১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৯৬৯-এর গণঅভ্যূত্থান ও ১৯৭১-এর বিপ্লব তথা স্বাধীনতা যুদ্ধ পর্যন্ত পূর্ববঙ্গের মানুষ যে-জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক প্রক্রিয়াদির মধ্য দিয়ে বাঙালী হিসেবে বিকশিত হয়েছে, পশ্চিমবঙ্গ বা অন্য কোনো স্থানের বাঙালীর তা হয়নি। ফলে, বাংলাদেশের বাঙালীদের এথনোলিঙ্গুয়িষ্টক ভাইট্যালিটি বা জনভাষিক প্রাণশক্তি পশ্চিমবঙ্গ-সহ অন্যান্য স্থানের বাঙালীর চেয়ে অনেক অনেক বেশি।
আরাকানের বাঙালীরা প্রধানতঃ মুসলমান, যারা ১৯৪৭ সালের অবিভক্ত বাংলার সকল বাঙালী মুসলমানের মতোই পাকিস্তান-রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখে, কিন্তু সেই স্বপ্ন পূরণ হয় শুধু পূর্ববঙ্গের বাঙালী মুসলমানদের। আরাকানের বাঙালী মুসলমান পূর্বপাকিস্তানের অংশ হতে না পেরে, ১৯৪৮ সালে বার্মা স্বাধীন হলে, তার মধ্যেই নিজেদের আত্মপরিচয় খোঁজে। অন্যদিকে, পশ্চিমবঙ্গের বাঙালীরা নিজেদেরকে অধিক হারে ভারতীয় ভাবতে থাকে, যারও ভিত্তি হিসেবে কাজ করে ধর্ম - হিন্দুত্ব।
১৯৪৮ সাল থেকে পূর্ববঙ্গ তথা পূর্ব-পাকিস্তানে ধর্মীয় পরিচয়কে গৌণ করে বাঙালী আত্মপরিচয়ের শক্তিবৃদ্ধি হতে থাকে। বিপরীতক্রমে, আরাকানে ১৯৪৮ সাল থেকে বাঙালী পরিচয়কে গৌণ করে ধর্মীয় পরচিয়ের শক্তিবৃদ্ধি হতে থাকে।
১৯৫২ সালে পূর্ব-পাকিস্তানের বাঙালী যখন নিজেদেরকে বাঙালী হিসেবে পুনঃসংজ্ঞায়িত করে ভাষা আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে, ঐ একই সালে আরাকানের বাঙালীরা রোহিঙ্গা আত্মপরিচয়ে নিজেদেরকে পুনসংজ্ঞায়িত করতে শুরু করে রাজনৈতিক আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। আজ ৬৯ বছরের পথ পরিক্রমায় নাফ নদীর এপারের বাঙালী ও ওপারের বাঙালীর মধ্যে বিস্তর আত্মপরিচয়গত ব্যবধান, যা পূর্ব ও পশ্চিম বাংলার বাঙালীদের মধ্যে ব্যবধানের চেয়েও অধিক।
যারা বিশ্ববাঙালীর জাতিগত আত্মপরিচয় ও মর্য্যাদার স্বপ্ন দেখেন, তাদেরকে বিশ্বের সমগ্র বাঙালীর অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যত নিয়ে ভাবতে হবে। আমার ধারণা, আগামীতে বাংলাদেশকে অনুসরণ করে আরও বাঙালী জাতিরাষ্ট্রের উদ্ভব ঘটতে পারে। অর্থাৎ, বিশ্বে যেমন ইংলিশ স্পীকিং রাষ্ট্র আছে পাঁচটি, বেঙ্গলি স্পীকিং রাষ্ট্রের সংখ্যাও হতে পারে কয়েকটি।
হিমালয়ের উত্তরে যেমন চীনা হান জাতি, হিমালয়ের দক্ষিণে তেমনি বাঙালী জাতি তার সংখ্যাগুরুত্ব ও অতীত ইতিহাসের কারণে বঙ্গোপসাগরকে কেন্দ্র করে দক্ষিণ এশিয়ায় নেতৃত্ব দেওয়ার জন্যে ডেষ্টিণ্ড বা নিয়তিপ্রাপ্ত!
৩১/০৮/২০১৮
লণ্ডন, ইংল্যাণ্ড
EmoticonEmoticon