হারুন রশিদ লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
হারুন রশিদ লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

বুধবার, ২২ আগস্ট, ২০১৮

ছহিলুদ্দি ও জেন্ডার বিশেষজ শেষ অংশ

আরে কীয়ের গ্যাড? বুঝবার পারলামনা একটু খোলসা করো।
গ্যাড হইলো জেন্ডার এন্ড ডেভেলপমেন্ট, এরা নারী উন্নয়ন ও নারীর ক্ষমতায়ণের লক্ষ্যে কাজ করে।
শোনো তাহলে; গণনাটকে নতুন টেকনোলজি যোগ হয়, ইমপ্রোভাইজেশন কোরিওগ্রাফি। বেশ কিছু নারী পারফরমার নিয়োগ দেয়া হয়। কোলকাতা থেকে একজন কোরিওগ্রাফারও আনা হয়। তবে ইমরোজ ভাই মানে আমাদের ইডি, নিজেই কোরিওগ্রাফির প্রশিক্ষন দিতে শুরু করেন। উনি বোঝেন কোরিওগ্রাফির ঘোড়ার আন্ডা। ভাল বাংলাই বলতে পারেনা। তিনি আবার মডার্ণ ডান্স নিয়ে মুখস্ত লেকচার ঝাড়েন।

তোমার ইডিতো ভালই মুখস্ত বিদ্যাধরি।

এই কষ্টেও সে একটু স্মিত হেসে বলে, বিদ্যাধরি না ছাই। নাচে কোরিওগ্রাফির ব্যাবহার মূলতঃ ডান্স কমপোজিশনে।  ইমরোজ সাহেব করেন কী, প্রশিক্ষণ কালে নিজেই কোওিগ্রাফি শেখানোর ছলে মেয়েদের শরীরের স্পর্শকাতর স্থানে প্রকাশ্যে হাত দেন। বস্তির অল্প শিক্ষিত তরুনী ও গ্রামের দরিদ্র পরিবারের মেয়েদের চাকরি দিয়ে, বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে তাদের সাথে শারিরীক সম্পর্ক স্থাপন করেন, সাথে ঐ জেন্ডার বিশেজ্ঞও। আমাকেও কয়েকবার তাদের নিগ্রহের মোকাবেলা করতে হয়।

ওর বাড়ি টাঙ্গাইল কুনহানে?

শুনেছি গোপালপুরের দিকে।

ওর কুনো ফডু দেখাইবা পারো?

মোবাইলে আছে।

ঐ হালার পুতরেতো আমি চিনি। আমাগো লগে কিছু দিন নাটকে আছাল। এই চেয়ার বেঞ্চ ঝাঢ়পুছ, মাঝে মাঝে সাইড সুইডের পাঠ করতো। তারপর ও তো ময়মনসিং ভালুকার দিক যাইয়া পোনার ব্যাবসা শুরু করে। হুনছি যে ও ঢাহায় যাইয়া এহন এনজিও ব্যাবসা করতাছে। ওর নামতো আছাল ছহিলুদ্দি; ইমরেজ হাসান হইলো ক্যামনে?  ও হালায়তো এসএসসি পাশ দিতেও পারে নাই। দ্যাশে হইলোডা কী। তা তুমি ঐহানে ভিড়লা ক্যান? 

আমি কী এত সব জানতাম।   শোনো তাহলে; সেদিন সন্ধ্যায় বেইলী রোডে বসে আড্ডা মারছি। আমার মোবাইল বেজে ওঠে; ইডির নাম্বার মোবাইল স্ক্রিনে দেখছি। উনি বললেন জরুরি কাজ, তুমি আজিজ মার্কেটে পাঠক সমাবেশের পাশে শ্রাবনীতে আসো। আমি সিএনজি নিয়ে চলে এলাম। এসেই দেখি, পাঠক সমাবেশের গলিতে দাড়িয়ে গ্যাড বিশেষজ্ঞ তারেক হাসান সাহেব। হাত মুঠো করে তার বিশেষ ভঙ্গিমায় সিগারেট টানছেন।

আমাকে দেখেই মুচকি হেসে, তার মর্দা হাসের মত ফ্যাসফেসে গলায় বললেন, আরে ম্যাডাম তোমাকে খুজেই পায়া যায়না, তুমিতো এখন খুব ব্যস্ত।
প্রতুত্তোর না দিয়ে বলি, ইমরেজভাই রিং দিলেন উনি কোথায়?

ইমরোজ আছে। একথা বলে উনি আলতো করে পিঠে হাত দিয়ে বলেন, চলো সামনে এগোই।

বলা মাত্রই ষ্টার্টেড টু ওয়াক উইথ হিম।

ঝাঝঁ মাখা স্বরে মালতী বলে, হ্যাঁ চললাম তোমার মতো সোনার চামচ মুখে দিয়েতো জন্মাইনি। দারিদ্রতার মাঝে বেড়ে উঠেছি, বাবা মৃত্যূ শয্যায়, ছোটভাই ময়মনসিং মেডিকেলে পড়ে, একমাত্র আমিই উপার্জনক্ষম।  ঐ গ্যাড বিশেষজ্ঞ ব্যাডা কিয়ের কাম করে। সে ঢাকার সিভিল সোসাইটির বড় একজন নেতা। উন্নয়ন ও জেন্ডারের উপর বাংলা ও ইংরেজিতে তার লেখা কয়েকটি বই আছে। তবে তার বড় পরিচয় ডোনারদের সাথে তার হট কানেকশন আর সরকারি মহলে তাঁর ভাল যোগাযোগ। উচ্চশিক্ষিত, শুনেছি বিদেশী একখান ডিগ্রিও নাকি তাঁর আছে।
ঠিক আছে তারপরের ঘটনা বলি, ইমরোজ সাহেব ধারে কাছেই ছিলেন।

আমি একটু উচ্চস্বরে বলি, আরে ঐ ছলিহুদ্দিরে ইমরোজ সাহেব কইতাছো?

