লতিফুল কবির রনি লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
লতিফুল কবির রনি লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

বৃহস্পতিবার, ২১ মার্চ, ২০১৯

মুক্তিবেটি

‘বিশ্বে যা কিছু মহান সৃষ্টি চির কল্যাণকর,
অর্ধেক তার গড়িয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।’
বিশ্বের সব মহৎ সৃষ্টি বা অর্জনের পেছনে নারীর প্রত্যক্ষ অবদান রয়েছে। আমাদের জাতিসত্তার শৌর্যবীর্য ও বীরত্বের প্রতীক মহান স্বাধীনতা সংগ্রামও এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম নয়।  বৃটিশ বিরোধী আন্দোলন থেকে মহান স্বাধীনতা আন্দোলন পর্যন্ত প্রতিটি আন্দোলন-সংগ্রামে নারী সমাজের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত সাহসী ও তাৎপর্যপূর্ণ। এরই ধারাবাহিকতায় মহান মুক্তিযুদ্ধে নারীর অংশগ্রহণ এবং ভূমিকা ছিল বহুমুখী ও বীরত্বপূর্ণ।
মহান মুক্তিযুদ্ধে নারীর অবদান কেবল সম্ভ্রম হারানো, নির্যাতিত ও শরণার্থী নারীর অবর্ণনীয় লাঞ্ছনা-বঞ্চনার গল্পে শেষ নয়। মুক্তিযোদ্ধাদের অনুপ্রেরণাদান, মুক্তিক্যাম্পে খাবার তৈরি ও সরবরাহ, পোশাক সংগ্রহ ও সরবরাহ, মুক্তিবাহিনীর গুপ্তচরবৃত্তি ও যুদ্ধাহতদের পরম মমতায় সেবা-শুশ্রূষার পাশাপাশি সম্মুখ ও গেরিলা যুদ্ধে নারীর অংশগ্রহণ মহান মুক্তিযুদ্ধে ইতিহাসকে সমৃদ্ধ ও গৌরবান্বিত করেছে। কাঁকন বিবি, তারামন বিবি, সিতারা বেগম, শিরিন বানু মিতিল, আশালতা, নাজমা বেগম (কানন বণিক), হালিমা পারভীন, ফাতেমা খাতুন, রওশন আরা, করুণা বেগম, মিরাসি বেগম এবং কাঞ্চনমালাসহ নাম না জানা আরো অনেক নারী রণাঙ্গনে অসমসাহসিকার সাথে বীরদর্পে যুদ্ধ  করেছেন।
দুঃখজনক হলেও সত্য, মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে নারী অবদান যথাযথভাবে লিপিবদ্ধ করা হয়নি। শুধু মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রে নয়, কবিতা, উপন্যাস, নাটক, ছোটগল্প এবং চলচ্চিত্রেও নারীর সংগ্রাম ও আত্মত্যাগের প্রকৃত চিত্র ফুটে উঠেনি। এমনকি বীরাঙ্গনা ও মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির ক্ষেত্রেও নারীরা বৈষম্যের স্বীকার। আর স্বাধীনতা অর্জনের ৪৭ বছরে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি এবং ইতিহাসের পাতায়  ঠাঁই না পাওয়া এমনি একজন বীরাঙ্গনা, বীর মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তির বেটি, মুক্তিযুদ্ধের অগ্নিকন্যা ও বীরমাতা নামে খ্যাত অকুতোভয় সংগ্রামী নারীর নাম কাঁকন বিবি।
মুক্তিযুদ্ধের সময় দখলদার পাকিস্তানি মেজর তাঁকে দেখে বলেছিল, ‘একে তো বাঙালি মনে হয়না। মনে হয় অন্য জাত।’ পাক মেজরের ওই ‘জাতাভ্যিমানেই’ প্রথম দফায় ধর্ষণের শিকার হওয়া থেকে রক্ষা পেয়েছিলেন তিনি।  তবে যুদ্ধদিনের সাক্ষী হওয়া অন্য বাঙালি নারীদের মতোই শেষ রক্ষা হয়নি কাঁকন বিবিরও।
হ্যাঁ তিনি বাঙালি নন, তিনি খাসিয়া নারী। খাসিয়া মুক্তি বেটি হিসেবেই তিনি অধিক পরিচিত তাঁর এলাকায়। জাতিগত পরিচয়ের বাইরে তিনি নিজেকে মানুষ হিসেবে দাঁড় করিয়েছিলেন মুক্তির কাতারে। কাঁকন বিবি প্রমাণ করেছেন, তিনি বাংলার। তিনি মানুষের। তিনি মানবতার।
কাকাঁত বা কাঁকনের প্রথমে বিয়ে হয়েছিল ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলসের সেনা পাঞ্জাব প্রদেশের আব্দুল মজিদ খানকে। সেটি সম্ভবত ১৯৫৮ কি ১৯৫৯ সালে।বিয়ের পর কাঁকন বিবি হিসেবে নাম হয়। মজিদ খান বিভিন্ন সময় বিভিন্ন স্থানে বদলিও হতেন। কাঁকন বিবিকেও তিনি সাথে নিয়ে যেতেন তখন। বিবাহিত জীবনের আট বছরে ঘরে তিনটি সন্তান জন্ম নেয়। কিন্তু জন্মের পরপরই মারা যায় তারা।
একাত্তরের শুরুতে কাঁকন বিবির স্বামী তার দেশ পাকিস্তানকে রক্ষা করতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন, ভুলে যান স্ত্রী কাঁকনের কথা। এই অবস্থায় কাঁকন বিবি অর্থনৈতিক ও মানসিক সমস্যার সম্মুখীন হয়ে হন্যে হয়ে খুঁজতে শুরু করেন। তখন পর্যন্ত এই যুদ্ধ এবং যুদ্ধের কারণ নিয়ে মাথা ঘামানের মতো অবস্থা তাঁর ছিলনা। তবে এই খোঁজার মধ্যে দিয়েই কাঁকন বিবি আবিস্কার করেন ভয়ানক এক পৃথিবী। দেখেন শ্রেষ্ঠ জল্লাদখানাগুলোর অত্যাচার। এক পর্যায়ে মজিদ খান সিলেট আখালিয়া ক্যাম্পে থাকা অবস্থায় কাঁকন বিবিকে ছেড়ে উধাও হয়ে যান।
পরে কাঁকন ফিরে আসেন বোনের সংসারে। মজিদ খানও তাঁর কোনো খোঁজ-খবর নেয়নি। তবে তাঁর কারণেই পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে ধরা পড়ার পর জীবন বাঁচে কাঁকনের।
যুদ্ধের আগে কাঁকন বিবির আবার বিয়ে হয় কৃষক শাহেদ আলীর সঙ্গে। জন্ম নেয় সন্তান সখিনা বিবি।
এর মধ্যেই শুরু হয়ে যায় মুক্তিযুদ্ধ। সুনামগঞ্জ-সিলেট অঞ্চলটি ছিল পাঁচ নম্বর সেক্টরের অধীন। এই সেক্টরের কমান্ডার ছিলেন লে. কর্নেল মীর শওকত আলী। কাঁকন বিবি যে গ্রামে থাকতেন তার পাশেই মুক্তিযোদ্ধাদের একটি ক্যাম্প স্থাপন করা হয়। আবার এই ক্যাম্প থেকে খানিকটা দূরেই ছিল পাকিস্তানীদের ক্যাম্প। যা স্থানীয়ভাবে টেংরা ক্যাম্প নামে পরিচিত ছিল।
মীর শওকত আলী একদিন মুক্তিযোদ্ধার ক্যাম্প পরিদর্শনে এসে কাঁকন বিবিকে পাকিস্তানীদের ক্যাম্প থেকে খবর সংগ্রহের কাজে লাগানোর জন্য উৎসাহিত করেন। রাজি হয়ে যান কাঁকন।
বুদ্ধি খাটিয়ে একটি ময়লা ও ছেঁড়া কাপড় পরে একদিন দিনের বেলায় ভিক্ষা করার নাম করে ঢুকেন টেংরা ক্যাম্পে। কৌশলে তথ্য সংগ্রহ করেন। পাকিস্তানি সেনারা কিছু ময়দা ও আটা ভিক্ষা দেয়।
পরের দিন কাঁকন বিবি একই কায়দায় ঢুকেন টেংরা ক্যাম্পে। এ সময় তাকে আটকে ফেলা হয়। কিন্তু নির্যাতন শেষে তাকে ছেড়ে দেয়া হয়।
এর মধ্যে পাকিস্তানি ক্যাম্পে যাওয়ায় স্বামী শাহেদ আলী ছেড়ে দেন কাঁকনকে।
টেংরা ছাড়াও সুনামগঞ্জ, সিলেট,গোবিন্দগঞ্জ, জাউয়া বাজার ক্যাম্পে গিয়ে সব তথ্য এনে মুক্তিযোদ্ধাদের জানাতে থাকেন কাঁকন। আর তার দেয়া তথ্যে চালানো হয় বেশ কিছু অভিযান।
এর মধ্যে টেংরা ক্যাম্পে রাজাকাররা টেংরা ক্যাম্পে কাঁকনের বিষয়ে তাদের সন্দেহের কথা জানিয়ে দেয় পাকিস্তানিদের। তার ভগ্নিপতি মুক্তিযুদ্ধের সমর্থক হওয়ায় তাকে হত্যার কথাও জানায় তারা।
১৯৭১সাল,জুন মাসে দোয়ারাবাজার সীমান্তে পাকবাহিনী ও মুক্তিযুদ্ধাদের মধ্যকার তুমুল লড়াইয়ে মুক্তিবাহিনী হেরে গেলে অনেকের সাথে এই মহিয়সী নারীকেও আটক করে ক্যাম্পে নিয়ে যায় পাকিস্তানি হানাদাররা ।
দিনের পর দিন চলতে থাকে পাকি নরপিশাচ আর রাজাকার আলবদর কর্তৃক তাঁর উপর অমানুষিক নির্যাতন। ভেঙে না পড়ে প্রতিশোধের আগুনে ফুঁসে উঠতে থাকেন এই বীরাঙ্গনা।
একপর্যায়ে হানাদার বাহিনী ছেড়ে দিলে পরিচয় হয় মুক্তিযোদ্ধা রহমতের সাথে। তিনি নিয়ে যান সেক্টর কমান্ডার মীর শওকত আলীর কাছে। শুরু হয় প্রতিশোধের এক নতুন অধ্যায়। জীবনের রঙ্গমঞ্চে জীবন বাজি রেখে,যেমন খুশি তেমন সাজে, কখনো পাগল কখনো ভবঘুরের বেশে পাকবাহিনীর গতিবিধির খবর পৌঁছে দিতেন মুক্তিবাহিনীর কাছে। এসব তথ্যের ভিত্তিতে বেশ কয়েকটি অপারেশন সফল করতে সক্ষম হন মুক্তিযোদ্ধারা।
কিন্তু জীবন তাঁর আরও ত্যাগের! আরও কণ্টকময়! গুপ্তচরবৃত্তি করতে গিয়ে একদিন বাংলাবাজারে পাকবাহিনীর হাতে আবারও ধরা পড়েন এই বীরাঙ্গনা।
শুরু হয় নির্যাতনের স্ট্রীমরোলার । একটানা ৭ দিন বিবস্ত্র করে চালানো হয় পাশবিক নির্যাতন। লোহার রড গরম করে তাঁর নরম আদুরে শরীরটার বিভিন্ন স্পর্শকাতর জায়গায় নরক চিহ্ন এঁকে দিতে থাকে হায়েনারা। যা আজও তাঁকে নাড়া দেয়! আজও শরীরে সেই নরক চিহ্ন বয়ে বেড়ান!
অজ্ঞান অবস্থায় একসময় মৃত ভেবে পাকিস্তানিরা তাঁকে ফেলে যায়। ৭ দিন পর জ্ঞান ফিরে এলে মুমূর্ষু এই বীরাঙ্গনাকে বালাট সাব সেক্টরে নিয়ে চিকিৎসার ব্যবস্থা করানো হয়।
অসম সাহসিনী এই নারী সুস্থ হবার পর আমুল বদলে যান! চিকিৎসা শেষে দেশে ফিরে এসেই পাকিস্তান বধের নেশায় আরও দৃঢ় প্রতিজ্ঞ, আরও অবিচল লক্ষ্যে প্রশিক্ষণ নেন অস্ত্র চালনার। শুরু হয় অস্ত্র হাতে জীবনের আরেক অধ্যায়। পাকিস্তানি হায়েনাদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রাম।
১৯৭১ সালের নভেম্বর মাস, টেংরাটিলায় পাকবাহিনীর সাথে সম্মুখযুদ্ধে লিপ্ত হন এই বীরাঙ্গনা । বিদ্ধ হন গুলির আঘাতে। সুস্থ হয়ে আবারো অস্ত্র হাতে যুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়েন। মুক্তিবাহিনীর সাথে একে একে অংশগ্রহণ করতে থাকেন আমবাড়ি, বাংলাবাজার, টেবলাই, বলিউরা, মহব্বতপুর, বেতুরা, দূর্বিনটিলা, আধারটিলা সহ প্রায় ৯টি সম্মুখযুদ্ধে।
এতোক্ষণে নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছেন,কে ছিলেন একাত্তরের এই অকুতোভয় গুপ্তচর আর বীর নারী যোদ্ধা? হ্যাঁ, তিনি আমাদের কাঁকন বিবি। খাসিয়া সম্প্রদায়ের মুক্তির বেটি বলে পরিচিত আমাদের অগ্নিকন্যা কাঁকন বিবি।
দেশকে যিনি এতোটা দিয়েছেন,দেশের জন্য এতোটা ত্যাগ স্বীকার করেছেন, জীবন বাজি রেখে যিনি পাকিস্তানিদের পরাজয় আনতে ভূমিকা রেখেছেন, সেই কাঁকন বিবি জীবন যুদ্ধে পরাজিত, নিঃস্ব হয়ে বেঁচে ছিলেনএই স্বাধীন বাংলার মাটিতেই!
স্বাধীনতার পর অভিমানে বেছে নেন এক নিভৃত জীবন। চলে যান লোকচক্ষুর সম্পূর্ণ অন্তরালে। ১৯৯৬ সালে সাংবাদিক রনেন্দ্র তালুকদার পিংকু বাংলার এই মাকে আবিষ্কার করেন ভিক্ষারত অবস্থায়।
অসামান্য অবদানের জন্য ১৯৯৬ সালে বীরপ্রতীক খেতাব পান তিনি।একাত্তরের সেই অসম সাহসী নারী, বীরমাতা, মুক্তিযোদ্ধা কাঁকন বিবি। ভালোবেসে এই মাকে মানুষ ‘মুক্তিবেটি’ নামে ডাকত!
আজ মুক্তিবেটির চলে যাওয়ার দিন।যতদিন লাল সবুজ থাকবে তুমি থাকবে তার  গরবিনী মা হয়ে।

