আহমদ রফিক একজন বাম ধারার লেখক ও বুদ্ধিজীবী। একাধারে তিনি ভাষা আন্দোলনের কর্মী, এককালের বাম রাজনীতিক। একাধিক বইও তিনি লিখেছেন, ভাষা আন্দোলন নিয়ে তাঁর বই আছে। সম্প্রতি গঠিত হওয়া 'রুশ অক্টোবর বিপ্লব' শতবর্ষ বার্ষিকীর যুগ্ন আহবায়ক। সম্প্রতি কালেরকন্ঠে তাঁর একটি কলামের দিকে চোখ যায়। শিরোনাম ছিল "এদেশে রোহিঙ্গা ভূমির আশঙ্কা কি অমূলক"।
হর্থাৎ তিনি রাষ্ট্রীয় নির্যাতনের শিকার হয়ে নিপীড়িত রোহিঙ্গারা এক সময় এইদেশ দখল করে ফেলবে সেই আশঙ্কায় এদের এখানে আসতেই দিতে চান না। লেখার শুরুতে মিয়ানমারের প্রধানমন্ত্রী আং সান সূচীর সমালোচনা করে এই রফিক সাহেব রোহিঙ্গাদের একরাশ সমালোচনা করলেন। তাঁর ভাষায়-
"এই অনুপ্রবেশের প্রথম পর্বে বাংলাদেশ মানবিক চেতনার তাগিদে তাদের সাময়িক আশ্রয় দিয়েছিল চট্টগ্রাম সীমান্তে বসবাসের ব্যবস্থা করে। তারা আর ফিরে যায়নি। বরং তারা এ আশ্রয়দানের মর্যাদা রাখেনি। জড়িয়ে পড়েছে নানা ধরনের অনৈতিক, অবৈধ, অসামাজিক ও সাম্রাজ্যবাদী কূট চক্রান্তের বেড়াজালে। চট্টগ্রামের গভীর অরণ্যে পাওয়া গেছে বিপুল পরিমাণ অস্ত্রশস্ত্র ও প্রশিক্ষণের আলামত। তারা নানা সামাজিক অপরাধের সঙ্গেও জড়িত"।
বিভিন্ন সময় রাষ্ট্রীয় ও জাতিগত এবং ধর্মীয় নিপীড়নের শিকার হয়ে আসা রোহিঙ্গারা ফেরত যায়নি এজন্য তিনি নাখোশ হয়েছেন। কিন্তু বাস্তবতা হল মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে আগের চেয়ে নির্যাতন কয়েকগুণ বেড়েছে, তাঁদের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়া হচ্ছে, নারী শিশুসহ সবাইকে নানাভাবে নির্যাতন করা হচ্ছে। তাঁদের সব নাগরিক অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছে। শিক্ষা স্বাস্থ্য সম্পত্তির মালিকানা কিছুই তাঁদের নেই। বরং প্রতিনিয়ত পুলিশ মিলিটারি তাঁদেরকে নানাভাবে অত্যাচার করছে। তাহলে যেখানে বসবাসের নুন্যতম পরিবেশ নেই। তাহলে যারা এখানে আশ্রয়ের জন্য এসেছিল তাঁরা কোন বাস্তবতায় ফেরত চলে যাবে? সেই উপলব্ধি কি জনাব আহমদ রফিকের নাই। আবার উনি বলছেন রোহিঙ্গারা নাকি নানা সাম্রাজ্যবাদী চক্রান্ত করছে এদেশ দখল করার জন্য। পার্বত্য চট্টগ্রামের গহীন জঙ্গলে অস্ত্র পাওয়া গেছে। এই অস্ত্র রোহিঙ্গাদের ছিল? এরকম কোন তথ্য পাওয়া গেছে। তাহলে সুনির্দিষ্ট তথ্য প্রমাণ ছাড়াই একজন কে দোষী সাব্যস্ত করা কিসের ভিত্তিতে?