মালতী একটু হকচকিয়ে যায়, তা আমি কী বলবো।

ছহিলুদ্দি কইবা।

ঠিক আছে।  ছহিলুদ্দি ঝড়ের বেগে বলেন, চলো নীচে যেয়ে গাড়িতে উঠে পড়ো, আমরা কিছু খেতে যাই। দুপুরে লাঞ্চ করার সময় পাইনি। খেতে খেতে তোমাকে কিছু দরকারি কথা কমু।

ও হালায় গাড়ি বাগাইছু?

ডোনারদের ফান্ডে খানদুই গাড়ি কিনেছে।

সারা আকাশ মেঘে ঢাকা, টিপ টিপ বৃষ্টি ঝরছে। আমরা একটু দৌড়ে গাড়িতে উঠি। অনেকটা দ্বিধাদ্বন্দের ভিতর দিয়ে উঠি। আমি ড্রাইভারের পাশের সিটে বসি। তাঁরা চাপাচাপি করছিলো, পিছনের সিটে তাদের পাশে বসতে। গাড়িতে কোন কথা হয়না, গাড়ি সাইন্স ল্যাবরটরির কাছে এসে থামে। আমরা হেটে হেটে মালঞ্চ রেস্তোরাঁয় চলে আসি। ভিতরে ঢুকে একটি খালি টেবিলে বসি।

তারেক সাহেব বলেন, আরে সুন্দরী কী খাবে বলো। আমি বলি, বিকেলে অনেক নাস্তা করেছি এখন কিছু খাবনা।

তাই কী হয়, আমরা রাতের ডিনার এখানেই সেরে ফেলি। বলো তুমি কী পছন্দ করো।
অগত্যা তাদের চাপাচাপিতে বলেই ফেললাম, পরাটা আর মাটন কারি। ইমরোজ ভাই বললেন।

আবার ইমরোজ। আর কীয়ের ভাই ঐ লম্পট হালায়।

সরি, চাকরি করে এতেই অভ্যস্ত হয়েছি।

ঠিক আছে কইতে থাকো।

ছহিলুদ্দি বললো, তুমি পেশোয়ারি পরাটা, মাটন রেজালা আর চিকেন ফ্রাই নাও। আমরা সাদা পোলাও, চিকেন কারি ও ইলিশ ফ্রাই নি।

মেনুর বর্ণনা শুনে উত্তেজিত ভাবে আমি বলে উঠি, আর তুমি ঐ বাস্টার্ডগো লগে বইয়া গপাগপ খাইত্যা শুরু করলা।

আমি অসহায় মেয়ে, ভয়ানক পরিস্থিতিতে পড়েছি রুবেল ভাই তুমিতো সব শুনবা।

ওকে কইতে থাকো। 

খেতে খেতে আমার ডিরেক্টর বলে--- এবার ও ফুঁপিয়ে উঠে শাড়ীর আচলে চোখ মুখ ঢেকে ফেলে। উঠে দাড়িয়ে কান্না জড়ানো কন্ঠে বলে, আমি আসছি।

আবারও দ্রুতপদে ভিতরে চলে গেলো। আমি আর কিছুই ভাবতে পারছি না। ঘটনা কতদুর গড়িয়েছে, ওকি নিজেকে রক্ষা করতে পেরেছে না এইসব লোফার, হায়নাদের ফাঁদে পড়েছে। কিছু পরে মালতী আবার ধীর পায়ে ফিরে আসে, হাতে এককাপ ধুমায়িত চা। তার মুখে সদ্য দেওয়া জলের ঝাপটার রেশ প্রতিভাত।

তোমার জন্য গরম চা নিয়ে এলাম। তুমি ঠান্ডা চা চুমুক দিচ্ছিলে, আমার
খারাপ লাগছিলো।

আমি খুব বিস্মিত হলাম, এই পরিস্থিতিতে ও কীভাবে এগুলি করছে। আমি ওর দিকে তাকালাম ওর জেদি, ব্যথাতুর মুখচ্ছবি দেখে আমার চোখ ঝাপসা হয়ে এলো। আমি বললাম ক্যান তুমি আবার চা আনতে গ্যালা।

তুমি ঠান্ডা চা খাচ্ছিলে। আমাদের আড্ডায় তোমার চা একটু কম গরম হলে, তুমি কি কান্ডই না করতে।

আমি চা খাচ্ছি ও নিশ্চুপ আমি বেশ উৎকন্ঠায় আছি, মালতীতো আর কিছু বলছে না। কী ঘটেছে, জানবার জন্য ব্যাকুল। আমি আবার চোখ তুলে ওর দিকে তাকালাম।

ও আবার বলতে শুরু করে, ইডি সাহেব কোন ভণিতা না করেই তারেক সাহেবের সামনেই বলেন, থিয়েটার প্রোগ্রামে আমাদের ফান্ড ক্রাইসিস হয়,
তারেক ভাই আমাদের কাণ্ডারি হয়ে আগাইয়া আসেন। ইউ এস এইড, জোভিব থেকে তিনিই আমাদের বড় ফান্ড যোগাড় কইরা দেন, তুমিতো জানো তাঁর বিষয়ে। তোমার পারফরমিন্স ও সাংগঠনিক কার্যক্রম দেইখ্যা
উনি তোমার ব্যাপারে খুবই ইমপ্রিস। ওনার প্রস্তাবণায় আমরা সিদ্ধান্ত নেছি তোমাকে প্রোগ্রাম কো-অর্ডিনেটর হিসেবে প্রুমুশন দিবার।

আমি মনে মনে কিছুটা পুলকিত হলাম, তবুও বললাম আমার অভিজ্ঞতা কম, লেখাপড়াও সিম্পল গ্রাজুয়েট। এতবড় দায়িত্ব পালন করতে কী পারবো?