সোমবার, ৪ মার্চ, ২০১৯

অতি দেশপ্রেমিক বেশধারীরা সব দেশের জন্যই বিপদ

সোশ্যাল মিডিয়ায় যারা ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের উসকানি দিয়ে থাকেন তাদের একহাত নিয়েছেন নিহত এক ভারতীয় পাইলটের স্ত্রী। যুদ্ধ চাইলে চেঁচামেচি না করে তাদের সীমান্তের রণাঙ্গনে যাওয়ারও পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। তার ভাষায়, ‘আমরা যুদ্ধ চাই না। যুদ্ধের ক্ষতি কী সেটা আপনারা জানেন না। আরও নিনাদের প্রাণ যাক সেটা আমরা চাই না। সোশ্যাল মিডিয়ার যোদ্ধারা এবার থামুন। এখনও যদি আপনারা যুদ্ধ চান তাহলে সীমান্তে যান।’
গত সপ্তাহে ভারত অধিকৃত জম্মু-কাশ্মিরের বাদগামে নিহত হন স্কোয়াড্রন লিডার নিনাদ মান্দাভগানে। বুধবার বাদগামে একটি গ্রামের মাঠে রাশিয়ার তৈরি একটি এমআই-১৭ হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত হয়। এ সময় এর চালকের আসনে থাকা ৩৩ বছরের নিনাদ মান্দাভগানে-সহ সাতজন নিহত হন। শোকের ছায়া নেমে আসে নিহতদের পরিবারে।
মহারাষ্ট্রে শুক্রবার পূর্ণ সামরিক মর্যাদায় ওই পাইলটের শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়। এ সময় সেখানে ‘সোশ্যাল মিডিয়া যোদ্ধাদের’ সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানান নিহত পাইলটের স্ত্রী বিজিতা মান্দাভগানে।
সোশ্যাল মিডিয়ায় যেসব ভারতীয় নাগরিক যুদ্ধের উসকানি দিচ্ছেন তাদের উদ্দেশে বিজিতা বলেন, ‘আপনারা যদি আমার নিনাদ বা উইং কমান্ডার অভিনন্দন বর্তমানের জন্য কিছু করতে চান, তাহলে চিৎকার না করে একটা ছোট্ট কাজ করুন। হয় বাহিনীর সঙ্গে নিজেরা যুক্ত হয়ে যান, নয়তো পরিবারের কাউকে সেই দায়িত্ব দিন। সেটা না পারলে আরও ছোট কাজ করুন। বাড়ির আশপাশ পরিষ্কার রাখুন। রাস্তা নোংরা করবেন না, জনসম্মুখে মূত্রত্যাগ করবেন না, নারীদের হয়রানি করবেন না।’
নিহত পাইলটের দুই বছরের শিশুকন্যা যখন বাবার কফিনে চুমু খাচ্ছিল, তখন সেখানে এক আবেগঘন পরিবেশ তৈরি হয়। মেয়ের পাশে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকেন মা বিজিতাসহ পরিবারের অন্য সদস্যরা।

শুক্রবার, ১১ জানুয়ারি, ২০১৯

সুমনরা মরার জন্যই কি এ স্বাধীনতা?

মা ফিরুজা বেগম বারবার তাঁর ছেলে সুমনকে ফিরিয়ে আনতে সবাইকে অনুরোধ আর বিলাপ করছিলেন।

দুই বছর হলো ঢাকার সাভারের আনলীমা টেক্সটাইলে সিজারম্যান হিসেবে সুমন কাজ করতেন। গত বছর সুমন বরিশালের সামিয়া বেগমকে বিয়ে করেন। গত মঙ্গলবার মধ্যাহ্নভোজের বিরতি শেষে সুমনসহ কয়েকজন সহকর্মী কারখানায় ফিরছিলেন। তখন স্ট্যান্ডার্ড গ্রুপের কারখানার শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ চলছিল। এ সময় কয়েকজন পুলিশ সদস্য সুমনের পথ আটকায়। সুমন আনলীমার কর্মী পরিচয়পত্র দেখিয়ে বলেছিলেন তিনি স্ট্যান্ডার্ডের শ্রমিক নন। নিজের কারখানায় যাচ্ছেন। পুলিশ তা না শুনে তাঁকে এলোপাতাড়ি মারধর করে ফেলে রাখে। পরে পুলিশ লাঠিপেটা, কাঁদানে গ্যাসের শেল ও রাবার বুলেট ছুড়ে শ্রমিকদের সরিয়ে আহত সুমনকে হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখানে কর্মরত চিকিৎসক সুমনকে মৃত ঘোষণা করেন।

অথচ শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের প্রধান সেলিম রেজা প্রথম আলোকে বলেন, সুমন মিয়ার বুকে ধারালো ও সুচালো অস্ত্র অথবা বুলেটের আঘাত রয়েছে। আঘাতজনিত কারণে সুমন মারা গেছেন।

নিহত সুমনের জন্য কোনো মামলা  হয়নি।’ ব্যাপারে এখনো কিছু জানি না বলে ওসি দায়িত্ব সেরেছেন।

হুমায়ূন আজাদ বলেছিলেন, 'যে বালিকাটি ভোর হওয়ার সাথে সাথে ছুটছে কারখানা অভিমুখে, চোখ আর আঙুল জীর্ণ করে শেলাই করছে সভ্যতার মুখোশ, তার সাথে সভ্যতা যেন সভ্য আচরণ করে, তাকে দেয় খাদ্য, বাসস্থান, নিরাপত্তা, তাকে ক্রীতদাসী না করে তাকে যেন দেয় মানুষের মর্যাদা, যা তার প্রাপ্য সহজাতভাবে।'

