণিহীন সমাজ গঠনের সংগ্রাম যতদিন ধরে চলবে, নিপীড়িত হৃদয়ের প্রতি স্পন্দনে অনুপ্রেরণার স্ফুলিঙ্গ হয়ে রইবেন কমরেড স্তালিন ।