বৃহস্পতিবার, ২ নভেম্বর, ২০১৭

উপমহাদেশে ধর্মীয় প্রভাব এবং দেশপ্রেম

মুসলমানরা, মধ্যযুগে আরব, তুরস্ক, ইরান-তুরান, আফগানিস্তান প্রভৃতি দেশ থেকে বাংলা তথা ভারত উপমহাদেশে আগমন করে।শুরুতে এইদেশে  মুসলমানরা আশ্রয় নিলেও এক সময় নিজের অবস্থান শক্তিশালী করে।
৬৩০ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ প্রথম মুসলমান পর্যটকরা নৌপথে ভারতীয় উপকূলভাগে অবতরণ করেন। সপ্তম শতাব্দীর শেষভাগে আরব মুসলমানরা প্রথম ভারতের উপকূলীয় অঞ্চলে বসতি স্থাপন করেছিলেন।
ঠিক মুহাম্মদ ১৪০০ বছর আগে মক্কা থেকে বিতাড়িত হয়ে মদিনা কাফের কাছে আশ্রয় নিয়েছিল।এর পরের ইতিহাস আমরা সবাই জানি।
ঠিক মুসলমানরা এই দেশে বিধর্মী দেশে এসে আশ্রয় নিয়েছিল মুহাম্মদ এর মত এর পরের ইতিহাস আজ বিশ্লেষণ করব।

কিছু মানুষ মনে করে মুসলিমরা তাদের চিরন্তত আবাসভূমি হিসাবে গ্রহণ করেছে এ দেশকে এবং শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এ দেশের হিন্দুর সাথে পাশাপশি বসবাস করে এসেছে। কিন্তু ঐতিহাসিক নির্মম সথ্য এই যে, হাজার বছরেরও বেশী কাল হিন্দু-মুসলমান একত্রে পাশাপাশি বাস করে,বরঞ্চ তাদের মধ্যে আত্মিক সম্পর্কও গড়ে উঠতে পারেনি।তবে একে অপরের সুখ-দুঃখের অংশীদার হয়নি, তা নয়। তবে তা বিশেষ স্থান, কাল–জাতি হিসাবে নয়, প্রতিবেশী হিসাবে। সেও আবার সামরিকভাবে। তাদের মধ্যে সৌহার্দ ও একাত্মতার স্থায়ী শিকড় বদ্ধমূল হতে পারেনি কখনো।
হিন্দু মুসলমান সম্পর্ক নিয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছিলেন উনার লেখায়-

“সকলের চেয়ে গভীর আত্মীয়তার ধারা নাড়ীতে বয়, মুখের কথায় বয় না। যাঁরা নিজেদের এক মহাজাত বলে কল্পনা করেন, তাঁদের মধ্যে নাড়ীর মিলনের পথ ধর্মের শাসনে চিরদিনের জন্য যদি অবরুদ্ধ থাকে, তাহলে তাঁদের মিলন কখনই প্রাণের মিলন হবে না। -[রবীন্দ্র রচনাবলী (শতবার্ষিকী সংস্করণ), ১৩’শ খন্ড-পৃঃ ৩০৮]

এই যে পাশাপাশি বসবাস করেও উভয়ের মধ্যে দূরত্ব
এর কারণ বর্ণনা করতে গিয়ে ডক্টর রমেশ চন্দ্র মজুমদার বলেনঃ

এই দুই সম্প্রদায়ের ধর্মবিশ্বাস ও সমাজবিধান সম্পূর্ণ বিপরীত… হিন্দুরা বাংলা সাহিত্যের প্রেরণা পায় সংস্কৃত থেকে আর মুসলমানরা পায় আরবী-ফারসী থেকে। মুসলমানদের ধর্মের গোঁড়ামিও মুসলমানদেরকে তাদের প্রতি সেরূপ বিরূপ করেছিল। … হিন্দুরা যাতে মুসলমান সমাজের দিকে বিন্দুমাত্র সহানুভূতি দেখানে না পারে, তার জন্যে হিন্দু সমাজের নেতাগণ কঠোর বিধানের ব্যবস্থা করেছিলেন। (রমেশ চন্দ্র মজুমদারঃ বাংলাদেশের ইতিহাস মধ্যযুগ,

দেখা যাচ্ছে এই যে পার্থক্য এবং দূরত্ব এ শুধু বাহ্যিক ও কৃত্রিম নয়। এর গভীর মূলে রয়েছে উভয়ের পৃথক পৃথক ও বিপরীতমুখী ধর্মবিশ্বাস ও সংস্কৃতি। ইসলামি সংস্কৃতি হল একটি আরবিয়ান সসংস্কৃতি যা এইদেশের সংস্কৃতির বিপরীত মুখী। দুইটি জাতি একত্রিত হওয়ার প্রধান বাধা হল বিপরীত মুখী দুইটি ধর্ম।যা কখনো একই সংস্কৃতিতে মিলেমিশে  চলা সম্ভব না।