বাঁচতেই দিচ্ছে না,দালালতন্ত্র বলছে রাস্তা জ্যাম করে নাগরিক পরিবেশ নষ্ট করছে! রক্তখেকো সব দাস।

মাত্র কয়েক শ টাকা মজুরি বাড়ানোর জন্য রাস্তায় নামতে হলো শ্রমিকদের।নতুন বছরের শুরুতে শিল্পমালিকেরা পেলেন কর-সুবিধায় আরও ছাড় আর নাছোড় শ্রমিকেরা পেলেন এক সুমনের গুলিবিদ্ধ লাশ।

বাংলাদেশের জিডিপি (৭.৮৬ %) নিয়ে ভারতও (৭.৩ %) হিংসা করবে। মাত্র পাঁচ বছরে বিশ্বের সুপার-ধনীদের মধ্যে ‘ফার্স্ট’ হওয়ার রেকর্ডে সুপারম্যানের দেশ আমেরিকাও লজ্জায় লাল। কিন্তু সবচেয়ে বিব্রতকর হলো পোশাকশ্রমিকদের আদেখলেপনা। কী নিদারুণ বৈপরীত্য। মাত্র কয়েক শ টাকা মজুরি বাড়ানোর জন্য জীবন দিয়ে তাঁরা আমাদের এত সব রেকর্ডের সুনামহানি করে দিচ্ছেন!

আন্দোলন হলেই মালিকেরা বলেন, দেশকে অস্থিতিশীল করতে শ্রমিকদের উসকানো হচ্ছে। কিন্তু আসল উসকানি তো বঞ্চনা থেকে আসে। মজুরির আন্দোলন চলছিলই, মাঝখানে পড়ল নির্বাচন-বিরতি। আট হাজার টাকা নিম্নতম মজুরি ঘোষণা করে ২৫ নভেম্বর প্রজ্ঞাপন জারি করে সরকার। চলতি মাস থেকে নতুন হারে মজুরি পাওয়ার কথা। সেটা ঠিকমতো না দেওয়াই তো আসল ষড়যন্ত্র।

২০১৩ সালের সরকারি গেজেট অনুযায়ী ফি বছর ৫ শতাংশ হারে মূল মজুরি বাড়ার কথা। কিন্তু তাতেও শুভংকরের ফাঁকি। ৫% হারে বাড়লে যাঁর এখন পাওয়ার কথা ৫,২০০ টাকা, তিনি পাচ্ছেন ৫,১৬০ টাকা। অর্থাৎ কমেছে ৪০ টাকা! যাঁর পাওয়া উচিত ৮,৯৩২ টাকা, তিনি পাচ্ছেন ৮,৫২০ টাকা। পুরো ৪১২ টাকা কম! তা ছাড়া, ৩, ৪ ও ৫ নম্বর গ্রেডের অনেক শ্রমিকের বর্তমান বেতন আর বর্ধিত বেতন প্রায় একই। তার মানে আসলে বাড়েইনি। কত ভাগ কারখানা নিয়ম মেনে বেতন দেয়? এত আন্দোলন, এত কষ্ট, এত আলোচনা বিফলের ষড়যন্ত্রটা আসলে কার?

শ্রমিক ছাঁটাই, টার্গেটের চাপ বাড়ানো এবং নির্যাতন করে শ্রমিক উসকানো কি ষড়যন্ত্রের মধ্যে পড়ে?

বাংলাদেশ গার্মেন্টস শ্রমিক সংহতির উদ্যোগে ‘কী করে বাঁচে শ্রমিক’ নামক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে: ‘৬১ শতাংশ শ্রমিক মনে করেন, তাঁর আয়ের তুলনায় ব্যয় বেশি।...অতিরিক্ত ব্যয়ের বোঝা সামাল দেওয়ার জন্য শ্রমিকেরা নিয়মিত ঋণ নেন এবং খাদ্য ও বাসাভাড়া বাবদ ব্যয় কমিয়ে দেন। গড়ে একজন পোশাকশ্রমিক দৈনিক আট ঘণ্টা কাজের পাশাপাশি মাসে গড়ে ৬০ ঘণ্টা পর্যন্ত ওভারটাইম করেন। ফলে শ্রমিকেরা প্রয়োজনীয় ঘুম ও বিশ্রাম থেকে বঞ্চিত হন...আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড এবং দেশি মালিকের মাত্রাতিরিক্ত মুনাফা কমিয়ে আনতে পারলে বিদ্যমান কাঠামোর মধ্যেই পোশাকশিল্পে ন্যূনতম মজুরি ১৬ হাজার টাকা করা সম্ভব।’

মালিকদের যে ছাড় সরকার দিচ্ছে, তা জনগণের ভাগ থেকেই দিচ্ছে। এর ছিটেফোঁটা দিয়ে লাখো শ্রমিকের এবং তাঁদের সন্তানদের কল্যাণ সম্ভব।

হাসলে আপনাদের দাতেঁ মনুষ্যমাংস লেগে আছে দেখা যায়   ,
আপনাদের সুন্দরী স্ত্রীদের চুড়িগুলো পুড়ে যাওয়া আমার সেলাই দিদিমনিদের হাড়  দিয়ে বানানো;

আপনাদের শার্টের বোতাম পাহাড়ে চাপা পড়া  করুন আমার মাটির সহোদরের কাতর চোখ ।
এত ক্ষিধা লইয়া বুঝি আপনাদের  এই পাহাড় খাওয়ার ক্ষিধা?হে উচু মানুষেরা...,

একদিন ঠিকই জেনে যাবে আমাদের মাটিরওয়ারিশরা
রক্ত আর মৃত্য সয়ে পাল্টানো যাবে না জীবন,

ভুখা দুনিয়ায় জুলুম চালায় যারা কেড়ে নিবে তাগো সব সুখের খোয়াব।

মঙ্গলবার, ৪ ডিসেম্বর, ২০১৮

প্রকাশ রাজ

তাকে প্রথম দেখি  ‘সিংগাম’-এ। নায়ক অজয় দেবগন, অথচ পুরোটা সময়জুড়ে পর্দা কাঁপিয়ে বেড়িয়েছেন এই মানুষটাই। তার কণ্ঠে ‘চিটিং চিটিং চিটিং কারতা হ্যায় তু’ ডায়লগটার ভক্ত হয়ে গিয়েছিলাম সেই সিনেমা দেখে। নাম তার প্রকাশ রাজ, যার ঝুলিতে আছে পাঁচ পাঁচটা জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার!

তিনি নায়ক নন, খলনায়ক। তামিল, তেলেগু, মারাঠি, হিন্দি, টুলু(দ্রাবিড় ভাষা) আর মালয়লাম ভাষায় তিনি সিনেমা করেছেন চুটিয়ে। সবগুলো ভাষায় অনর্গল কথাও বলতে পারেন তিনি! নায়ক না হয়েও সিনেমার প্রাণভোমরা তিনি, রোলটা নেগেটিভ বা পজিটিভ হোক, কিংবা হোক ভালোমন্দের মিশেলে কিছু একটা- জমিয়ে অভিনয়টা তিনি করেন। তার একেকটা ডায়লগ, মুখ আর দেহের ভঙ্গিগুলোর দিকে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়েই থাকতে হয় শুধু।

একটা সময়ে মাসে তিনশো রূপি বেতনে মঞ্চনাটকে কাজ করতেন তিনি। বেঙ্গালুরুতে থাকার সময়ে প্রায় দুই হাজার পথনাটকে কাজ করেছেন প্রকাশ। অভিনয়ে হাতেখড়ি সেখানেই হয়েছিল, মঞ্চে কাজ করতে করতেই শিখেছিলেন অভিনয়ের অ আ ক খ। সেই শেখাটা কেমন কাজে লেগেছে সেটা এখনকার দর্শকেরা টের পাচ্ছেন দারুণভাবেই।

বাবা ছিলেন দ্রাবিড় সম্প্রদায়ের মানুষ, টুলু ভাষায় কথা বলতেন তিনি। মায়ের ভাষা ছিল কন্নড়া। প্রকাশ রাজ নিজে এই দুটি ভাষা ছাড়াও মোটামুটি দক্ষিণী সব ভাষাই আয়ত্ব করে নিয়েছিলেন কৈশোরেই। কাজেই সাউথ ইন্ডিয়ার সবগুলো ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে রাজত্ব শুরু করতে তার সমস্যা হলো না মোটেও, ঐশ্বরিক প্রতিভা আর নিজের মেধা তো ছিলোই। তামিল, তেলেগু, মারাঠি, কন্নড়া, টুলু ভাষার সিনেমায় নায়ক যেই হোক, খলনায়কের চরিত্রে পরিচালকদের প্রথম পছন্দের নাম হয়ে উঠতে লাগলো ‘প্রকাশ রাজ’। তবে স্রোতে গা ভাসাননি কখনও, সিনেমায় নাম লিখিয়েছেন খুব বেছে বেছে। আর তাইতো হাতে এসেছে পাঁচটি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের ট্রফি, অনেক নামজাদা অভিনেতার শো-কেসেও নেই যেটি!

ক্যামেরার সামনে তো ভারতজয় হলো, ক্যামেরার পেছনটা আর বাদ থাকবে কেন- এই ভেবে নেমে পড়লেন সিনেমা পরিচালনাতেও! প্রথম সিনেমা ‘নান্নু নান্নু কানাসু’। ২০১৪ সালে তামিল ও তেলেগু দুই ভাষাতেই নির্মিত সিনেমা ‘ধোনী’র ডিরেক্টর’স চেয়ারে বসেছিলেন তিনিই। এরপরে আরো তিনটি সিনেমা নির্মাণ করেছেন তিনি। প্রথম পরিচালিত সিনেমাটি কর্ণাটক রাজ্যে টানা ১২৫ দিন প্রদর্শিত হবার রেকর্ড করেছিল, তিনি নিজেও মনোনীত হয়েছিলেন ফিল্মফেয়ার সাউথের সেরা পরিচালক পুরষ্কারের জন্যে! অনেকগুলো সিনেমাও প্রযোজনা করেছেন এই গুণী অভিনেতা।

তারকাদের দায়িত্ব থাকে সমাজের প্রতি,তরুণদের প্রতি।আমাদের সমাজের দিকে তাকালে দেখব আমাদের তারকারা কতটা দাসত্ব নিয়ে গোলামি করে!

তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও সাংবাদিক গৌরী লঙ্কেশ বেঙ্গালোরে খুন হন মাসখানেক আগে। সেই ঘটনার কোন সুরাহা করতে পারেনি পুলিশ, এদিকে প্রধানমন্ত্রী বলেই চলেছেন দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভালো- একারণেই মোদিকে বাক্যবাণে বিদ্ধ করেছেন প্রকাশ রাজ।

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে কটাক্ষ করে প্রকাশ রাজ বলেন, ‘‌সকলেই দেখেছেন আগের প্রধানমন্ত্রী সাইলেন্ট থাকতেন। কারণ চুপ থাকাটা তাঁর চরিত্র ছিল। তবে বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর চুপ করে থাকা খুবই বিপজ্জনক। কারণ, তখন তিনি অভিনয় করেন। অভিনয় করা প্রধানমন্ত্রীর পেশা।’‌ বিজেপি–র বিরুদ্ধে সংবাদমাধ্যম ক্রয় করার গুরুতর অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, ‘‌বর্তমানে এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে, খবরের কাগজে প্রকাশিত খবর পড়ে বিশ্বাস করতে ভয় করে। খবরের চ্যানেলও বিশ্বাসযোগ্য নয়। সংবাদমাধ্যমকে ব্যবহার করে সত্যকে মিথ্যা এবং মিথ্যাকে সত্য বলে প্রচার করা হচ্ছে। ক্রমাগত মানুষের মগজধোলাই করার চেষ্টা চালানো হচ্ছে।’‌

উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথকেও তীব্র আক্রমণ করে তিনি বলেন, উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রীর ভিডিও যদি আপনি দেখেন, আপনি গুলিয়ে ফেলবেন উনি মুখ্যমন্ত্রী নাকি কোনও মন্দিরের পূজারি। এইরকম দ্বৈত ভূমিকার লোক আমাদের রয়েছে। এরপরেই তীব্র কটাক্ষ করে প্রকাশ রাজ বলেন, আমাকে পাঁচটি জাতীয় পুরস্কার দেওয়া হয়েছে। এগুলি আমি ওদের ফেরত দিতে চাই। ওরা আমার থেকে বড় অভিনেতা।

দারুণ একজন অভিনেতাই শুধু নন, প্রকাশ রাজ খুব বড় মনের একজন মানুষও। তেলেঙ্গানা প্রদেশের মাহবুবনগর জেলায় কোন্ডারেডিপাল্লে নামের একটা পুরো গ্রামের দায়িত্ব নিয়েছেন তিনি। সেখানকার মানুষের খরচ থেকে শুরু করে স্যানিটেশন, বিদ্যুৎ সবকিছুই এসেছে তার টাকায়। আবার গতবছর রোজার ঈদে প্রকাশ রাজ তার এক দরিদ্র মুসলমান প্রতিবেশীকে নিজের খরচে ঘর বানিয়ে দিয়েছেন। শিল্পীদের মন বড় হয়- কথাটার স্বার্থক উদাহরণ তিনি।

সম্প্রতি "মি-টু" ঝড়ে যখন বলিউড তোলপাড় তখন এই আন্দোলন নিয়ে তাঁর মতামত দিয়েছেন।

