শ্রাবনমাস, কয়েকদিন ধরে লাগামহীন বৃষ্টি। যমুনা, ধলেশ্বরীর চর এলাকার গ্রামগুলি সব পানির নীচে। এই দূর্যোগে আমি ভূয়াপুর গিয়েছিলাম এক ভোঁতা ইঞ্জিনিয়ারকে সামাল দিতে। সাইডে কনষ্ট্রাকশন কাজের মেজারমেন্ট। কিছু তেল মসল্লার ব্যাপার; ক্যাশ এ্যান্ড কাইন্ডস। সেলফোনটি বাজছে তো বাজছে, সামনে ট্যাপার বটতলায় চায়ের দোকানে যেয়ে দেখবো। রিং টোন বন্ধ হয়ে গেছে, বোধ হয় ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। আবার বাজতে শুরু করে। মটর সাইকেল একটি গজারি গাছের নীচে রেখে চায়ের দোকানের সামনে চলে আসি। রেইন কোট খুলে, মোবাইল বের করে মনিটরে দেখি অচেনা বাংলা লিংক নাম্বার। খুব গরম চায়ের অর্ডার দিলাম, তপ্ত চা খেতে খেতে অজানা নাম্বারে বাটন টিপলাম, কল হচ্ছে। ওপার থেকে ভারী মিষ্টি গলা ভেসে আসছে হ্যালো হ্যালো। আমি শিহরিত হলাম, এক অচেনা মেয়ের সুমধুর কন্ঠস্বর। রুবেল ভাইা তুমি আমাকে চিনতে পেরেছো। ভারী লজ্জায় পড়ি, আমি চুপ করে থাকি। প্রত্যুত্তোরে হ্যালো হ্যালো করছি আর কিছু বলার মতো কথা খুজে পাইনা।
আমি মালতী.....
হঠাৎ বুকের ভিতর তীব্র বিদ্যুৎ প্রবাহ ঝাকুনি দিলো; আমি ভাবতেই পারছিনা মালতীর কন্ঠস্বর শুনছি। আবেগ তাড়িত হয়ে বলিÑআ’য়্যাম ছরী, তুলাপাত্রী কিবা আছ? ভালো নেই তাই তোমাকে খুজছি। রুবেল ভাই তোমাকে দুই বার রিং করলাম তুমি ধরলানা? আ’ম সরি, আমি বৃষ্টিতে ভিজ্যা একাকার, তখন ধরতে পারিনি, এক চায়ের দোকানে ঢুইক্যাই তোমাকে ফুন দিছি। তুমি কুনহানে? আমি টাঙ্গাইলে নিরালার মোড়ে তোমার দোকানে। হোয়াট্স হ্যাপেন্ড মালতী? তুমি ভাল নেই কইতাছো; আমি কিছুই বুঝবার পারতাছিনা। আমি খুব প্রবলেমে আছি। তাই তোমাকেই বলতে ঢাকা থেকে সোজা টাঙ্গাইল চলে এসেছি। তুমি এই বর্ষায় কোথায়? আমি ভূয়াপুর রোডে ট্যাপার বটতলার মোড়ে, আধাঘন্টার মধ্যে আইয়া পড়–ম, তুমি আমার দোকানে বসো প্লিজ। রুবেল ভাই বর্ষা থামলে এসো, বৃষ্টিতে ভিজোনা। তুমি আমার সেল্সম্যানকে মোবাইলটা দ্যাও, আমি ওরে কইত্যাছি। ওকে কিছু বলার দরকার নেই, তুমি রেইনকোট নিয়েছো? হ্যা রেইনকোট আছে। দেখা হবে বাই রাখি। ফোন ছেড়ে দিলো, দীর্ঘদিন দেখা নেই, মোবাইল অফ করলো।
