সোমবার, ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৮

গার্মেন্টস শ্রমিকদের মজুরি

গার্মেন্টস শ্রমিকদের মজুরি ৮০০০ টাকা নির্ধারণ , একি উপহাস না অপমান ?
একি মজুরি বৃদ্ধির নামে প্রতারণা ও  প্রকৃত মজুরি থেকে বঞ্চিত করা নয় ?

মালিকরা দিতে রাজী নন, প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে নাকি শেষ পর্যন্ত গার্মেন্টস শ্রমিকদের মজুরি ৮০০০ টাকা নির্ধারণ করা হলো । বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান খাত গার্মেন্টস । গত বছর প্রায় ৩০ বিলিয়ন ডলার বা ২ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকার গার্মেন্টস পণ্য রপ্তানি হয়েছে । যা আমাদের মোট রপ্তানির ৮২ শতাংশেরও বেশি। গার্মেন্টসের মেশিন আমদানি করা হয় বিদেশ থেকে, কাপড়, সুতা আনা হয় বিদেশ থেকে। ডিজাইন অনুযায়ী কাটে, সেলাই করে পোশাক বানিয়ে প্যাকেট করে বিদেশে পাঠায় বাংলাদেশের শ্রমিক । ইউরোপ, আমেরিকা, কানাডা সহ বিভিন্ন দেশে এই পোশাক পরে সেদেশের মানুষেরা । গার্মেন্টস মালিক গুনে মুনাফা, বিদেশী বায়ার গুনে প্রফিট মার্জিন। গুনে আর গুনে , গুনতেই থাকে , শেষ হয় না। তাদের ব্যবসা বাড়ে, কারখানা এক থেকে বহু হয় , তারা হয়ে উঠেন বিজনেস ম্যাগনেট । বিদেশের ক্রেতারা কেনে আর বলে, ওয়াও ! বাংলাদেশী গুডস, ভেরি বিউটিফুল, ভেরি চিপ ।
আর বাংলাদেশের শ্রমিক ! ক্লান্ত বিষন্ন শ্রমিক । তারা গুনে মজুরি । বাসা ভাড়া, খাওয়ার খরচ, চিকিৎসা , হাত খরচ , দোকানের বাকি, কত খরচ? মজুরি তো নির্ধারণ করা হলো ৮০০০ টাকা । কিভাবে মিটবে এসব খরচ ? গ্রামের বাবা মা’র জন্য কি কিছু করতে পারবে এ টাকায় ? এই হিসাব কি কেউ মিলিয়ে দিতে পারবে ?
শ্রমিক বিক্রি করে শ্রমশক্তি । এর জন্য দরকার পুষ্টিকর খাবার, বিশ্রাম, সুস্থ্য জীবন । ভবিষ্যতের শ্রমশক্তি হিসেবে তার সন্তানের দরকার শিক্ষা, খাদ্য পুষ্টি, চিকিৎসা । বাসা ভাড়া, জিনিসপত্রের দাম যে ভাবে বাড়ছে তাতে কিভাবে জোগাড় হবে এসব ?
মালিকের লাভ হয় না তবে ব্যবসা বাড়ে ।
শ্রমিকের মজুরি বাড়েনা তবে খরচ বাড়ে ।
দুর্বল শ্রমিক উৎপাদন বাড়াবে কিভাবে ?
একটা বিষয় কিছুতেই মাথায় আসেনা । কম্বোডিয়ার মাথাপিছু আয় বাংলাদেশের চাইতে অনেক কম তাহলে তারা গার্মেন্টস শ্রমিকদের মজুরি কিভাবে ১৮৭ ডলার দেয় । এত উন্নয়নের পরও বাংলাদেশের শ্রমিকদের মজুরি ১০০ ডলার করা যাচ্ছে না । রাষ্ট্রায়াত্ব শিল্পের শ্রমিক এবং সরকারী অফিসের পিওনের বেতনের অর্ধেক কেন গার্মেন্টস শ্রমিকের মজুরি হবে ? এরা না দেশের প্রধান রপ্তানি আয়ের প্রধান কারিগর ! ২০১৩ সালে ৫৩০০ টাকা যখন মজুরি নির্ধারণ করা হয় তখন মুল মজুরি ছিল ৩০০০ টাকা। বার্ষিক ন্যুনতম ৫ শতাংশ হারে বেতন বৃদ্ধি হলে ৫ বছরে সে মজুরি এখন দাড়িয়েছে ৩৮২৮ টাকা । সরকার এবার মুল মজুরি নির্ধারণ করেছে ৪১০০ টাকা । তাহলে মজুরি বাড়লো মাত্র ২৭২ টাকা । দ্রব্যমুল্য বৃদ্ধির সাথে তুলনা করলে এই বৃদ্ধি কত হাস্যকর ।