তিনি বলেছেন, নারী যুগে যুগে পুরুষ দ্বারা যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন, এটা কোনও মিথ্যা ইতিহাস নয়। পুরুষ চিরকালই আক্রমনকারী।

সুতরাং একজন নারী যখন তাঁর যৌন হয়রানির অভিজ্ঞতার কথা বলেন, যেকোনো পুরুষের জন্যেই তাঁর প্রতিক্রিয়ার প্রথম শব্দটি হওয়া উচিৎ - "আমি সরি"। কারণ টি আমার দ্বারা হোক বা না হোক, একজন নারীর কোনও কারণ নেই তাঁর নিজের যৌন হয়রানির কথা নিয়ে মিথ্যা গল্প বানানোর। পুরুষের তাই শুরুতেই বলা দরকার - আমি দুঃখিত, আমি লজ্জিত।

আমার দ্বারা কোনও নারী যৌন হয়রানির শিকার হননি মানে এটা নয় যে আমি বহুবার আমার সামনেই ঘটে যাওয়া যৌনহয়রানির প্রতিবাদ করেছি, আমি করিনি। দায়িত্ব'র জায়গাটিতে আমারও লজ্জার সীমা নেই।

পর্দায় খলনায়কের চরিত্রে অভিনয় করা এই মানুষটাই বারবার পরিচয় দিয়েছেন নিজের মহৎ হৃদয়ের। তার অভিনয়প্রতিভা নিয়ে বলার কিছু নেই, সেখানে তিনি অদ্বিতীয়, দক্ষিণের সিনেমাজগতে নিজেই নিজের প্রতিদ্বন্দ্বী। কিন্ত দারুণ অভিনয় করাই শুধু একজন অভিনেতা বা শিল্পীর কাজ নয়, ভালো মানুষ হওয়াটাও দায়িত্ব- সেটাই নিজের জীবনে করে দেখিয়েছেন প্রকাশ রাজ।