মালতী তুলাপাত্রকে আমি ঠাট্টা করে তুলাপাত্রী বলতাম। প্রায় তিন বছর ওর সাথে দেখা নেই। আমিও এখন নাটকপাড়া প্রায় ছেড়েই পেটের ধান্ধায় উল্টোপথে হাটছি কন্ট্রাক্টারিতে। পারিবারিক সূত্রে। মালতী কী একটা এনজিওতে চাকরি নিয়ে চলে যায়। মোবাইলটা হারিয়ে গেলে ওর নাম্বারও হারিয়ে যায়। তার সাথে প্রথম পরিচয় পর্বটা মনে পড়ছে, তখন আমি সদ্য ঢাকার বিবিএর পাঠ চুকিয়ে টাঙ্গাইলে নাটক পাড়ায়। একদিন বিকেলে শহীদ মিনারের বেদীত বসে আড্ডা মারছি। সাথে ছিল সম্ভবতঃ মন্ডল, সালমা আর জর্জ। সূর্য পশ্চিমে বাড়িঘর গাছপালার আড়ালে ঝাপ দিয়েছে। একটু শীতার্ত আবহাওয়া হেমন্তকাল, হাফ সোয়েটার পরেছি। হঠাৎ আলোকজ্জ্বল দ্যূতি ছড়িয়ে, লং ষ্ট্রেইট চুল ঝাকিয়ে সুবাসিত করে ও এলো। জর্জ পরিচয় করিয়ে দিল, মালতি তুলাপাত্র, সেকেন্ড ইয়ার কলা বিভাগ, কুমুদিনী গার্লস কলেজ। আমাদের গ্রুপে নাটক করতে চায়। ও সেদিন পরেছিলো থ্রি কোয়ার্টার হাতার মেরুণ রংয়ের কামিজ, সাদা চুড়িদার সেমিজ ও সাদা ওড়না। এসেই ও আমার পাশে বসে পড়ে, কেননা আমি সারির শেষে বসেছিলাম। ও কথার ফুলঝুরি ফুটাতে থাকে, চেহারা চোখে মুখে এক উজ্জ্বল দীপ্তলাবণ্য, কোন আড়ষ্টতা নেই । তখন জানলাম ওর অনেক গুন আবৃত্তি করে, নাচ জানে, কবিতাও লেখে।
মটরসাইকেল চালিয়ে নিরালার মোড়ে এসে দোকানের সামনে রাখি। হেলমেট ও রেইনকোট খুলে দোকানে ঢুকি। এই বৃষ্টি বাদলে রড-সিমেন্ট কিনবো ক্যাডা, দোকান খুইল্যা হুধাই বইয়া থাকুইন, আইজ কী ব্যাচা বিক্রি হইছে? না ভাইজান; এই বাদলে কুনু খইদ্দারপাতি আয় নাই। আপনারে এক আপায় খুইজত্যা আইছিলো। হঅ-- আমার সাথে কথা হইছে; এখন দোকানের সার্টার বন্ধ করো। বইয়া বইয়া ঝিমাইলে লাভ নাই। কাল দোকান খোলনের কাম নাই। ভূঁয়াপুর সাইডে যাউন লাগবো, একদম বিয়াইনে ষ্টার ওয়েল্ডিং থিকা পিকআপে কইরা গ্রিলগুলি নিতে হইবো। মোবাইলের রিং টোন বেজে ওঠে। প্যান্টের পকেট থেকে মোবাইল দ্রুত বের করে মনিটরের স্ক্রিনে তাকালাম; মালতির নাম ভেসে এলো। হ্যালো আমি মালতী। তুমি এখন কোথায়? নিরালার মোড়ে। তোমার সাথে আমার দেখা করা জরুরী। তুমি তো আর একটু বইলেই আমার সাথে দেখা হইতো। তোমার দোকানে দীর্ঘক্ষন কী করে বসে থাকি? একট ুদেরি করলে দেখা হতো। তুমি কী তোমার জ্যাঠার বাসায় আছো। হ্যাঁ ওটাই তো এখানে আমার ঠাই। আমি ওখানে আসতাছি সন্ধা ৭ টায়; পুরাতন আদালত পাড়ার সেই আগের বাড়ি। হ্যা মান্নান পালোয়ানের পাশের একতলা বাড়ি।
এখন বৃষ্টি নেই, সারা আকাশ মেঘাচ্ছন্ন, গুমোট। রিক্সা নিয়ে পুরাতন বাসষ্টান্ড ছাড়িয়ে আদালত পাড়ায় চলছি। রাস্তাঘাটে কয়েক জায়গায় পানি জমে আছে। বন্যার পানি শহরেও ঢুকেছে মান্নান পালোয়ানের বাড়ির সামনে রিক্সা থেকে নামি। একতলা বাড়ির সামনে বড় শিউলি গাছ। পুরাতন বাড়ি একটু জীর্ণ; বাড়ির সামনে একটি সেলুন ও মুদিখানা। কাঠের গেট খুলে চওড়া বারান্দায় ইতস্ততঃ করছি। কলিং বেল টিপি কেউ দরজা খুলছে না, বোধ হয় কলিং বেলটাই ঠেসে গেছে। লাইটপোষ্টের আলো এসে বারান্দায় পড়েছে। ঝরেপড়া শিউলির ঘ্রাণ বাতাসে ভাসছে। দুই পাল্লার কাঠের দরজা, বড় বড় কড়া লাগানো। বার দুই কড়া ধরে নাড়লাম। ভিতর থেকে ছিটকেনি খোলার আওয়াজ হলো। নাদুষ নুদুষ কিশোর একটি ছেলে থ্রি কোয়ার্টার প্যান্ট পরে আদুল গায়ে দরজা খুলে দিলো। ভিতরের টিউব লাইটের আলো এসে চোখে পড়ে।
আদাব্ কাকে চান? মালতি তূলাপাত্র। ডেকে দিচ্ছি, আপনি বসেন। কিশোর ছেলেটি হেলেদুলে ভিতরের পর্দা উচিয়ে চলে গেলো। আমি উৎকন্ঠা নিয়ে দাড়িয়ে আছি।
আরে রুবেল ভাই তুমি দাড়িয়ে রয়েছো তোমাকে মন্টা বসতে বলেনি। কইছে আমি নিজেই খাড়াইয়া আছি, তুমি আইয়া কইলেই বমু তাই। আমি বসবো কী মালতীকেই দেখছি হালকা মেরুনের সিল্কের উপর রূপালী প্রিন্টের শাড়ি, কপালে বড় টিপ, রুজ লিপিস্টিক মেখেছে তাতে তার ন্যাচারাল লুক কিছুটা মার খেয়েছে। এত প্রসাধনি করেও তার চোখ মুখের বেদনা ও বিষহ্নতার ছাপ লুকোতে পারেনি। তার সেই চির পরিচিত হৃদয় উপড়ানো বড় বড় টলটলে চোখে আমার দিকে তাকিয়ে বলে, কী ব্যাপার এখনো বসছোনা কেন রুবেল ভাই; তুমিতো বেশ শুখিয়ে গেছো। আমি একটু হেসে বলি, টাকা রোজগারের বিশ্রি কিম্পিটিশনে দৌড়াইয়া কাহিল। কতকাল পরে তোমার সাথে দ্যাখা সত্যিই ভাবতেই পারতাছিনা। রুবেল ভাই বসো, আমি একটু ভিতর থেকে আসছি। আমি বসবো কী ওকেই দেখছি, আমার চোখ আটকে আছে ওর দিকে। পর্দা সরিয়ে সে ভিতরে চলে গেলো। আমি বসে পড়ি, পুরানো মোটা বেতের সোফা, নীল কভারের গদি, একটি কাঁচের শোকেচ ভর্তি বই, অনেকগুলি ক্রেষ্ট ও মেডেল। মালতী ঘরে এসে সোফায় আমার পাশে বসে। বাতাসে তার শরীরের সুবাশিত ঘ্রাণ নাকে লাগছে, ও নিশ্চুপ হয়ে বসে হাতের মসৃন পেলব আঙ্গুলগুলি খুটছে। নখ গুলিতে টিয়া রংয়ের পালিশ, ফর্সা ভরাট হাতের দুপাশেই মেহেদীর চমকপ্রদ কারূকার্য। দুহাতে মেরুণ রংয়ের কাঁচের চুড়ির বিস্তরণ, তার দুপাশে রূপালি চুড়ির শৈল্পিক সীমানা। মৃদু হস্ত সঞ্চালণায় কাঁচের চুড়ির শব্দতরঙ্গ ।
তুমি আমারে তলব করলা, তাই তোমার কাছে চইল্যা আইলাম, এবার কও কী হয়েছে। কী করে বলি তোমাকে। দু’রাত নির্ঘুম কাটিয়েছি তারপর টাঙ্গাইলে চলে এসেছি। আমাকে কইতে পারবানা ক্যান? রুবেল ভাই চমচম খাও, তুমিতো আবার চমচম খুব পছন্দ করো।