এবার তারেক সাহেব তার ফ্যাসফেসে গলায়, কুতকুতে চোখে তাকিয়ে, তার বা হাত টেবিলের নীচ দিয়ে আমার উরুতে একটু চাপ দিয়ে হেসে বলেন, আরে সুন্দরী কেন পারবেনা, ইউ আর আ প্রেটি এন্ড  জিনিয়াস । তোমার ভিতর সুপ্ত প্রতিভা আছে।

ভুলে গেলাম, আমার ডিরেক্টরের নাম কী যেন বললে ঠিক মনে রাখতে পারছিনা। ব্রেন একদম আউলাইয়া গেছে।

ছহিলুদ্দি।

ছহিলুদ্দিসাহেব উৎফুল্ল হয়ে বলে, এই জ্যান্ডার ফিল্ডে নাজনীন ম্যাডামকে
দেখছুনা। কী তার দাপট আর পরিচিতি; বড় একখান নারী নেত্রী। কোথায় আছেলেন তিনি, হাসব্যান্ড তাকে ডিভোর্স দ্যায়, খাবার পয়সাই জুটতো না, এই তারেক ভাইতো তাকে জ্যান্ডার ওয়ার্ল্ডে সুপারষ্টার বানায়ছেন। এখনতো বিএমডব্লিউ হাকায়।

তারেক সাহেব ডিনার চেয়ার ছেড়ে উঠে একটা সিগারেট জ্বালিয়ে হোটেলের কাউন্টরের দিক চলে যান। এবার আমার ডিরেক্টর আসল কথা পাড়েন। শোন মালতী তারেক ভাইেেয়র মনে তোমাকে খুব ধরেছে। আর উনার ক্ষমতাতো তুমি জানো। কিন্তু উনার একখান গুন আছে, খুবই পরোপকারী। উনি ইচ্ছে কইরলে তোমাকে একটা এনজিও কইরা দিবার পারেন। বোঝতো উনিই আমাগো সব ফান্ড যোগাইত্যাছেন। তুমি একটা কাজ করো আগামীকাল উনার লগে কয়েকদিনের জন্য রাঙ্গামাটি ঘুইরা আও। একটা প্লিজার ট্রিপ আর কী। তুমার কপাল খুইলা যাইবো।

আমি একটু চুপ করে থাকি কিছু বলিনা। ভয় ও ঘৃণা দুটোই আমার ভিতর তখন কাজ করছিল। ছহিলুদ্দি আবার বলে, এতা ভাবনের কী, মাত্রতো কয়েকদিন। এইডাইতো হইলো গিয়া তুমার লাইফের একটা সুযুগ। সুযুগতো সগোল সময় আয়না। ভয় করলে আমি না হয় তোমার লগে যাইউম। কেউ জানবার পারবেনা। লাইফ গইড়্যা ন্যাওনের এইডাইতো পারফিক্ট টাইম।

তাদের জান্তব চেহারা বেরিয়ে এলো। আমার মনে হলো কুত্তার বাচ্চার গালে স্যান্ডেল খুলে কয়েক ঘা মারি। কিন্তু আমি তা পারিনি আমার শিকড়  দুর্বল। একেতো মেয়ে সেটাও বড় কারন ছিলনা। দারিদ্রতা আর হিন্দু পরিবার থেকে এসেছি এটাই আমাকে কাবু করার চেষ্টা রাখে। আমি বর্ষা মাথায় হোটেল থেকে বেরিয়ে ভিজে ভিজে সোজা বাসায় ফিরে আসি।

মালতী আবার ফুঁপাচ্ছে, ওর গৌর মুখমন্ডল রক্তবরন ধারণ করে। গন্ডদেশ বেয়ে জলধারা নেমে আসে। আমি আর উত্তেজনা দমন করতে পারিনা। সামনের চায়ের টেবিলে প্রচন্ড ঘুষি মেরে দাড়িয়ে উঠে বলি, সান অব আ বীচ, হালার পুতরে আমি ইট বান্ধুম, টাঙ্গাইলে আউক। আর ঐ জেন্ডাররে পাইলে সোগায় আহেলা বাঁশ ঢুকাইউম ।