সোমবার, ৩ ডিসেম্বর, ২০১৮

জীবনশক্তির দলিল কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়

বন্ধু সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের স্ত্রী স্বাতী গঙ্গোপাধ্যায়ের সাথেও খুব আন্তরিক সম্পর্ক ছিল শক্তির। তার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে স্বাতী বলেন,
ড্রিঙ্ক করার পরে বন্ধুর বউয়ের সঙ্গে একটু ফ্লার্ট তো অনেকেই করেন! তাতে আমি দোষের কিছু দেখি না, কিন্তু শক্তিকে অনেকটা খেয়েও তেমন কিছু করতে দেখিনি।
মদ্যপানের পরে সুনীলের বন্ধুদের মধ্যে নানা মজার ঘটনা ঘটত। এএইআই ক্লাবের আড্ডায় একবার কেউ একজন সুনীলকে বললেনও, শোনো, তুমি যদি স্বাতীকে ডিভোর্স করো, আমায় খবর দিও কিন্তু। সুনীল, বুদ্ধদেব গুহ, মতি নন্দী অনেককেই মেয়েদের সঙ্গে একটু-আধটু ফ্লার্ট করতে দেখেছি। আর শ্যামল (গঙ্গোপাধ্যায়) তো ইচ্ছে করে দুষ্টুমি করতেন, ‘স্বাতী তুমি কি আমায় একবারটি চুমু খেতে দেবে?’ বন্ধুদের মধ্যে এ সবই নির্দোষ মজা। শক্তির কিন্তু মেয়েদের নিয়ে এই ব্যাপারটা কখনও দেখিনি!
আমার বরং ওঁকে দেখে কেমন মায়া হতো! মায়েদের যেমন সবচেয়ে দুষ্টু ছেলেটার ওপরে বাড়তি স্নেহ থাকে। আমার মনে হয়, মদ খেলে সুনীল খানিকটা বেশি ‘হোল্ড’ করতে পারত। চট করে অতটা বেসামাল হতো না। হলেও চুপচাপ থাকত। শক্তি তুলনায় বেশি হইচই করতেন। হয়তো একটু বেশি তাড়াতাড়ি অনেকটা খেয়ে ফেললেন! তার পর কয়েক বার বললেন, ‘আমি শক্তি চট্টোপাধ্যায়!’ কিংবা হয়তো নিজেদের মধ্যে একটু গালাগাল করলেন। সুনীলকে দু’-একবার দেখেছি, এই সময়ে ওঁকে সামলাচ্ছে, ‘শক্তি, উঁ-হু এখানে কিন্তু এ সব কথাবার্তা হয় না।’ প্রথম প্রথম লোকটাকে নিয়ে আমার একটু জড়তা ছিল। শক্তিকে একটু ভয়-ভয়ও করত। কিন্তু ক্রমশ সে-সব কেটে গিয়েছিল। তখন মনে হতো, যাই একটু মাথায় হাত বুলিয়ে দিই, কয়েক বার দিয়েওছি! বলেছি, ‘সত্যি আপনারা পারেনও! কেন এত খান? কী যে করেন! ’
এখানে কবিতা পেলে গাছে-গাছে কবিতা টাঙাবো।’
এমন করে আর কে’ই বা বলতে পারেন! তিনি কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়। তাঁর জীবন জুড়ে, পথে-পিরিচে কবিতার ঘর-বাড়ি।
সুবর্ণরেখা পেরিয়ে লোকটা হাঁটছে রবিঠাকুরের ঘর-বাড়ির দিকে।
হাঁটছে...
তিনপাহাড়। মন্দির। ছাতিমতলা। ওপাশে পুরনো মেলার মাঠ। কিঙ্করের ডেরা থেকে বেরিয়ে, রতনপল্লির একলা পথ। লোকটা উত্তরায়ণে।
বিচিত্রা-সংগ্রহশালায় ঢোকার মুখে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল সে। তার চোখ যে গিয়েছে, সংগ্রহশালার সিঁড়িতে। প্ল্যাকার্ডের লেখায়। সেখানে লেখা, ‘জুতা খুলিয়া প্রবেশ করুন’।
কয়েক মুহূর্তের অপেক্ষা...
সজোরে লাথি মেরে লোকটা দূরে সরিয়ে দিল প্ল্যাকার্ড!
হায়, হায় করে উঠল চারপাশ!
‘‘এটা কী করছেন শক্তিবাবু!’’
লোকটার স্পর্ধা দেখে ছুটে এসেছেন রবীন্দ্রভবনের অধ্যক্ষ ভবতোষ দত্ত। বিস্মিত তিনিও!
লোকটা যেন উন্মত্ত দরবেশ! জলদগম্ভীর স্বরে বলল, ‘‘এটা কি মন্দির? রবীন্দ্রনাথ কি দেবতা? আমি বিশ্বাস করি মানুষে। মন্দির হলেও মানুষের মন্দির!’’
রবীন্দ্রানুরাগী ছিলেন শক্তি। রবীন্দ্রসঙ্গীতকে ভালোবাসার মধ্য দিয়েই রবিঠাকুরের প্রতি সমূহ অনুরাগ কাজ করে। এক্ষেত্রে তার একটি স্বীকারোক্তি উল্লেখ্য,
“আমি যখন মদ্যপান করতে করতে নিজের মধ্যে চলে যাই তখন রবীন্দ্রনাথের গান আমার ভিতর বাহিরকে একাকার করে দিয়ে যায়। তখন গলার সবটুকু জোর ও উদারতা দিয়ে ওঁর গান গাইতে ইচ্ছে করে”।
বোহেমিয়ান এই কবির যখন একটা আশ্রয় লাগতো, তখন হয়তো কারো দরজায় এভাবেই করাঘাত করতে চাইতেন, আবার হয়তোবা নিজের দরজার দিকেই তাকিয়ে থাকতেন একবার একটি করাঘাতের কামনায়। ভাবনা ও ভাষার বৈপরীত্যপূর্ণ সংঘাতে ভেসে ওঠে কিছু কথা,
“দুয়ার এঁটে ঘুমিয়ে আছে পাড়া
কেবল শুনি রাতের কড়ানাড়া
অবনী বাড়ী আছো?”
সাহিত্যজীবনের শুরুটা কবিতা নয়, গদ্য দিয়ে শুরু হয়েছিলো। ‘কুয়োতলা’ উপন্যাসই তার প্রথম প্রকাশিত গ্রন্থ। ১৯৫৬-৫৭ এর দিকে এটি রচিত হয় এবং ১৯৬১ সালে প্রকাশিত। প্রথমদিকে তিনি উপন্যাস লিখে অর্থ রোজগারের চিন্তা করলেও পরে তার সমগ্র সত্ত্বাই যেন ঝুঁকে পড়ে কবিতার দিকে। এই উপন্যাসটির নায়ক নিরুপমকে শক্তির পরবর্তী বেশ কিছু উপন্যাসেও দেখা যায়, তবে প্রথমবারের মতো ওঁর প্রবলতা থাকে না তাতে। হয়তো বা মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দু কাব্যের দিকে সরে এসেছিলো বলেই উপন্যাসে তার সাহিত্যিক তীব্রতায় ভাঁটা পড়ে।
দায়বদ্ধতা তাকে তেমন আকর্ষণ করতো না, ছুটে বেড়ানোতেই জীবন খুঁজে পেতেন বলেই হয়তো! অনিয়ন্ত্রিত গতির মধ্য দিয়েই তার অগতানুগতিক ভাবনা প্রকাশ পেতো শক্তিময় লেখনীতে। লাগামহীন জীবন আর মদ্যপান- এই ছিল তার নিত্যসঙ্গী।
“ভালোবাসা পেলে আমি কেন পায়সান্ন খাব
যা খায় গরীবে, তা-ই খাব বহুদিন যত্ন করে”