ইসলামী তৌহিদের চিত্তচাঞ্চল্যকর বিপ্লবী বাণী, স্রষ্টা সমীপে সর্বস্ব নিবেদন ইসলামের বিশ্বভ্রাতৃত্ব ও প্রেম, এই গুলি শুরুতে হিন্দুদের জন্য ভয়ের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।হিন্দুদের উপর আদেশ শুরু হয় মুসলামদের ধর্ম গ্রহনে জন্য।

বাংলা তথা ভারত উপমহাদেশের দু’টি বৃহৎ জাতি হিন্দু ও মুসলমান দু’টি স্বতন্ত্র ধর্মবিশ্বাস ও সংস্কৃতির। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে এই যে, দু’টি স্বতন্ত্র ধর্মবিশ্বাসী একই দেশে মিলেমিশে, শান্তিতে ও নির্বিবাদে বসবাস করতে পারলোনা কেন? পৃথক শুধু ধর্মাবলম্বী হওয়ার কারণেই তাদের সদ্ভাব, সৌহার্দ ও মধুর সম্পর্ক গড়ে উঠতে পারেনি। এর জন্য দায়ী কে?

হিন্দু-মুসলমানের বিরোধ ও সংঘর্ষের একটা কারণ হল রাজনৈতিক, আধিপত্য, ক্ষমতা লোভ এবং ধর্মীয় উন্মাদনা।

আর শুরুতে  উপমহাদেশে হিন্দুশাসনের পরিবতর্থে যে মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল তা হিন্দুজাতি মনেপ্রাণে মেনে নিতে পারেনি। অষ্টম শতকের পর থেকে পরবর্তী কয়েক শতক পর্যন্ত মুসলিম সামরিক শক্তির প্রভাব ছিল। এ অপ্রতিহত শক্তির মুখে ভারতীয় রাজনৈতিক শক্তি টিকে থাকতে পারেনি বলে মুসলিম শাসন প্রতিহত করা সম্ভব হয়নি। কিন্তু আর এইজন্য এ দেশের বিজিত হিন্দুগণ নিজ রাজ্যের জন্য দুঃখ-অপমানে-লজ্জায় মুসলিম শাসন অন্তর দিয়ে মেনেও নিতে পারেনি।ভিনদেশীদের কাছে পরাজিত হয়ে নিজে আশ্রিত হয়ে থাকতে হবে তা মেনে নিতে পারেনি । তাদের অন্তরাত্মা বিক্ষোভে ফেটে পড়ছিল। বহু শতকের পুঞ্জিভূত বিক্ষোভ ও প্রতিহিংসার বহ্নির বিস্ফোরণ ঘটেছিল মধ্যভারতে রাজপূত, মারাঠা, শিখদের বিদ্রোহের মাধ্যমে এবং তা সার্থক হয়েছিল ১৭৫৭ সালে সিরাজদৌলার পতনে। তারপর থেকে ঊনবিংশ শতকের শেষ পর্যন্ত দেড় শতাব্দী যাবত মুসলমানদের জীবনে নেমে এসেছিল চরম দুর্দিন। হিন্দু ও ইংরেজদের সম্মিলিত শক্তি দিয়ে তাদেরকে ধরাপৃষ্ঠ থেকে উৎখাত করার সর্বপ্রকার প্রচেষ্টা ও কৌশল অবলম্বন করা হয়।আর এই ভাবে এক অপরে শত্রুতা সম্পর্ক আরও ভয়ংকর থেকে ভয়ংকরী রুপ নিতে থাকে।তার পরেও এই উপমহাদেশ হিন্দু মুসলিম সম্পর্কের বিন্দু মাত্র উন্নতি হয়নি।এই দুই জাতির সম্পর্কের অবনতি শেষ পর্যায় এসে এই দেশ দুই ভাগে ভাগ হয়ে যায়।ধর্মের কাল থাবায় একটি দেশ ভেঙ্গে  দ্বিখণ্ডিত  হয়ে যায়।তার পরেও একটি দেশ রক্ষা হয়নি ধর্মের আগ্রাসনে তাকে আবার রক্তাক্ত হতে হয়েছে।একটা দেশ, সংস্কৃতি তার নিজস্ব অস্তিত্ব রক্ষায় ব্যর্থ হওয়ার পিছনে ধর্মীয় অবদান কতটুকু তা হিসাববিজ্ঞান ছাড়া গণনা করা যাবে না।ধর্ম দ্বারা আমাদের দেশ প্রেম বার বার ধর্ষিত হয়েছে এবং সু সম্পর্ক হয়েছে বিতাড়িত।


EmoticonEmoticon