বৃহস্পতিবার, ২৬ জুলাই, ২০১৮

ছহিলুদ্দি ও জেন্ডার বিশেষজ্ঞ//ছোটগল্প

শ্রাবনমাস, কয়েকদিন ধরে লাগামহীন বৃষ্টি। যমুনা, ধলেশ্বরীর চর এলাকার গ্রামগুলি সব পানির নীচে। এই দূর্যোগে আমি ভূয়াপুর গিয়েছিলাম এক ভোঁতা ইঞ্জিনিয়ারকে সামাল দিতে। সাইডে কনষ্ট্রাকশন কাজের মেজারমেন্ট। কিছু তেল মসল্লার ব্যাপার; ক্যাশ এ্যান্ড কাইন্ডস। সেলফোনটি বাজছে তো বাজছে, সামনে ট্যাপার বটতলায় চায়ের দোকানে যেয়ে দেখবো।  রিং টোন বন্ধ হয়ে গেছে, বোধ হয় ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। আবার বাজতে শুরু করে। মটর সাইকেল একটি গজারি গাছের নীচে রেখে চায়ের দোকানের সামনে চলে আসি। রেইন কোট খুলে, মোবাইল বের করে  মনিটরে দেখি অচেনা বাংলা লিংক নাম্বার। খুব গরম চায়ের অর্ডার দিলাম, তপ্ত চা খেতে খেতে অজানা নাম্বারে বাটন টিপলাম, কল হচ্ছে। ওপার থেকে ভারী মিষ্টি গলা ভেসে আসছে হ্যালো হ্যালো। আমি শিহরিত হলাম, এক অচেনা মেয়ের সুমধুর কন্ঠস্বর। রুবেল ভাইা তুমি আমাকে চিনতে পেরেছো। ভারী লজ্জায় পড়ি, আমি চুপ করে থাকি। প্রত্যুত্তোরে হ্যালো হ্যালো করছি আর কিছু বলার মতো কথা খুজে পাইনা।
আমি মালতী.....
হঠাৎ বুকের ভিতর তীব্র বিদ্যুৎ প্রবাহ ঝাকুনি দিলো; আমি ভাবতেই পারছিনা মালতীর কন্ঠস্বর শুনছি। আবেগ তাড়িত হয়ে বলিÑআ’য়্যাম ছরী, তুলাপাত্রী কিবা আছ? ভালো নেই তাই তোমাকে খুজছি। রুবেল ভাই তোমাকে দুই বার রিং করলাম তুমি ধরলানা? আ’ম সরি, আমি বৃষ্টিতে ভিজ্যা একাকার, তখন ধরতে পারিনি, এক চায়ের দোকানে ঢুইক্যাই তোমাকে ফুন দিছি। তুমি কুনহানে? আমি টাঙ্গাইলে নিরালার মোড়ে তোমার দোকানে। হোয়াট্স হ্যাপেন্ড মালতী? তুমি ভাল নেই কইতাছো; আমি কিছুই বুঝবার পারতাছিনা। আমি খুব প্রবলেমে আছি। তাই তোমাকেই বলতে ঢাকা থেকে সোজা টাঙ্গাইল চলে এসেছি। তুমি এই বর্ষায় কোথায়? আমি ভূয়াপুর রোডে ট্যাপার বটতলার মোড়ে, আধাঘন্টার মধ্যে আইয়া পড়–ম, তুমি আমার দোকানে বসো প্লিজ। রুবেল ভাই বর্ষা থামলে এসো, বৃষ্টিতে ভিজোনা। তুমি আমার সেল্সম্যানকে মোবাইলটা দ্যাও, আমি ওরে কইত্যাছি। ওকে কিছু বলার দরকার নেই, তুমি রেইনকোট নিয়েছো? হ্যা রেইনকোট আছে। দেখা হবে বাই রাখি। ফোন ছেড়ে দিলো, দীর্ঘদিন দেখা নেই, মোবাইল অফ করলো।

মালতী তুলাপাত্রকে আমি ঠাট্টা করে তুলাপাত্রী বলতাম। প্রায় তিন বছর ওর সাথে দেখা নেই। আমিও এখন নাটকপাড়া প্রায় ছেড়েই পেটের ধান্ধায় উল্টোপথে হাটছি কন্ট্রাক্টারিতে। পারিবারিক সূত্রে।  মালতী কী একটা এনজিওতে চাকরি নিয়ে চলে যায়। মোবাইলটা হারিয়ে গেলে ওর নাম্বারও হারিয়ে যায়।  তার সাথে প্রথম পরিচয় পর্বটা মনে পড়ছে, তখন আমি সদ্য ঢাকার বিবিএর পাঠ চুকিয়ে টাঙ্গাইলে নাটক পাড়ায়। একদিন বিকেলে শহীদ মিনারের বেদীত বসে আড্ডা মারছি। সাথে ছিল সম্ভবতঃ মন্ডল, সালমা আর জর্জ। সূর্য পশ্চিমে বাড়িঘর গাছপালার আড়ালে ঝাপ দিয়েছে। একটু শীতার্ত আবহাওয়া হেমন্তকাল, হাফ সোয়েটার পরেছি। হঠাৎ আলোকজ্জ্বল দ্যূতি ছড়িয়ে, লং ষ্ট্রেইট চুল ঝাকিয়ে সুবাসিত করে ও এলো। জর্জ পরিচয় করিয়ে দিল, মালতি তুলাপাত্র, সেকেন্ড ইয়ার কলা বিভাগ, কুমুদিনী গার্লস কলেজ। আমাদের গ্রুপে নাটক করতে চায়। ও সেদিন পরেছিলো থ্রি কোয়ার্টার হাতার মেরুণ রংয়ের কামিজ, সাদা চুড়িদার সেমিজ ও সাদা ওড়না। এসেই ও আমার পাশে বসে পড়ে, কেননা আমি সারির শেষে বসেছিলাম। ও কথার ফুলঝুরি ফুটাতে থাকে, চেহারা চোখে মুখে এক উজ্জ্বল দীপ্তলাবণ্য, কোন আড়ষ্টতা নেই । তখন জানলাম ওর অনেক গুন আবৃত্তি করে, নাচ জানে, কবিতাও লেখে।

