শনিবার, ১ জুন, ২০১৯

ইসলামিক সভ্যতাঃ আলো ও আঁধার

মধ্যযুগে পাশ্চাত্য যখন কুসংস্কারাচ্ছন ও দরিদ্র, প্রাচ্য তখন জ্ঞান-বিজ্ঞান-দর্শনে আলোকিত আরব্য, পারস্যিক, মুরীয়, তুর্কী, ভারতীয় প্রভৃতি সাম্রাজ্যিক শাসন ও সভ্যতা - যাকে একত্রে 'ইসলামিক সভ্যতা' বলা হয় -  তার জ্ঞানভাণ্ডার গড়ে তুলেছিলো প্রাচীন মিশরীয়, পারস্যিক, গ্রীক ও ভারতীয় বিস্মৃত-প্রায় জ্ঞানভাণ্ডার থেকে অনুবাদ ও আহরণের ভিত্তিতে সমন্বিত ও নবরূপে বিকশিত করার মাধ্যমে।

অন্ধকার পাশ্চাত্যের কিছু জ্ঞানপিপাসু মানুষ তখন আলোকিত মুসলিম সাম্রাজ্যের জ্ঞানকেন্দ্রগুলোতে গিয়ে, তাদের ভাষা শিখে, তাদের জ্ঞান নিজ ভাষায় অনূদিত ও নিজদেশে নিয়ে গিয়ে চর্চা ও বিকশিত করতে শুরু করে। আর, এই পথ ধরেই ইউরোপে আসে এনলাইটেনমেণ্ট ও রেনেসাঁ, যার ফলে তারা গত কয়েক শতকে বহুদূর এগিয়ে যায়।

মুসলিম সভ্যতা তার মধ্যযুগের শ্রেষ্ঠত্বের গৌরব ও আত্মবিশ্বাস নিয়ে অন্যান্য সভ্যতাকে তুচ্ছ ভেবে কয়েক শতাব্দী কাটিয়ে দিয়েছিলো নিশ্চিন্তে। ওদিকে পাশ্চাত্যে কী ঘটছে, তা জানার কোনো আগ্রহ ও কারণও অনুভব করেনি তারা।

কিন্তু পনেরো শতকের পর থেকে যখন একের পর এক পাশ্চাত্যের কাছে মুসলিম সাম্রাজ্যের পতন ঘটলো একের পর এক যুদ্ধে -  প্রথমে সমুদ্রে ও পরে ভূপৃষ্ঠে,  তখন মুসলমানেরা বুঝলো, পাশ্চাত্যকে তুচ্ছ তো করা যায়ই না, বরং অনুকরণ করার মতো। আর, এ-অনুকরণটা করলো তারা প্রধানতঃ সমরবিদ্যায়; কিন্তু সমাজবিদ্যা, রাজনীতিবিদ্যা, শিল্প, সাহিত্য, দর্শন ও বিজ্ঞানে নয়।

এখনও মুসলমানেরা মধ্যযুগের স্মৃতির জাবর কেটে চলেছে। বর্তমানকে অগ্রাহ্য করে রূপতঃ চোখ বন্ধ করে আঁধারে অতীতের স্বপ্ন দেখে চলছে। এখনও তারা পাশ্চাত্যের শ্রেষ্ঠত্বকে মানতে পারেনি।

পাশ্চাত্যের অস্ত্রাদি, কৃৎকৌশল ও বিলাস উপকরণ ক্রয়ে ও ভোগে তাদের প্রচণ্ড প্রতিযোগিতামূলক আগ্রহ থাকলেও, পাশ্চাত্যের শ্রেষ্ঠত্বের পেছনে যে-বিশ্ববোধ, জীবনবোধ, সমাজবোধ, রাষ্ট্রবোধ ও মানবতা বোধ ও ব্যবস্থা আছে, তাতে বিন্দুমাত্রও আগ্রহ নেই তাদের। বরং সুযোগ পেলেই তার নিন্দা ও ভর্ৎসনা করে তারা।

মুসলমানেরা 'জানেন' যে,  'কুরআনই হচ্ছে সমস্ত জ্ঞানের আধার' এবং 'সর্বশ্রেষ্ঠ পূর্ণাঙ্গ জীবন ব্যবস্থা'র নির্দেশনা। যে-মুসলমান কুরআন পড়তে পারেন ও বুঝতে পারেন, তিনিও 'জানেন'; যিনি পড়তে পারেন কিন্তু বুঝতে পারেন না, তিনিও 'জানেন'; এবং যিনি পড়তেও পারেন না, বুঝতেও পারেন না, তিনিও 'জানেন'।

তাদের এই 'জানা' বা 'জ্ঞান' আসলে তাদের বিশ্বাস। আর, এ-বিশ্বাস এতোই সংবেদনশীল যে, এখানে ন্যুনতম সংস্কার কিংবা ভিন্ন কোনো মত একেবারেই সহনীয় নয়।

আমি যদি প্রশ্ন করি, 'কুরআন নিয়ে যারা দিনরাত গবেষণা করেন, মুখস্থ করেন, আবৃত্তি করেন, ব্যাখ্যা করেন, তা থেকে তারা বর্তমান বিশ্বের জ্ঞান-বিজ্ঞানের শাখাসমূহে কী অবদান রাখছেন?', আমার ধারণা, কুরআন-চর্চাকারীগণ উত্থিত প্রশ্নটি নিয়ে ভাবার চেয়েও ভাবতে বেশি পছন্দ করবেন আমি নাস্তিক কিনা, এবং তার উত্তর খোঁজার চেয়ে বেশি খুঁজবেন আমাকে কষে একটা গাল দেওয়া যায় কিনা। অথচ দেখুন, আমি শুধু প্রশ্ন করেছি।

যাক, মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলদেশে একটি বাঙালী মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করার কারণে আমি বিষয়টি ভেতর থেকে জানি। আর, পাশ্চাত্যের একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষাগ্রহণ করার কারণে নিজের জাতির সাথে পাশ্চাত্যের জতিসমূহের তুলনাটা করতে পারি এবং বুঝতে পারি। তাই, বেশি কিছু না বলে শুধু এটুকুই বলবো আমাদের দেশের পণ্ডিত সমাজকেঃ

দয়াকরে শুধু একটি কাজ করুন, জ্ঞান-বিজ্ঞান-কলার যতো শাখা আছে এবং তাতে বিশ্বে যে জ্ঞান গড়ে উঠেছে, তা কয়েক শতক না হলেও অন্ততঃ কয়েক দশক বাংলায় অনুবাদ করে যান। বাংলা একাডেমি যদি উপযুক্ত না হয়, উপযুক্ত প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলুন।

মনে রাখবেন, বিশ্বের সর্বশেষ বিকশিত জ্ঞানকে অগ্রাহ্য করে এবং সে-সম্পর্কে অজ্ঞ থেকে মরলে  হয়তো 'বেহেশতে' যেতে পারবেন, কিন্তু জীবিত অবস্থায় নিজের দেশটাকে একটা 'দোযখ' বানিয়েই ছাড়বেন!


EmoticonEmoticon