সৈয়দ হক এমন এক সম্মোহনী যাদুকর যিনি মৃত্যু পরোয়ানার মুখে দাঁড়িয়ে যমকে মৃদু-অম্ল হাসিতে চোখ টিপে বলছেন, 'এত তাড়াহুড়া কেন বাপু, আমি না হয় আর কিছুদিন লিখি, তোমার পাকা ধানক্ষেতে আমি তো মই দিই নি কোনো !'
যে হাতে হয়, সে হাতেই লয় – একদা অস্থির প্রেমিক-পতির রূপান্তরিত সংহারী-ধর্ষক মুখাবয়বের দিকে তাকিয়ে আয়নাবিবির দীর্ঘশ্বাস, অস্ফুট উচ্চারণ এবং কে না জানে, এ শুধু নিরীক্ষা নয় পালাগান ভেঙে তাকে গদ্যের সুষমায় নিয়ে আসা সৈয়দ হকের – এই যেন জীবন সমগ্র বাংলাদেশের, প্রেম ও প্রতিজ্ঞার জল কতবার পচে গিয়ে পতিত হ’ল রুদ্ধ ডোবার স্রোতে। তাই তো “মানুষের চোখ, সে শুধু দেখে না, কাঁদে” –
আমাদের ভঙ্গি থাকবে , চাল থাকবে , মুখোশ থাকবে কিন্তু হাত থাকবে না স্রষ্টার সেই হাত -সেই কবে আমাদের নষ্ট সময়কে দেখে ফেলেছিলেন , তিনি সৈয়দ শামসুলহক।
'এ বড় দারুণ বাজি, তারে কই বড় বাজিকর
যে তার রুমাল নাড়ে পরানের গহীন ভিতর।।'
যে তার রুমাল নাড়ে পরানের গহীন ভিতর।।'
মুখোশে ঘেরা মানুষরা রুপকথার ছলে কিভাবে কেড়ে নেয় স্বপ্ন বুঝিয়েছিলেন আমাদের সৈয়দ হক।
'আবার নূরলদীন একদিন কাল পূর্ণিমায়
দিবে ডাক, “জাগো, বাহে, কোনঠে সবায়?'
দিবে ডাক, “জাগো, বাহে, কোনঠে সবায়?'
তিনি আমাদের মাটির ওয়ারিশদের জেগে উঠার ডাক দিয়েছিলেন , তিনি সেই বাশিওয়ালা আমাদের সৈয়দ হক।
বাংলা শব্দ দিয়ে বোনা আশি বছরের দীর্ঘ জামা গায়ে দিয়ে অতঃপর সৈয়দ শামসুল হক নিদ্রা গেলেন।আমাদের একজন সৈয়দ হক আছেন , যিনি তার লেখায় দেশের কথা বলেন ,মানুষের কথা বলেন ,ভাষার কথা , ইতিহাসের কথা বলেন , অনিন্দ্য প্রেমের কথা বলেন । আর বুঝিয়ে দেন আমাদের এইসব কিছুই একান্তই তোমার , তোমরা নিঃস্ব নও ।
শব্দ নিয়ে যে ইচ্ছেমত সবপ্ন গড়েন , আমাদের সমৃদ্ধ করে গেছেন নিয়ত তিনি আমাদের সৈয়দ হক । সৈয়দ শামসুল হক সেই সংশপ্তক লেখকদের মধ্যে অগ্রগণ্য ও বহুপ্রজ সত্তা, তাঁর মৃত্যু নাই। আগামী দিনের বাংলাদেশ নির্মাণে তিনি আমাদের অবিনশ্বর প্রেরণা উৎস হয়ে থাকবেন।
সৈয়দ শামসুল হক, চলে যাওয়ার এক বছর, কিন্তু আপনি আছেন আমাদেরই হয়ে!

EmoticonEmoticon