মটরসাইকেল চালিয়ে নিরালার মোড়ে এসে দোকানের সামনে রাখি। হেলমেট ও রেইনকোট খুলে দোকানে ঢুকি। এই বৃষ্টি বাদলে রড-সিমেন্ট কিনবো ক্যাডা, দোকান খুইল্যা হুধাই বইয়া থাকুইন, আইজ কী ব্যাচা বিক্রি হইছে? না ভাইজান; এই বাদলে কুনু খইদ্দারপাতি আয় নাই। আপনারে এক আপায় খুইজত্যা আইছিলো। হঅ-- আমার সাথে কথা হইছে; এখন দোকানের সার্টার বন্ধ করো। বইয়া বইয়া ঝিমাইলে লাভ নাই। কাল দোকান খোলনের কাম নাই। ভূঁয়াপুর সাইডে যাউন লাগবো, একদম বিয়াইনে ষ্টার ওয়েল্ডিং থিকা পিকআপে কইরা গ্রিলগুলি নিতে হইবো। মোবাইলের রিং টোন বেজে ওঠে। প্যান্টের পকেট থেকে মোবাইল দ্রুত বের করে মনিটরের স্ক্রিনে তাকালাম; মালতির নাম ভেসে এলো। হ্যালো আমি মালতী। তুমি এখন কোথায়? নিরালার মোড়ে। তোমার সাথে আমার দেখা করা জরুরী। তুমি তো আর একটু বইলেই আমার সাথে দেখা হইতো। তোমার দোকানে দীর্ঘক্ষন কী করে বসে থাকি? একট ুদেরি করলে দেখা হতো। তুমি কী তোমার জ্যাঠার বাসায় আছো। হ্যাঁ ওটাই তো এখানে আমার ঠাই। আমি ওখানে আসতাছি সন্ধা ৭ টায়; পুরাতন আদালত পাড়ার সেই আগের বাড়ি। হ্যা মান্নান পালোয়ানের পাশের একতলা বাড়ি।

এখন বৃষ্টি নেই, সারা আকাশ মেঘাচ্ছন্ন, গুমোট। রিক্সা নিয়ে পুরাতন বাসষ্টান্ড ছাড়িয়ে  আদালত পাড়ায় চলছি। রাস্তাঘাটে কয়েক জায়গায় পানি জমে আছে। বন্যার পানি শহরেও ঢুকেছে মান্নান পালোয়ানের বাড়ির সামনে রিক্সা থেকে নামি। একতলা বাড়ির সামনে বড় শিউলি গাছ। পুরাতন বাড়ি একটু জীর্ণ; বাড়ির সামনে একটি সেলুন ও মুদিখানা। কাঠের গেট খুলে চওড়া বারান্দায় ইতস্ততঃ করছি। কলিং বেল টিপি কেউ দরজা খুলছে না, বোধ হয় কলিং বেলটাই ঠেসে গেছে। লাইটপোষ্টের আলো এসে বারান্দায় পড়েছে। ঝরেপড়া শিউলির ঘ্রাণ বাতাসে ভাসছে। দুই পাল্লার কাঠের দরজা, বড় বড় কড়া লাগানো। বার দুই কড়া ধরে নাড়লাম। ভিতর থেকে ছিটকেনি খোলার আওয়াজ হলো। নাদুষ নুদুষ কিশোর একটি ছেলে থ্রি কোয়ার্টার প্যান্ট পরে আদুল গায়ে দরজা খুলে দিলো। ভিতরের টিউব লাইটের আলো এসে চোখে পড়ে।
আদাব্ কাকে চান? মালতি তূলাপাত্র। ডেকে দিচ্ছি, আপনি বসেন। কিশোর ছেলেটি হেলেদুলে ভিতরের পর্দা উচিয়ে চলে গেলো। আমি উৎকন্ঠা নিয়ে  দাড়িয়ে আছি।
আরে রুবেল ভাই তুমি দাড়িয়ে রয়েছো তোমাকে মন্টা বসতে বলেনি। কইছে আমি নিজেই খাড়াইয়া আছি, তুমি আইয়া কইলেই বমু তাই। আমি বসবো কী মালতীকেই দেখছি হালকা মেরুনের সিল্কের উপর রূপালী প্রিন্টের শাড়ি, কপালে বড় টিপ, রুজ লিপিস্টিক মেখেছে তাতে তার ন্যাচারাল লুক কিছুটা মার খেয়েছে। এত প্রসাধনি করেও তার চোখ মুখের বেদনা ও বিষহ্নতার ছাপ লুকোতে পারেনি। তার সেই চির পরিচিত হৃদয় উপড়ানো বড় বড় টলটলে চোখে আমার দিকে তাকিয়ে বলে, কী ব্যাপার এখনো বসছোনা কেন রুবেল ভাই; তুমিতো বেশ শুখিয়ে গেছো। আমি একটু হেসে বলি, টাকা রোজগারের বিশ্রি কিম্পিটিশনে দৌড়াইয়া কাহিল। কতকাল পরে তোমার সাথে দ্যাখা সত্যিই ভাবতেই পারতাছিনা। রুবেল ভাই বসো, আমি একটু ভিতর থেকে আসছি। আমি বসবো কী ওকেই দেখছি, আমার চোখ আটকে আছে ওর দিকে। পর্দা সরিয়ে সে ভিতরে চলে গেলো। আমি বসে পড়ি, পুরানো মোটা বেতের সোফা, নীল কভারের গদি, একটি কাঁচের শোকেচ ভর্তি বই, অনেকগুলি ক্রেষ্ট ও মেডেল। মালতী ঘরে এসে সোফায় আমার পাশে বসে। বাতাসে তার শরীরের সুবাশিত ঘ্রাণ নাকে লাগছে, ও নিশ্চুপ হয়ে বসে হাতের মসৃন পেলব আঙ্গুলগুলি খুটছে। নখ গুলিতে টিয়া রংয়ের পালিশ, ফর্সা ভরাট হাতের দুপাশেই মেহেদীর চমকপ্রদ কারূকার্য। দুহাতে মেরুণ রংয়ের কাঁচের চুড়ির বিস্তরণ, তার দুপাশে রূপালি চুড়ির শৈল্পিক সীমানা। মৃদু হস্ত সঞ্চালণায় কাঁচের চুড়ির শব্দতরঙ্গ ।
তুমি আমারে তলব করলা, তাই তোমার কাছে চইল্যা আইলাম, এবার কও কী হয়েছে। কী করে বলি তোমাকে। দু’রাত নির্ঘুম কাটিয়েছি তারপর টাঙ্গাইলে চলে এসেছি। আমাকে কইতে পারবানা ক্যান? রুবেল ভাই চমচম খাও, তুমিতো আবার চমচম খুব পছন্দ করো।
তোমার তা মনে আছে? মনে থাকবে না কেন? এসব কী ভোলা যায়। ঠিক আছে চা খাইতে খাইতে তোমার কথা শুনি।  বিষয়টা গোপন রেখো, বোঝতো এমনিতে মেয়ে তারপর আমাদের নানান প্রবলেম। ঠিক আছে গোপন রাখুম। আমি তো প্রথম উন্নয়ন ধারা’তে চাকরি নিয়ে ময়মনসিং চলে যাই। রিমোট গ্রামে থাকতে হতো, নান্দাইলের বিভিন্ন গ্রামে যেতে হতো। তারপর সে চাকরি ছেড়ে দিয়ে চলে আসি ঢাকায়। ক্যান ছাইড়্যা দিলা, তোমাগো গ্রামতো ময়মনসিংয়ের নান্দাইলে? বাবা ভাইরাতো ময়মনসিংহ শহরে থাকে, পাটগুদামের কাছে বাসা, গ্রামে আমাদের কিছুই নেই সে আর এক ইতিহাস। তারপর ঢাকায় এসে যোগ দিলাম আর একটা এনজিওতে ইউডিসি। বস্তিতে কাজ ভাষানটেক, যাত্রাবাড়ী বস্তিতে গণশিক্ষা কার্যক্রম। এই চাকরি করে বেইলি রোডের নাটক পাড়ায় ঘোরাফেরা করতে থাকি। ঢাকার কালচারাল মহাসমুদ্রে ঠাই পায়া ছিল আমার জন্য খুবি কঠিন। ইউডিসি’র পরিচালক নাজনীন আপা খুব ভাল ছিলেন। বেতন ছিল খুবি কম, ফান্ড থাকতে হবে না?

