বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোকে গণতান্ত্রিক যদি প্রতিষ্ঠান হিসেবে দাঁড়াতে হয়, সে-দেশে একদিকে যেমন গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতির উদ্ভব ও বিকাশ প্রয়োজন, অন্য দিকে তার সমর্থনে আইন ও আদালতেরও প্রয়োজন রয়েছে।
একটি গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলের প্রকাশিত গণতান্ত্রিক গঠনতন্ত্র বা সংবিধানের প্রয়োজন। দলটির কাঠামো কী, কর্মপদ্ধতি কী, নেতা নির্বাচন ও প্রত্যাহারের বিধিসমূহ কী, অর্থের উৎস কী, অর্থের রক্ষাণাবেক্ষণ ও হিসেব-নিকেশ কী, তার স্পষ্টতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণে আইন লাগবে।
বাংলাদেশে রাজনৈতিক দল ভাঙ্গার জন্যে দলের অভ্যন্তরে নৈর্ব্যক্তিক নীতিগত ও আদর্শগত পার্থক্যের চেয়ে অধিক দায়ী হচ্ছে দলের নেতৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ব্যক্তিগত ও গোষ্ঠীগত দ্বন্দ্ব - যদিও দ্বন্দ্বরত সকল পক্ষই নীতিগত ও পদ্ধতিগত বিচ্যুতির অভিযোগ করে থাকে প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে।
দ্বন্দ্বরত পক্ষসমূহ নিজেদের ত্রুটি ও প্রতিপক্ষের সঠিকতা দেখার জন্যে প্রস্তুত থাকে না বলে দেখতেও অক্ষম হয়। আর রাজনীতি যেহেতু জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট, তাই দ্বন্দ্ব নিরসনের জন্যে আইনের আশ্রয় নেওয়া যেতে পারে।
অনেক দেশেই কনষ্টিটিউশন্যাল কৌর্ট বা সাংবিধানিক আদালত থাকে, যেখানে রাষ্ট্রনৈতিক দ্বন্দ্ব সংবিধানের মৌলিক আইনের আলোকের মীমাংসা করা হয়। দেশে যদি সাংবিধানিক আদালত না থাকে, সংবিধান অনুসরণ নিয়ে বিতর্ক সমাধানের উপায় থাকে না।
রাষ্ট্র ও রাজনীতি সংশ্লষ্টিতার কথা বিবেচনা করে রাজনৈতিক দলের সাংবিধানিক বিষয়াদি সংক্রান্ত দ্বন্দ্ব বা বিতর্ক সাংবিধানিক আদালতের আওতায় আনা যেতে পারে। দেশের মৌলিক আইনের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ না হলে সাংবিধানিক আদালতের ক্ষমতা থাকবে একটি রাজনৈতিক দলের নেতৃত্ব এবং এমনকি দলটির অস্তিত্ব অবৈধ ঘোষণা করার।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে যে-সংস্কৃতি রয়েছে, তাতে প্রায় প্রতিটি রাজনৈতিক দলে স্বৈরতান্ত্রিক ও বংশানুক্রমিক নেতৃত্ব একটি স্বাভাবিক চর্চা হিসেবে দাঁড়িয়ে গিয়েছে। আর, যেহেতু গণতান্ত্রিক দলের পরিচালনা ছাড়া রাষ্ট্র গণতান্ত্রিক হতে পারে না, তাই গণতন্ত্রহীন রাজনৈতিক দলগুলো রাষ্ট্রপরিচালনায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার প্রশ্নে অযোগ্য ও অবৈধ ঘোষিত হতে পারে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলের মার্কা নিয়ে নির্বাচন কমিশনের দ্বারস্থ দেখেছি দ্বন্দ্বরত দু'পক্ষকে। কিন্তু দলের সংবিধান মানা হচ্ছে কি হচ্ছে না, তা নিয়ে কি আজও পর্যন্ত কি কোনো রাজনৈতিক দলের দ্বন্দ্বরত কোনো পক্ষ আদালতের শরণাপন্ন হয়েছে?
দলের নেতৃত্ব তথা নিয়ন্রণ নিয়ে দুই নেতার নেতৃত্ব ক্লান-বিভক্ত হয়ে নিজেদের মধ্যে গালাগালি, মারামারি, ধরাধারি না করে কি সভ্যরূপে সম্ভাব্য সাংবিধানিক আদালতের শরণাপন্ন হওয়া অধিকতর সভ্য নয়? আমি মনে করি মারামারি চেয়ে মামলা শ্রেয়।
বাংলাদেশে এমন একটি সাংবিধানিক আদালত থাকলে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির বংশানুক্রমিক নেতৃত্বের প্রথার বিরুদ্ধে মামলা করা যেতো। আরও মামলা করা যেতো বাম দলগুলোতে নেতৃত্বের চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের বিরুদ্ধেও।
আমি মনে করি, কোনো ব্যক্তিকে একটি দলের শীর্ষনেতৃত্বের পদে দুটি নির্বাচনী মেয়াদ তথা দশ বছরের অধিক থাকা অনুচিত। আর, বংশনাক্রমিক নেতৃত্ব তথা জাতির দাসত্ব রোধ কল্পে বিদায়ী নেতার সন্তান কিংবা আত্মীয়কে তাৎক্ষণিকভাবে তাঁর স্থাভিষিক্ত হতে দেওয়া উচিত নয়।
দলীয় সদস্য হিসেবে যদি নেতার সন্তান নেতৃত্বে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে চান, তাকে নেতৃত্বের এক পূর্ণ মেয়াদ তথা দু'টি নির্বাচনী মেয়াদের (১০ বছর) আগে নয় অনুমোদন দেওয়া ঠিক নয়, যাতে সে তার প্যারেণ্টের প্রভাব কাজে লাগিয়ে বাড়তি সুবিধা নিতে না পারে।
০৪/১১/২০১৭
লণ্ডন, ইংল্যাণ্ড
EmoticonEmoticon