সোমবার, ১৫ জানুয়ারি, ২০১৮

যশোর রোড প্রসঙ্গে

গাছগুলো কেটে ফেলা হবে। একটা দুটো নয়, দুই হাজার তিনশো বারোটি গাছ। গত কয়েক দিনে একটা মিথ্যে তথ্য ছড়িয়ে পড়তে দেখলাম। এই মিথ্যের পেছনে একটা গভীর অভিসন্ধি অনুভব করি। মিথ্যেটা কি? এই যশোর বেনাপোল সড়ক চার লেন হবে। তার প্রয়োজনে গাছগুলো কাটতে হবে। এখন তুমি কেন দ্বিমত পোষণ করছ ? তুমি কি উন্নয়ন বিরোধী ? আজ এই প্রজেক্টের দায়িত্বশীল কর্মকর্তা, যশোর সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের এক্সিকিউটিভ ইঞ্জিনিয়ার জনাব জাহাঙ্গীর আলমের সাথে কথা বললাম। সত্যটা হচ্ছে, এখানে চার লেন হবার কোন গল্প নেই। দুইপাশে শুধুমাত্র খানিকটা করে প্রশস্ত করা হবে। কতটুকু ? মাত্র ৫ মিটার। অর্থাৎ যে রাস্তাটা এখন ৭.৩ মিটার আছে, সেটি দুই পাশে ৫ মিটার বেড়ে সর্বমোট ১২.৩ মিটার হবে। এর পুরোটা আবার রাস্তাও নয়। এক মিটার করে খালি জায়গা থাকবে। অর্থাৎ রাস্তা বাড়ছে মোট ৩ মিটার। এখন প্রশ্নটা হচ্ছে মাত্র ৩ মিটার রাস্তা বাড়ানোর জন্য আমরা কতখানি ক্ষতি স্বীকার করতে প্রস্তুত। গত কয়েকদিনে ফেসবুকে আমার চিন্তাশীল বন্ধুদেরকে এই গাছ কাটার বিষয়ে প্রতিবাদে সোচ্চার হতে দেখে আমি আশাবাদী হই। আমি এই অঞ্চলের মানুষ। যশোর রোডের এই বৃহৎ বৃহৎ বৃক্ষের তলেই আমার পূর্বপুরুষরা বেড়ে উঠেছেন। শুধুমাত্র ৭১ এর শরণার্থীদের করুণ স্মৃতি বা এ্যালেন গিন্সবার্গের কবিতার কথা বাদ দিলেও, এই অঞ্চলের পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় এই গাছগুলোর ভূমিকা আমাদের জানা। যশোর বেনাপোল রোডের ৩৮ কি.মি. আর ওপারে ৪০ কি.মি. রাস্তায় এই গাছগুলো ৯ লক্ষ ১২ হাজার স্কয়ার ফিট সবুজ পাতার আচ্ছাদন তৈরি করে রেখেছে। যশোর এমএম কলেজের ভূগোলের সহযোগী অধ্যাপক মনে করেন, এই গাছগুলো প্রায় ৩৬ হাজার হেক্টর বনভূমির কাজ করে। বস্তুত ফারাক্কা বাঁধের ফলে চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ, যশোর অঞ্চলের মরুকরণের যে ধাক্কা, সেটার অনেকখানি রক্ষা পেয়েছে এই গাছগুলোর কারণে। এক্সিকিউটিভ ইঞ্জিনিয়ার ভদ্রলোককে আমি প্রশ্ন করেছিলাম, এই গাছগুলো কাটার ফলে পরিবেশের উপর যে বিরূপ প্রভাব পড়বে, সে বিষয়ে কোন সমীক্ষা হয়েছে কি’না ? পরিবেশ মন্ত্রণালয় এই প্রকল্পের অনুমতি প্রদান করেছে কি’না ? ভদ্রলোকের উত্তর ছিল বিস্ময়কর। তিনি জানালেন, না। এমন কোন সমীক্ষা হয় নি। আর পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের ছাড়পত্র লাগে তখনই, যখন নতুন কোন স্থাপনা তৈরি করা হয়। যেহেতু এখানে আগে থেকেই রাস্তা আছে, ফলে তেমন অনুমতির আসলে কোন প্রয়োজন নেই। কথা বললাম, পরিবেশ অধিদপ্তরের যশোর অফিসের সাথে। অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, এই বিপুল পরিমাণ বৃক্ষরাজি নিধন করা হলে, এখানকার জন জীবনে কি ধরনের বিরূপ প্রতিক্রিয়া পড়তে পারে, সেটা জানার জন্য তাঁরা কোন উদ্যোগ গ্রহণ করেন নি। এই গাছগুলোর উপর স্থানীয় অনেকের অনেক লোভী দৃষ্টি রয়েছে। অতীতে ঝড়ে ভেঙে পড়া গাছের দখল নিয়ে বিক্রি করতে মারামারি ও মানুষ খুনের মতো ঘটনাও ঘটেছে। ফলে এই প্রকল্পটিকে আমি উন্নয়ন হিসেবে নয়, এই গাছগুলোকে লোপাট করার একটা গভীর ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখছি। গত বছর পশ্চিমবঙ্গেও একই কাণ্ড হয়েছিলো। সেগুলোও উপারে যশোর রোডের ৪০ কিমি অংশ জুড়ে থাকা গাছ। দেখেছি কবীর সুমন, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের মতো মানুষসহ, বিভিন্ন পরিবেশবাদী সংগঠন, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, সাধারণ মানুষ, স্কুলের ছাত্রছাত্রীরা মিলে এই গাছ কাটাকে রুখে দিয়েছিলেন। আমাদেরকেও যেকোনো মূল্যে এই গাছ কাটা রুখে দিতে হবে। কিন্তু হাতে সময় খুব অল্প। টেন্ডার হয়ে গেছে। যাচাই বাছাই চলছে। ফেব্রুয়ারি থেকে কাজ শুরু হবে। আমরা সংগঠিত হতে কি এর চেয়ে বেশি সময় নিয়ে নিব ?


EmoticonEmoticon