ইংরেজীতে 'Lost in trnaslation' (লষ্ট ইন ট্র্যান্সলেশন) বলে একটা কথা আছে। অর্থাৎ, মূল পাঠের অনুবাদ করলে কিছু না কিছু হারিয়ে যায়।
এক ফেইসবুক-বন্ধু সলিমুল্লাহ খানের প্রবন্ধ থেকে তাঁর বঙ্গানুবাদ-সহ তারিক আলির উদ্ধৃতি দিয়ে একটি পৌষ্ট দিয়েছেন।
তারিক আলি লিখেছেনঃ "If one is looking for facts long obscured from public view, hidden from history, carefully concealed lest they excite newer and more dangerous passions then one need only study the outpourings of South Asia’s poets from the highest to the lowest."
সলিমুল্লাহ খান তারিক আলির লেখার অনুবাদ করেছেনঃ ‘পাছে নতুন নতুন, ঢের বিপজ্জনক আবেগের আতিশয্য দেখা দেয়—এই ভয়ে অনেক সত্য চোখে ধুলা দিয়া জনসাধারণের দৃষ্টিপথ হইতে সরানো, ইতিহাসের বিবরণ হইতে লুকানো, আর পরম যত্নে গোপন করা হইয়াছিল। যাঁহারা এসব সত্যের সন্ধান করিতেছেন তাঁহাদের পক্ষে দক্ষিণ এশিয়ার অতি উঁচু হইতে শুরু করিয়া নিতান্ত সাধারণ কবি পর্যন্ত যাহা প্রকাশ করিয়াছেন তাহা বিবেচনা করিলেই যথেষ্ট হইবে।’
অনুবাদক সলিমুল্লাহ খান তারিক আলির সুলিখিত কম্প্যাক্ট বাক্যটি ভেঙ্গে দিয়ে দুই বাক্যে তা অনুবাদ করেছেন। মূল বাক্য না ভেঙ্গে অনুবাদ করতে পারলে ভালো। কিন্তু কখনও কখনও ভাঙ্গতে হতে পারে এই কারণে যে, কোন ভাষায় যা একবাক্যে সহজেই প্রকাশ করা যায় সম্ভবতঃ তার গাঠনিক সমৃদ্ধির জন্যে, অন্য ভাষার গাঠনিক দুর্বলতার কারণে তা নাও হতে পারে। এছাড়াও, অনুবাদের ব্যক্তিগত ভাষিক দক্ষতাও এখানে নির্ণায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে।
সলিমুল্লাহ খানের অনুবাদের মুনশিয়ানা নিয়ে আমি সমালোচনা করছি না। এটি আমার উদ্দেশ্যও নয়। তবে, শব্দের ভাষান্তরে অর্থের সঠিকতা রক্ষার ক্ষেত্রে তার দুর্বলতার কথা উল্লেখ করবো।
প্রথমতঃ বাংলায় ‘আবেগের আতিশয্য’ কথাটা নেতিবাচক, যা কোনোভাবেই ইংরেজি ইতিবাচক শব্দ ‘passion’-এর বাংলা হতে পারে না। Passion-এর বাংলা হচ্ছে অনুরাগ, আর ‘আবেগের আতিশয্য’র ইংরজী হলো ‘excess of emotion’.
দ্বিতীয়তঃ ‘long obscured from public view, hidden from history, carefully concealed’ কথাগুলোর বঙ্গানুবাদ করতে গিয়ে সলিমুল্লাহ খান বিষয়টিকে অতীত কালের ঘটনা হিসেবে “চোখে ধুলা দিয়া জনসাধারণের দৃষ্টিপথ হইতে সরানো, ইতিহাসের বিবরণ হইতে লুকানো, আর পরম যত্নে গোপন করা হইয়াছিল” বলে বর্ণনা করেছে। এতে মনে হতে পারে, এখন বুঝি আর তেমনটি নয়। কিন্তু তারিক আলি ইংরেজিতে যা বলেছেন, তাতে তিনি বুঝিয়েছেন যে, সত্য এখনও লুকানো, যা বুঝতে সত্যসন্ধানীকে দক্ষিণ এশিয়ার কবিদের লেখা পাঠ করতে হবে।
তৃতীয়তঃ ‘outpourings’ শব্দের বাংলা “যা প্রকাশ করিয়াছেন” বললে মূল লেখকের দক্ষ শব্দ-নির্বাচনের ক্ষমতার প্রতি অবিচার করা হয়। কারণ, ইংরেজীতে outpourings শব্দের অর্থ হচ্ছে “something that streams out rapidly” ও “an outburst of strong emotion”.
আমার বিবেচনায় সলিমুল্লাহ খান আন্তরিকভাবে তারিক আলির সুলিখিত বাক্যটিকে অনুবাদ করার চেষ্টা করলেও, সঠিক শব্দ নির্বাচন করতে না পারার কারণে তার লেখার স্পিরিট বা ভাব প্রকাশ করতে ব্যর্থ হয়েছেন।
তারিক আলি যেখানে প্রতিষ্ঠানের পক্ষে স্তাবক কবিদের কাব্যসমূহকে outpourings (অর্থাৎ, an outburst of strong emotion) বলেছেন এবং এই কাব্যের উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলেছেন মানুষের ‘newer and more dangerous passion’ ঠেকানো, সলিমুল্লাহ খান সেখানে জনগণের ‘passion’কে ‘আবেগের আতিশয্য’ এবং 'outpourings'কে "যাহা প্রকাশ করিয়াছেন" বলে কার্যতঃ বাক্যটির ভুল ভাবানুবাদ করেছেন।
যাহোক, আমি তারিক আলির ইংরেজী বাক্যটির কাঠামো ঠিক রেখে এবং অর্থ ও ভাবের প্রতি বিশ্বস্ত থেকে একবাক্যে নিন্মলিখিত বঙ্গানুবাদ করেছি, যা পুনরায় মূল ইংরেজী উল্লেখপূর্বক নীচে প্রকাশ করছিঃ
মূল ইংরেজী বাক্যঃ "If one is looking for facts long obscured from public view, hidden from history, carefully concealed lest they excite newer and more dangerous passions then one need only study the outpourings of South Asia’s poets from the highest to the lowest."
বঙ্গানুবাদঃ “যদি কেউ এ-সত্যের সন্ধানী হন, যা নবতর ও অধিকতর বিপজ্জনক অনুরাগের উদ্রেগ করতে পারার ভীতিবোধে দীর্ঘকাল যাবত গণদৃষ্টি থেকে অস্পষ্ট, ইতিহাস থেকে লুকানো, সযতনে আড়ালকৃত, তাহলে তাকে শুধু দক্ষিণ এশিয়ার সর্বোচ্চ থেকে সর্বনিম্ন স্তরের কবিদের উদগীরণ পাঠ করলেই চলবে।”
EmoticonEmoticon