আরন্যক নাট্যগোষ্ঠীর নাজমুল ভাই আমাকে একটি নুতন চাকরির ইনফরমেশন দিলেন। সংস্থার নাম পিপলস থিয়েটার এন্ড এডুকেশন; সংক্ষেপে পিটিই। এদের প্রধান কার্যক্রম হচ্ছে গণনাটকের মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে সচেতন ও শিক্ষিত করা। নাজমুল ভাই আমাকে প্রথম আলোর বিজ্ঞাপণের কপি দিলেন। আমি বললাম শুধু ইন্টারভিউতে কী চাকরি হবে। নাজমুল ভাই বললেন, পরিচালককে আমি ভাল চিনি, টাঙ্গাইলের লোক, নাম ইমরোজ হাসান আমি তাকে বলে দিবো। আমি ইন্টারভিউ দিলাম, আমাকে সিলেক্ট করা হল। চাকরিতে যোগ দিয়ে খুব উৎসাহিত হলাম। আগের চাকরি আমার কাছে বোরিং ছিলো, বেতনও ছিল খুবি কম। এই চাকরিতে এসে প্রাণ ফিরে পেলাম, কেননা আমি তো নাটক পাগল। কিছুদিনের মধ্যে অনেকের প্রসংশা কুড়োলাম।

আমার চোখে তার এই দুঃখের দিনে সাজগোজ দেখে খটকা লাগে। তাই ওকে জিজ্ঞাসা করি, আজকে অনেক সাজগোজ করেছো, ব্যাপার কী? আমি আর বৌদি যাবো কাগমারি, বিয়ের একটা ইনভাইট আছে সেই জন্য একটু। তাইলেতো তোমার হাতে সময় কম। সময় আছে। আমাদের প্রথমে কাজ ছিল ঢাকার গার্মেন্টস শ্রমিকদের ভিতর। গণনাটকের মাধ্যমে তাদেরকে এ্যাওয়ার করা। বিজিএমই সরকারকে প্রভাবিত করে আমাদের উপর চাপ সৃষ্টি করে। ডোনাররাও ফান্ড বন্দ করে। গার্মেন্টস সেক্টরে গণনাটক বন্দ হয়ে যায়। তাইলেতো তোমাগো প্রজেক্ট বন্দ। না ফান্ড সংকট কাটিয়ে ওঠে, নুতন করে বড় বড় ফান্ড বাগায়। ইউএসএইডের ফান্ড ও অন্যান্য ডোনারদের।  কিছু লোকাল এনজিওদের সাথে কালচারাল জয়েন্ট প্রোগ্রাম। তাইলেতো ভালোই। ইমরোজ ভাইয়ের এক পেয়ারের লোক তারেক হাসান গ্যাড বিশেষজ্ঞ তিনি আবার ঢাকার সিভিল সোসাটির বড়নেতা । সেই তাকে বড় বড় ফান্ড যোগাড় করে দেয়।
(চলবে)

