মঙ্গলবার, ১ আগস্ট, ২০১৭

পাকিস্তান জন্মগতভাবে...

পাকিস্তান জন্মগতভাবে একটি শক্তিশালী সামরিক শক্তির মধ্য দিয়ে গড়ে উঠেছে। পাকিস্তান ধর্মের দোহাই দিয়ে জন্ম হলেও শুরুতে গণতন্ত্রের ঘোষণা দিয়েছিল। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার নেতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ গণতন্ত্রের কথাই বলতেন। কিন্তু যখন দেশ হিসেবে পাকিস্তান হয়ে গেল তখন গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা দূরে থাক অগণতান্ত্রিক সব কাজকর্ম শুরু করে দিল। যার প্রথম ধাক্কা ভাষার উপর কতৃত্ব প্রতিষ্ঠা। উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা চাপিয়ে দেওয়া। যার মধ্য দিয়ে শুরু হয়ে যায় পাকিস্তান আসলে গণতন্ত্র নির্মাণের পথে আগাতে পারেনি। তারপর ১৯৫৬ সালের মাথায় সোরওয়ার্দীর নেতৃতে আওয়ামীলীগ মেজরিটি সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছাড়াই পাকিস্তানের সরকার গঠন করেছিল। কিন্তু আদতে ক্ষমতা ছিল প্রেসিডেন্ট এবং মিলিটারির হাতে। কারণ মিলিটারিকে নাখোশ করে কোন কাজ করা যেত না। এমনকি প্রধানমন্ত্রী প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এর দায়িত্বে থাকলেও তাঁর সব বিষয়ে খবরদারি বারণ ছিল। সোহরাওয়ার্দী মন্ত্রীসভার শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রনালয়ের দায়িত্বে ছিলেন আওয়ামীলীগ নেতা আবুল মনসুর আহমদ। একবার তিনি পাকিস্তান মিলিটারি অস্ত্র কারখানা পরিদর্শন করতে যান। একসময় উনি জানতে চান কারখানায় কী পরিমাণ অস্ত্র গোলাবারুদ উৎপাদন হয়। তাঁকে জানানো হয় বলা নিষেধ আছে। উনি তখন ভারপ্রাপ্ত প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বে আছে। উনি বিভিন্ন জায়গায় তদবির করেও জানতে পারেন নি। তারপর যখন প্রধানমন্ত্রী বিদেশ সফর থেকে ফিরে আসেন তখন উনাদের আলাপ এভাবে হয়েছিল-
"কোন 'বিহিত ব্যবস্থা' হইলো না। অথবা ' বিহীত ব্যবস্থাই' বোধ হয় হইলো। আমাকে কিচ্ছু জানান হইলো না। প্রধানমন্ত্রী আসা মাত্র আমি তাঁর কাছে নালিশ করিব, স্থির করিয়া রাখিলাম।
নালিশ আর করা হইলো না। প্রধানমন্ত্রী ফিরে আসার পর আমার সাথে প্রথম সাক্ষাতেই তিনি বলিলেনঃ এ সব কি শুনিলাম? তুমি দেশরক্ষার গোপণ-তথ্য এত কৌতুহলী কেন?'
আমি স্তম্ভিত হইলাম। কি গুরুতর অন্যায় করিয়া ফেলিয়াছি। প্রধানমন্ত্রীকে সব খুলিয়া বলিলাম।  দেখিলাম, অনেক কিছুই তিনি জানেন। সব শুনিয়া এবং আমার উদ্দেশ্য ও যুক্তির বিবরণ শুনিয়া অবশেষে তিনি বলিলেনঃ ' তোমাকে এরা কত সন্দেহের চোখে দেখে তুমি জান না? তুমি একুশ দফার রচয়িতা। তুমি সাবেক কংগ্রেসী। ভারতের অনেক নেতার বন্ধু।'
আমি প্রতিবাদ করিয়া অবশেষে তাঁর যুক্তি মানিয়া নিলাম। বলিলামঃ 'বেশ, আমার বেলা তাঁদের সন্দেহ আছে। কিন্তু আপনে? আপনি কি এসব ব্যাপার জানেন? আপনে শাসন- সৌকর্য হইতে শুরু করিয়া অর্থনীতির পোকা-মাকড় পর্যন্ত মারিতে দক্ষ। প্রধানমন্ত্রী ও দেশরক্ষা মন্ত্রী হিসাবে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার আপনে কতটুকু জানিয়াছেন?' আমার কথাগুলো ফেলিয়া দিবার মত নয়। তিনি স্বীকার করিলেন। কিন্তু প্রেসিডেন্ট মির্জার মতই তিনি যুক্তি দিতে লাগিলেন, দেশরক্ষার ব্যবস্থা ছাড়াও মন্ত্রীদের অতসব কর্তব্য পড়িয়া রহিয়াছে যে ঐ সব কাজ করিয়া মন্ত্রীদের অবসর থাকা সম্ভব নয়, উচিৎ ও নয়। বোঝা গেল তিনি এ ব্যাপারে জানেন না। মানে আসল কথা তিনি জানেন। অর্থার এ ব্যাপারে তাঁর জানা উচিত নয়, এটা জানেন।" ( আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর, আবুল মনসুর আহমদ)
তাহলে দেখা গেল পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী কতটা শক্তিশালী। ঐ মন্ত্রীসভার কিছুদিন পরেই জেনারেল আইয়ুব খান সামরিক শাসন জারি করে। অর্থাৎ পাকিস্তান রাষ্ট্রের অবিচ্ছেদ্য অংশ হল সামরিক বাহিনী। ফলে বার বার সেখানে সামরিক শাসন ফিরে এসেছে। গণতন্ত্র সেখানে বার বার মার খেয়েছে। তাই একথা মনে করা ঠিক নয় যে পাকিস্তান প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করার পেছনে শুধুমাত্র দুর্নীতি প্রধান কারণ বা বিচার বিভাগের স্বাধীনতার প্রয়োগ। এটাও মনে করা দরকার মিলিটারি সেখানে শক্তিশালী এবং রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করে। ফলে এটা তাঁদেরও চয়েস হতে পারে।


EmoticonEmoticon