এরপর তাঁর কথায় বুঝা যায় বাংলাদেশ খুব শান্তিকামী দেশ, এখানে কোনই সমস্যা নাই, কেউ অপরাধ করে না, আইনশৃঙ্খলা খুব ভাল ছিল। কিন্তু সব দায় এই রোহিঙ্গাদের? এরা সব ইয়াবা ব্যবসা করে দেশের তরুণ যবকদের নষ্ট করে ফেলেছে
রামুর বৌদ্ধবিহারে হামলায় দায়ও রোহিঙ্গাদের গাড়ে চাপিয়ে দিচ্ছেন। কিন্তু আমরা জানি রামুর মূল ঘটনার সূত্রপাত অনলাইনে মিথ্যা প্রচারণায় দায়ে যেখানে রোহিঙ্গারা ইন্টারনেট সহ সকল ধরণের আধুনিক যোগাযোগ থেকে বঞ্চিত ছিল তখন নাকি রামুর ঘটনায় দায় রোহিঙ্গাদের গাড়ে চাপিয়ে দিলেন?
এরপর এই আহমদ রফিক সাহেব রোহিঙ্গাদের নিয়ে সরকারের কঠোর প্রদক্ষেপকে পূর্ণ সমর্থন জানিয়ে তাঁদেরকে প্রশংসা করতে ভুলেন নি। শুধু এই সমালোচনা করলেন যে সরকার বিষয়টিকে আন্তর্জাতিক মহলে নিয়ে যেথে পারেনি। যখন রোহিঙ্গাদের নিয়ে জাতিসংঘ সহ বিশ্ব মোড়লদের মাথাব্যথা নাই। সেখানে তিনি বাংলাদেশের দায়কে অস্বীকার করতে চান। তাঁর ভাষায়-
"বিস্ময়কর যে এ বিষয়ে বিশ্বমোড়লদের কোনো ধরনের মাথাব্যথা নেই। বাংলাদেশ সরকার এ সম্পর্কে যথারীতি সংরক্ষণবাদী নীতি নিয়ে চলছে, যাতে ব্যাপক হারে এ দেশে রোহিঙ্গাদের অনুপ্রবেশ ঘটতে না পারে। কিন্তু এর আগে এত লেখালেখির পরও তারা রোহিঙ্গা সমস্যাটিকে আন্তর্জাতিক পরিসরে নিয়ে যায়নি। ফলে ভুগতে হচ্ছে তাদের। ভুগছে বাংলাদেশের সুস্থ চেতনার সমাজ"।
আমরা দেখেছি মিয়ানমার সেনাবাহিনী সেখানে রোহিঙ্গাদের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে পুড়িয়ে সেখানে গণহত্যা চালাচ্ছে। এমনকি মুসলমান ছাড়াও হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন সেখানে আক্রান্ত হচ্ছেন। সেখান থেকে তাড়া খেয়ে নিরীহ নারী শিশু নাফ নদী সাতরিয়ে আশ্রয় পেতে চায়। কিন্তু বিজিবি তাঁদের ঢুকতে দিচ্ছে না। ফলে নদীতে নারী শিশুর লাশ ভেসে উঠছে! কেউ কেউ লুকিয়ে ঢুকে পড়েছেন তা সত্য কিন্তু যারা নদীতে হারিয়ে গেল তাঁদের কী রক্ষা করা যেত না? প্রশ্নটা এখানে মানবিক। মানুষ মানুষের বিপদে এগিয়ে আসে। শত সংকটের মধ্যেও মানুষের বিপদে এগিয়ে আসা মানবিকতা। কিন্তু আহমদ রফিক সাহেব সব বিবেচনাবোধ হারিয়ে শুধু কৃত্রিম রাষ্ট্রীয় ভূমি দখলের আশঙ্কা থেকে নিশ্চিত মৃত্যু পথে পড়ে থাকা এই নিরীহ রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিতে নারাজ। লেখাটা পড়লে মনে হবে উনি ক্ষমতাসীন দলের চেয়ে বড় জাতীয়তাবাদী, সব ধরণের কৌশল অবলম্ভন করে রাষ্ট্রীয় সীমানাকে উনি রক্ষা করতে চান? আর এরাই হলেন আজকের দিনে বাম মহলের বুদ্ধিজীবী। এরা কী সমাজ বিকাশের নতুন পথ দেখাতে পারবেন?
EmoticonEmoticon