তোমার তা মনে আছে? মনে থাকবে না কেন? এসব কী ভোলা যায়। ঠিক আছে চা খাইতে খাইতে তোমার কথা শুনি। বিষয়টা গোপন রেখো, বোঝতো এমনিতে মেয়ে তারপর আমাদের নানান প্রবলেম। ঠিক আছে গোপন রাখুম। আমি তো প্রথম উন্নয়ন ধারা’তে চাকরি নিয়ে ময়মনসিং চলে যাই। রিমোট গ্রামে থাকতে হতো, নান্দাইলের বিভিন্ন গ্রামে যেতে হতো। তারপর সে চাকরি ছেড়ে দিয়ে চলে আসি ঢাকায়। ক্যান ছাইড়্যা দিলা, তোমাগো গ্রামতো ময়মনসিংয়ের নান্দাইলে? বাবা ভাইরাতো ময়মনসিংহ শহরে থাকে, পাটগুদামের কাছে বাসা, গ্রামে আমাদের কিছুই নেই সে আর এক ইতিহাস। তারপর ঢাকায় এসে যোগ দিলাম আর একটা এনজিওতে ইউডিসি। বস্তিতে কাজ ভাষানটেক, যাত্রাবাড়ী বস্তিতে গণশিক্ষা কার্যক্রম। এই চাকরি করে বেইলি রোডের নাটক পাড়ায় ঘোরাফেরা করতে থাকি। ঢাকার কালচারাল মহাসমুদ্রে ঠাই পায়া ছিল আমার জন্য খুবি কঠিন। ইউডিসি’র পরিচালক নাজনীন আপা খুব ভাল ছিলেন। বেতন ছিল খুবি কম, ফান্ড থাকতে হবে না?
আরন্যক নাট্যগোষ্ঠীর নাজমুল ভাই আমাকে একটি নুতন চাকরির ইনফরমেশন দিলেন। সংস্থার নাম পিপলস থিয়েটার এন্ড এডুকেশন; সংক্ষেপে পিটিই। এদের প্রধান কার্যক্রম হচ্ছে গণনাটকের মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে সচেতন ও শিক্ষিত করা। নাজমুল ভাই আমাকে প্রথম আলোর বিজ্ঞাপণের কপি দিলেন। আমি বললাম শুধু ইন্টারভিউতে কী চাকরি হবে। নাজমুল ভাই বললেন, পরিচালককে আমি ভাল চিনি, টাঙ্গাইলের লোক, নাম ইমরোজ হাসান আমি তাকে বলে দিবো। আমি ইন্টারভিউ দিলাম, আমাকে সিলেক্ট করা হল। চাকরিতে যোগ দিয়ে খুব উৎসাহিত হলাম। আগের চাকরি আমার কাছে বোরিং ছিলো, বেতনও ছিল খুবি কম। এই চাকরিতে এসে প্রাণ ফিরে পেলাম, কেননা আমি তো নাটক পাগল। কিছুদিনের মধ্যে অনেকের প্রসংশা কুড়োলাম।
আমার চোখে তার এই দুঃখের দিনে সাজগোজ দেখে খটকা লাগে। তাই ওকে জিজ্ঞাসা করি, আজকে অনেক সাজগোজ করেছো, ব্যাপার কী? আমি আর বৌদি যাবো কাগমারি, বিয়ের একটা ইনভাইট আছে সেই জন্য একটু। তাইলেতো তোমার হাতে সময় কম। সময় আছে। আমাদের প্রথমে কাজ ছিল ঢাকার গার্মেন্টস শ্রমিকদের ভিতর। গণনাটকের মাধ্যমে তাদেরকে এ্যাওয়ার করা। বিজিএমই সরকারকে প্রভাবিত করে আমাদের উপর চাপ সৃষ্টি করে। ডোনাররাও ফান্ড বন্দ করে। গার্মেন্টস সেক্টরে গণনাটক বন্দ হয়ে যায়। তাইলেতো তোমাগো প্রজেক্ট বন্দ। না ফান্ড সংকট কাটিয়ে ওঠে, নুতন করে বড় বড় ফান্ড বাগায়। ইউএসএইডের ফান্ড ও অন্যান্য ডোনারদের। কিছু লোকাল এনজিওদের সাথে কালচারাল জয়েন্ট প্রোগ্রাম। তাইলেতো ভালোই। ইমরোজ ভাইয়ের এক পেয়ারের লোক তারেক হাসান গ্যাড বিশেষজ্ঞ তিনি আবার ঢাকার সিভিল সোসাটির বড়নেতা । সেই তাকে বড় বড় ফান্ড যোগাড় করে দেয়।
(চলবে)
EmoticonEmoticon