যার সব আবেদন নগণ্য হয়ে যায় ভালোবাসার কাছে, তেমনই কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়। তার জীবনে প্রেম এসেছিলোও অত্যন্ত সরব উপস্থিতি নিয়ে। মলয় রায়চৌধুরীর দাদা সমীর রায়চৌধুরীর শ্যালিকা শীলা চট্টোপাধ্যায়ের প্রেমে পড়েন তিনি। একসাথে অনেকটা সময়ও কাটান তারা। শীলা কলেজে গেলে বাইরে গাছতলায় দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতেন শক্তি। ধারণা করা হয়, সেই অপেক্ষারই ফসল ছিল ‘হে প্রেম হে নৈঃশব্দ্য’ কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলো। সমীর রায়চৌধুরী চাকরিজনিত কাজে বাইরে গেলে বাড়িতে মাঝেমাঝে শক্তিকে রেখে যেতেন এবং বলাই বাহুল্য যে এ কাজটি তিনি বেশ আগ্রহের সাথেই করতেন!
একবার তো এতদিন থেকে গিয়েছিলেন যে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় তার খোঁজে গিয়ে বলেন, “তুই এখানে ইস্টিশান পুঁতে ফেলেছিস ?” কিন্তু দুঃখের বিষয়, সে প্রেম পরিণয় পর্যন্ত গড়ায়নি এবং এই ব্যর্থতা তার জীবনে বেশ গভীর দাগ কাটে। সাহিত্যজীবনেও এর বেশ প্রভাব দেখতে পাওয়া যায়। এ নিয়ে তার লেখা ‘কিন্নর ও কিন্নরী’ উপন্যাসটি প্রকাশ পায় ১৯৭৭ সালে। এটি ছাড়াও ‘অম্বা ও দেবব্রত’, ‘রামচন্দ্র ও শর্বরী’, ‘সোম ও তারা’, ‘অর্জুন ও উত্তরা’ নামক  চারটি ব্যর্থ প্রেমের উপন্যাস তিনি উপহার দেন বাংলা সাহিত্যকে, যার উৎসও মনে করা হয় তার নিজের জীবনে প্রেমের ব্যর্থতাকেই। উল্লেখ্য, এই উপন্যাসগুলোর সবগুলোই পৌরাণিক চরিত্র কেন্দ্রিক।
শক্তি চট্টোপাধ্যায় খ্যাপাটে মাতাল। শক্তি চট্টোপাধ্যায়।এই কবি জীবনকে উদযাপন করেছেন, নিংড়ে নিংড়ে। তাঁর জীবনের পুরোটাই মিথ। যা তিনি জন্ম দেননি, তাও। ‘এখন গঙ্গার তীরে ঘুমন্ত দাঁড়ালেম/ চিতাকাঠ ডাকে : আয় আয়।’
আপাত দৃষ্টে পদ্যের শক্তি খ্যাপামো দিয়ে মোড়ানো মনে হলেও শক্তির পদ্য আদতে আধুনিক সমাজের বিরুদ্ধে খ্যাপাটে এক আক্রমণ, সে হোক প্রেম, ঘৃণা কিংবা দ্রোহের পঙক্তি, সব জায়গাতেই এক তেড়েফুড়ে আসা চেহারা– শক্তি, শক্তি চট্টোপাধ্যায়– ঘূর্ণিঝড়ের শক্তি নিয়েই হাজির হয়েছেন পঞ্চাশের দশকে।
হৃদয়ের গহীনে বসত করা অবাধ্য নিজেকেই জিজ্ঞেস করেছেন, জাগাতে চেয়েছেন, বৃষ্টিস্নাত বারোমাসে: “বৃষ্টি পড়ে এখানে বারোমাস/ এখানে মেঘ গাভীর মতো চরে/ পরাঙ্মুখ সবুজ নালিঘাস/ দুয়ার চেপে ধরে– ‘অবনী বাড়ি আছো?” শক্তি নিজেই বলেছেন অবনী তিনি নিজেই। শরীরটা যেন এক বাড়ি, ভেতরে থাকা নিজেকে তাই চিৎকার করেই ডাকেন তিনি, যখন, শক্তি বলছেন, “আধেকলীন হৃদয়ে দূরগামী/ ব্যথার মাঝে ঘুমিয়ে পড়ি আমি/ সহসা শুনি রাতের কড়ানাড়া/ ‘অবনী বাড়ি আছো?’” এই কড়ানাড়া যেন থামে না, থামতে চায় না।
যে শক্তি এত ছন্নছাড়া, উড়নচণ্ডী, বাউণ্ডুলে স্বভাবের; যে শক্তি অফিসে হাজির থাকে না টানা কয়েকদিন। জিজ্ঞেস করলে বলেন, বলে গিয়েছি তো! কাকে? শক্তির উত্তর, কেন দারোয়নকে তো বলে গেলাম, দশদিনের ছুটিতে যাচ্ছি। শক্তি এমনই। কবির স্ত্রী মীনাক্ষীও অনেকসময় জানতেন না কোথায় আছেন শক্তি। কদিন পর খোঁজ আসে, কলকাতার বাইরে কবিতা পাঠের আসরে পদ্য পড়ছেন শক্তি।
শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের ছেলে তার বাবার কথা মনে করে বলেন, তিনি শুধু কবি বা লেখকই ছিলেন না, একজন সমাজসেবীও ছিলেন। একবার তিনি তার এলআইসি ফান্ডের সম্পূর্ণ অর্থ এক রিকশাচালককে দিয়ে দেন শুধুমাত্র এই কারণে যে রিকশাচালকটি কয়েকটি কবিতা লিখেছিলো এবং বাংলা সাহিত্যে তার বেশ আগ্রহ ছিল।
নিশি ডাকা ভোরে, টেলিফোনে টেলিফোনে ঘুরল কবির শোক-সংবাদ!
চলে যাওয়ার খবরে মীনাক্ষীদেবী এলেন শান্তিনিকেতন। এলেন আরও অনেকে। তাঁদের স্মৃতি—
এসেছিলেন তাঁর প্রেসিডেন্সির শিক্ষক, ভূদেব চৌধুরী।  মীনাক্ষীদেবী বললেন, ‘‘আপনার ছাত্র ফাঁকি দিয়ে চলে গেল!’’ ভূদেববাবু কবি-জায়ার মাথায় হাত রেখে বললেন, ‘‘ও যে চিরকালের ক্লাস পালানো মা, তুমি আর কত দিন ধরে রাখতে পারবে!’’
শান্তিনিকেতনে শক্তির শেষযাত্রায় তাঁকে স্টেশনে পৌঁছবার জন্য অ্যাম্বুল্যান্সও জোটেনি!
ঘি রঙের ডোরাকাটা পাঞ্জাবি, পাজামায় বরফের বিছানায় ঘুমিয়ে শক্তি। জিপে করে দেহ পৌঁছল বোলপুর স্টেশনে।
রবিঠাকুরকে বিদায় জানানোর প্রায় সাড়ে পাঁচ দশক পর, আর এক প্রিয় কবিকে চোখের জলে ভেসে শেষ প্রণাম জানাল বোলপুর-শান্তিনিকেতন!
পা দুটি হাঁটু অবধি, বেরিয়ে রইল জিপের বাইরে। সারাটা পথ!
শক্তির কবিতা নিয়ে বলার দু:সাহস আমি করি না।  এই আজন্ম ভবঘুরে,বাউণ্ডুলেকে বলি
“কে বেশি পাগল/ কবি না কবিতা/ দরকার নেই সেই হিসেব দেবার।/ ঘুমোও বাউণ্ডুলে, ঘুমোও এবার।”
ক্রন্দনরত বীজের খোলস, ভেতরে ক্রন্দন স্মৃতির জননী হয়ে যার কবিতা করুণ সুরে বুকে বেজে উঠে , সে ভবঘুরে শব্দ কারিগর , হৃদয়পুরের রাখাল শক্তি চট্টোপাধ্যায়।
কবিতার আধুনিকতার উৎস খুঁজতে গিয়ে শক্তি কবিতার রাজ্য তছনছ করে দেবার ভূমিকা নেন।কলকাতার মধ্যরাতের রাজত্ব করা কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায় বাঁচার অনুপ্রেরনা পেতেন জীবনের থেকে। তাঁর কবিতাগুলো হাজার টানাপোড়েনের মাঝে এক উদ্দাম জীবনশক্তির দলিল।
"শুভ জন্মদিন হৃদয়পুরের ভবঘুরে রাখাল"