বৃহস্পতিবার, ১৪ জুন, ২০১৮

ব্যাথাভরা ঈদ

প্রতিদিন শিপইয়ার্ডের সাইরেন শুনে আম্মা ও দাদীমা ইফতারি করতেন সাথে আমরা চার ভাইবোন। তখন ইফতার কালে গ্রামে সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসতো। সাইরেনের বেশ পরে আযান শুনতে পেতাম।  কান্দরের ওপার থেকে, গ্রামের একমাত্র জুম্মাঘর থেকে আযান ক্ষিণস্বরে ভেসে আসতো।  তখন মাইক ছিলনা। খালি গলার আযান বাতাসের গতিপ্রবাহে উঠানামা করতো। আবার অনেকসময়  ভর সন্ধ্যায় শিয়ালের ডাকে আর  আযান কর্ণগোচর হতোনা। তবে শিপইয়ারর্ডের সাইরেন সবকিছু ছাপিয়ে আমাদের গ্রামে এসে পৌছাতো। কয়েকদিন আগে আব্বার একটা পোস্টকার্ডের চিঠি  মাবুদ কাকা হাট ফিরতি পথে আমাদের বাড়িতে দিয়ে যান। পোস্টকার্ডটি তিনি গদ্দাসকাঠি পোস্ট অফিসের পিওনের কাছ থেকে নিয়ে এসেছিলেন। প্রতি বুধবার হাটবারে পিওন হাটে একটা শিরিষগাছের নীচে বসে বিভিন্ন গ্রামের লোকদের ডেকে ডেকে চিঠি বিলি করতেন। আব্বার পোস্টকার্ড প্রতি হাটবারেই আমাদের বাড়িতে এসে পৌছাতো। এটা একটা নিয়ম হয়ে দাড়িয়েছিলো।

রোজার প্রায় শেষদিকে আব্বার চিঠিটা ইফতারির পরে আমি খাটের উপর হারিকেনের আলোয় খুব জোরে জোরে পড়েছিলাম। আম্মা আমাকে জড়িয়ে ধরে বসে ছিলেন।  সামনে দাদিমা ও আমার ছোট দুই ভাই। সব চেয়ে ছোট বোনটি বছর দুই বয়স, সে ঘুমিয়ে ছিলো।
আব্বা ঈদের দুইদিন আগে দিনাজপুর থেকে বাড়ি এসে পৌছাবেন। ম্যালেরিয়া হয়ে আব্বার শরীর দুর্বল হয়ে পড়েছে। আমি  ম্যালেরিয়ার অংশটুকু পড়লামনা। কারন তাতে আমার দাদীমা তার ছেলের জন্য কান্না জুড়ে দিবে। আর মায়ের মনের কথা ভাবছিলাম। পরে হয়তো আম্মা পোস্টকার্ড পড়ে জানতে পারবেন। আব্বা  বাড়ি এসেই সবার শাড়ী, কাপড়জামা কিনবেন।

আব্বা খুব সকালে এসে বাড়ি পৌছালেন। আমরা দৌড়ে তার কাছে চলে এলাম। কেউ কোলে কেউ তার কাঁধে। কিন্তু আব্বা তার একমাত্র কন্যা বেবিকে কোলে নিয়ে মায়ের সাথে পূকুরঘাটে চলে গেলেন। গোসল করে ফিরে আব্বা প্যান্টজামা পরে ফিতে দিয়ে আমাদের মাপ নিলেন। ঝাঁটার কাঠি দিয়ে আমাদের পায়ের মাপ নিলেন। তারপর মা ও দাদীমার সাথে কথা বলে একটা ফর্দ তৈরি করলেন। তারপর আমাদের জ্ঞাতি চাচা সামায়ুনকে নিয়ে খুলনা সাহেবের হাটে রওয়ানা দিলেন। তখন আমি ক্লাস ফোরে পড়ি। ইশকুল একমাস দশদিন বন্ধ। ভাদ্রমাস পথঘাট কর্দমাক্ত কিন্তু বৃষ্টি নেই।  আমি আর আমার পরের ভাই জামাল দুপুর থেকে বিকেল পর্যন্ত নতুন জামা কাপড়ের স্বপ্নে পুলকিত মনে ইশকুল মাঠে ফুটবল খেলে সরকারি পুকুরে ঘন্টাখানেক ডুবসাঁতার দিয়ে প্যান্ট গেঞ্জি নিংড়ে উদোম হয়ে দৌড়ে বাড়ি চলে আসি। নাংলার বিল পাড়ি দিয়ে ম্যাদামারা সুর্য তখন বড় গাঙএ ঝাঁপ দিতে উদ্যত।