গার্মেন্টস পণ্যে শ্রমিকের মুল্য সংযোজন কত ? মালিকদের মুনাফার হার কত ? মালিকরা রাষ্ট্রের কাছে কি কি সুবিধা এবং সহায়তা পায় ? খাদ্য পুষ্টি বিবেচনা করে বাজার দর অনুযায়ী জীবন নির্বাহ করতে একটি পরিবারে ন্যুনতম কত টাকা প্রয়োজন ? শুধু খাওয়া আর ঘুমানো কি মানুষের প্রয়োজন , তাহলে কি পশুজীবনের সাথে মানুষের জীবনের পার্থক্য থাকবে না ? দেশের অর্থনীতিতে শ্রমিকের অবদান এবং ভুমিকা কি ? এসব কি মজুরি নির্ধারণের আলোচনায় আসবে না ?
রাষ্ট্রায়াত্ব শিল্পের শ্রমিকদের মজুরির সাথে তুলনা করলেও তো গার্মেন্টস শ্রমিকদের মজুরি ১৮ হাজার টাকা হওয়া উচিত ।
এই লেখা পড়ে অনেকে ক্ষেপে যাবেন, গালি দিয়ে বলবেন,” নিজে কারখানা করে তারপর শ্রমিকদের মজুরি দিয়েন “। মালিকরা কাজ না দিলে গার্মেন্টস শ্রমিকরা কি করতো ? মজুরি বাড়ালে গার্মেন্টস অন্যদেশের চলে যাবে । অবাস্তব কথা বলা আপনাদের অভ্যাস ইত্যাদি ইত্যাদি । কেউ হয়তো আমাদের যোগ্যতা নিয়ে কটাক্ষ করবেন , সামর্থ্য নিয়ে ব্যঙ্গ বিদ্রুপ করবেন ।
তা করুন । কিন্তু গার্মেন্টস শ্রমিকরা কাজ করে বলেই তো মালিকদের এত সমৃদ্ধি , এত রপ্তানি আয় । সেই শ্রমিকরা ন্যায্য মজুরি চাইলে ক্ষেপে উঠেন কেন ভাই ?
ভারতে সমস্ত শ্রমিক সংগঠন মিলে ১৮ হাজার রুপি মজুরির দাবিতে আন্দোলন করছে, গার্মেন্টসের রপ্তানিতে বিশ্বের সর্ব বৃহৎ দেশ চীনের শ্রমিকদের মজুরি ও অন্যান্য সুবিধা বাংলাদেশের শ্রমিকদের চাইতে ৪ গুন বেশি। কিন্তু গার্মেন্টস পণ্য রপ্তানি করে বাংলাদেশের চাইতে ৬ গুন বেশি । তুরস্কের মজুরি বাংলাদেশের ৪ গুনের মত । কম্বোডিয়া ভিয়েতনামে আমাদের দ্বিগুনেরও বেশি। গার্মেন্টস নিয়ে এদের দেশে যাবে বাংলাদেশের মালিকরা ? মরিশাস, জর্ডানে মজুরি বেশি বলে বাংলাদেশ থেকে শ্রমিক সেখানে যাচ্ছে । আর আফ্রিকা , সেখানে দক্ষ শ্রমিক কোথায় ? ফলে গার্মেন্টস যাবে না, কম মজুরি দিয়ে বাংলাদেশেই থাকবে । মালিক এবং সরকারের প্রিয় দেশ আমেরিকাতে শ্রমিকরা লড়ছে প্রতি ঘন্টায় ১৫ ডলার মজুরির জন্য আর বাংলাদেশে প্রতিদিনের মজুরি নির্ধারণ  করা হলো ৩ ডলার !
আমরা চাই , বাংলাদেশের শ্রমিকরা গার্মেন্টসে যে দক্ষতা অর্জন করেছে তার স্বীকৃতি শুধু রপ্তানি বৃদ্ধিতে নয়, বাঁচার মত মজুরি ১৮ হাজার টাকা নির্ধারনেও তার স্বীকৃতি দেয়া উচিত ।


EmoticonEmoticon