শনিবার, ২ জুন, ২০১৮

ক্রসফায়ার...

বাংলাদেশে বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শুরু হয়েছিল আজ বাংলাদেশে বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের নির্দেশদাতা শেখ হাসিনার পিতা শেখ মুজিবের নির্দেশে। তিনি ধারণাটি পেয়েছিলেন মূলত ভারত থেকে, ১৯৭৩ সালে ভারতের পশ্চিম বঙ্গে নকশালবাদী আন্দোলন নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য কলকাতার তৎকালীন পুলিশ কমিশনার রণজিৎ গুপ্ত এই কৌশলটি প্রয়োগ শুরু করেন। পশ্চিমবঙ্গ পুলিশ এর নাম দিয়েছিল: "পুলিশ এনকাউন্টারে মৃত্যু"। বাংলাদেশে বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের মাঝে আলোচিত ঘটনা হল তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবের নির্দেশে বাংলাদেশের চে গুয়েভারা সিরাজ সিকদারকে ১৯৭৫ সালের ২ রা জানুয়ারি আটক অবস্থায় গুলি করে হত্যার ঘটনা। সংসদে দাঁড়িয়ে দম্ভ ভরে শেখ মুজিব বলেছিলেন: ‘কোথায় আজ সেই সিরাজ সিকদার?’ তার কয়েক মাসের মাঝে তিনি নিজেও নিহত হন সেনাবাহিনীর হাতে।

সিরাজ সিকদার হত্যার বিবরণটি তার হত্যার ১৭ বছর পরে দায়েরকৃত মামলায় পাওয়া যায়: ১৯৭৫ সালের ১ লা জানুয়ারী সর্বহারা পার্টির মাঝে সরকারী চরের তথ্যমতে আগের দিন চট্টগ্রামের নিউমার্কেট এলাকা থেকে অন্য একজনসহ সিরাজ সিকদারকে গ্রেফতার করে ঐদিনই বিমানে করে ঢাকায় আনা হয়। ঢাকার পুরাতন বিমান বন্দরে নামিয়ে বিশেষ গাড়িতে করে বন্দীদের পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চের মালিবাগস্থ অফিসে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে সিরাজ সিকদারকে আলাদা করে তার উপর অমানুষিক নির্যাতন চালানো হয়। ২রা জানুয়ারী সন্ধ্যায় পুলিশ ও রক্ষীবাহিনীর বিশেষ স্কোয়াডের অনুগত সদস্যরা বঙ্গভবনে শেখ মুজিবের কাছে সিরাজ সিকদারকে হাত ও চোখ বাধাঁ অবস্থায় নিয়ে যায়। সেখানে শেখ মুজিবের সাথে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ক্যাপ্টেন (অবঃ) মনসুর আলী, পুলিশ সুপার মাহবুব উদ্দিন আহমেদ, আব্দুর রাজ্জাক এমপি, তোফায়েল আহমদ এমপি, সাবেক আইজি পুলিশ ই.এ. চৌধুরী, রক্ষীবাহিনীর মহাপরিচালক কর্নেল (অবঃ) নূরুজ্জামান, মোহাম্মদ নাসিম এমপি, শেখ মুজিবের পুত্র শেখ কামাল এবং ভাগ্নে মনি উপস্থিত ছিল।

প্রথম দেখাতেই উত্তেজিত শেখ মুজিব সিরাজ সিকদারকে গালিগালাজ শুরু করেন। সিরাজ এর প্রতিবাদ করলে শেখ মুজিবসহ উপস্থিত সকলে তার উপর ঝাপিঁয়ে পড়েন। সিরাজ সে অবস্থায়ও শেখ মুজিবের পুত্র শেখ কামালের ব্যাংক ডাকাতিসহ বিভিন্ন অপকর্ম, ভারতীয় সেবাদাসত্ব না করার, দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য শেখ মুজিবের কাছে দাবি জানালে শেখ মুজিব আরো উত্তেজিত হয়ে উঠেন। মাহবুব উদ্দিন তার রিভলবারের বাট দিয়ে মাথায় আঘাত করলে সিরাজ সিকদার মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। শেখ কামাল রাগের মাথায় গুলি করলে সিরাজ সিকদারের হাতে লাগে। ঐ সময় সকল আসামী শেখ মুজিবের উপস্থিতিতেই তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে কিল, ঘুষি, লাথি মারতে মারতে তাকে অজ্ঞান করে ফেলে। এরপর শেখ মুজিব, মনসুর আলী এবং অন্যরা সকলে মিলে সিরাজ সিকদারকে হত্যা করার সিদ্ধান্ত নেন এবং পুলিশ সুপার মাহবুব উদ্দিনকে নির্দেশ দেন।

মাহবুব উদ্দিন আহমদ বন্দী সিরাজ সিকদারকে শের-এ-বাংলা নগর রক্ষীবাহিনীর সদর দফতরে নিয়ে যায়। এরপর তার উপর আরো নির্যাতন চালানো হয়। মূলত সেখানে রাত ১১টার দিকে রক্ষীবাহিনীর সদর দফতরেই সিরাজ সিকদারকে গুলি করে হত্যা করা হয়। পরে বিশেষ স্কোয়াডের সদস্যগণ পূর্ব পরিকল্পনানুসারে বন্দী অবস্থায় নিহত সিরাজ সিকদারের লাশ সাভারের তালবাগ এলাকায় ফেলে রাখে, সাভার থানা পুলিশ পরের দিন ময়না তদন্তের জন্য লাশ মর্গে প্রেরণ করে। কিন্তু সরকারি ঘোষণায় বলা হয়, বন্দী অবস্থা থেকে পালিয়ে যাবার চেষ্টা করায় পুলিশ এনকাউন্টারে সিরাজ সিকদার নিহত হন। ঘটনার বিবরণটি ১৯৯২ সালে দায়েরকৃত মামলা থেকে দেয়া। তার সাথে বন্দী অন্য ব্যক্তির খোঁজ মেলেনি আর কখনও।

২০০২ সাল থেকে বাংলাদেশে ক্রসফায়ার পদ্ধতির পুনঃপ্রয়োগ শুরু হয়। বিএনপি-জামাত সরকার আমলের সেসময় স্বল্পমেয়াদী অপারেশন ক্লিনহার্ট চালু করা হয়। পরে ২০০৪ সালে গঠিত বিশেষ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটেলিয়ন গঠিত হলে ক্রসফায়ারের সংখ্যা বেড়ে যায়। সে থেকে ১০০০ এর উপর মানুষ ক্রসফায়ারে হত্যার শিকার হয়েছেন ।


EmoticonEmoticon