বাড়ি এসে দেখি উঠানে আমার জ্ঞাতি চাচা, চাচী, ভাইবোনেরা ঝাঁকবেধে আছে। আমার দাদীমা ঢেকিঘরের সামনে একটা জলচৌকিতে বসে কাঁদছেন আর আমার ছোট কাকীমা  তাকে পাখার বাতাস করছেন। আব্বা বড় ঘরের বারান্দায় একটা হাতাওয়ালা চেয়ারে লুঙ্গি পরে উদোম গায় বসে আছেন। আমার ছোটকাকা ও আরো কয়েকজন আব্বাকে প্রস্ন করে কিসব জানতে চাচ্ছে। মনে হচ্ছে আব্বা খুবি বিরক্ত। পাশের বাড়ির রাংগা দাদী চিৎকার করে গালিগালাজ শুরু করেন।
হারামজাদা চোরভাতারী তোগে বংশ নিব্বংশ হবে। রোযা রমজানের দিন চুরি এরিছিস তোগে মাথায় টাডা পড়বে। কত দুরিরতে ছুয়ালডা রেলের গাড়ি ঠেঙায়ে বাড়ি আইছে।
আব্বা এবার চেঁচিয়ে বলেন, যা হওয়ার তা হইছে আল্লার মাল আল্লাহ নিছে। তোমরা সব যার যার বাড়ি যাও। ইফতারির সময় হচ্ছে।
এতক্ষণ আমরা ল্যাংটা হয়ে নির্বাকভাবে উঠানের মধ্যিখানে দাঁড়িয়ে ছিলাম। সে দিকে আমার খেয়াল ছিলনা। আব্বা আমাদের ল্যাংটা থাকা একদম পছন্দ করেননা। কিন্তু আমরা এই পরিবেশে হতবাক ও ভয়ে দিকবিদিক হয়ে পড়েছি।
মায়ের ডাকে সম্বিত ফিরে আমরা ঘরে যেয়ে হাফপ্যান্ট পরে ফেলি। এখনো কোন ঘটনা আমি বুঝতে পারিনি।  মায়ের ব্যাথামাখা  মুখ দেখে আমি কিছু জিজ্ঞেস করার উৎসাহ পাইনি। ইফতারির জন্য আমরা সবাই মাদুর পেতে বসেছি। প্রতিদিন আমরা ইফতারি করি ছোলামুড়ি, চালমাখা বা চিড়ে মাখা,  গাছের আমড়া কুচি, আখের গুড়ের সরবত। আজ তার ব্যতিক্রম। আব্বা আসলে প্রতিবার এরকম হয়। আজ ইফতারিতে রয়েছে জিলিপি, পিয়াজু,  বেগুনি, সিক কাবাব। আব্বা প্রতিবার বাড়ি  আসলে খুলনা থেকে আশিআনা হোটেলের শিককাবাব আনেন।
এখন ইফতারিতে দাদীমাকে দেখছিনা। সে তার ঘরে শুয়ে আছে।  আব্বা ডাকতে গেলেও তিনি আসেননি। কয়েকবছর থেকে দাদীমা রোজা রাখতে পারেননা। আম্মা একটা হেরিকেন ও ইফতার দাদীমার ঘরে দিয়ে আসলেন।
আমি সরবত খেয়ে সবকিছু বাদ দিয়ে কাবাব খেতে শুরু করেছি। তখন আব্বা আসল কথাটি পাড়লেন। বাজারে শাড়ি, আমাদের প্যান্ট জামা কিনে সামায়ুন কাকার কাছে একটা নতুনচটের ব্যাগে ভরে তাকে আব্বার এক পরিচিত দোকানে বসিয়ে রেখে,  তিনি আমাদের জুতা স্যান্ডেল কিনতে যান। তিনি জুতা স্যান্ডেল কিনে ফিরে এসে দেখেন, সামায়ুন কাকার পায়ের কাছ থেকে কাপড়ের ব্যাগ গায়েব। অনেক খোঁজাখুঁজি করে কোনো হদীস করতে পারেননি। তাই এবার আমাদের পুরানো প্যান্ট পাঞ্জাবী দিয়ে ঈদ করতে হবে। তবে আমাদের নুতন জুতা কিনেছেন। আম্মা আমাদের শান্তনা দিয়ে বললেলন তোমাদের আব্বা যে জান নিয়ে ফিরে আসতি পারিছে, সেইডাই আল্লার কাছে শোকর। ইতোমধ্যে খবর রটে গেলো রেডিওতে বলেছে চট্টগ্রামের হাটহাজারীতে চাঁদ দেখা গিয়েছে। তাই আগামীকাল ঈদ।
আমাদের তিন ভাইয়ের পাঞ্জাবী আম্মা কেঁচে ভাতের ফ্যানের মাড় ও নীল দিয়ে রেখেছিলেন। আমরা নতুন  জুতা পায়ে গলিয়ে দাদীর ঘরে তার বিশাল আসমানতাঁরা খাটে উঠে পাঞ্জাবী ভাজকরে হাত দিয়ে মেজে সমান করে বালিশের নীচে রেখে দাদিমাকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে পড়ি। দাদীমা তার বিয়ের পরে দাদার সাথে প্রথম ঈদের গল্প শুরু করেন। তখন নাকি ঈদের নামাজ পড়ার ঈমাম কুমিল্লা থেকে আনতে হয়েছিলো। তখন এতল্লাটে ঈদের নামাজ জানা কোন মৌলভী ছিলনা। দূর থেকে বনবিড়াল ডাকতে থাকে, আমরা দাদীজানকে জোরে আঁকড়ে ধরি। নতুন জুতার গন্ধে চাঁদ রাতে আমরা ঘুমিয়ে পড়ি।