জীবনানন্দ দাশ

হারিয়ে যাওয়া কয়েকটি খাতা! আর তাতেই শোরগোল পড়ে গিয়েছিল। সময় নষ্ট না করে বিশেষ দলও তৈরি করে ফেলেছিল কলকাতা পুলিশ। তার পর তন্নতন্ন করে খোঁজা শুরু হয়েছিল কলেজ স্ট্রিট বইপাড়ায়। শেষ পর্যন্ত এক পুরনো বইয়ের দোকান থেকে উদ্ধার করা হয়েছিল কয়েকটি খাতা। কিন্তু তা-ও সব ক’টা নয়! বইয়ের দোকানদারের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ পৌঁছে গিয়েছিল বইপাড়ারই এক মুদিখানার দোকানে। সেখানে গিয়ে দেখা গিয়েছিল, হারানো খাতার পৃষ্ঠা ছিঁড়ে তৈরি ঠোঙায় সর্ষে বিক্রি করছেন ওই মুদিখানার দোকানদার! তিনি জানিয়েছিলেন, সাত কিলো ওজনের ওই রদ্দি কাগজপত্র তিনি কিনেছিলেন সাড়ে ১২ টাকায়! শেষ পর্যন্ত যেটুকু অক্ষত ছিল, উদ্ধার করা হয়েছিল তা। যিনি খাতা হারানোর অভিযোগ করেছিলেন, হারানো জিনিস উদ্ধারের খুশিতে পুলিশকর্তাকে নিজের বাবার লেখা একটি বই উপহার দিয়েছিলেন। বইয়ের নাম ‘রূপসী বাংলা’, কবির নাম জীবনানন্দ দাশ। বইয়ের উপরে লেখা ছিল, ‘কৃতজ্ঞতার সাথে মঞ্জুশ্রী দাশ।’ তারিখ ১০ সেপ্টেম্বর, ১৯৮০ সাল।
৩৮ বছর আগের সেই ঘটনার স্মৃতিচারণ করে তৎকালীন ডিসি ডিডি (২) ও প্রাক্তন পুলিশ কমিশনার প্রসূন মুখোপাধ্যায় বললেন, ‘‘জীবনানন্দ দাশের প্রথম জীবনের অপ্রকাশিত পাণ্ডুলিপি খোয়া গিয়েছে বলে আমাদের জানিয়েছিলেন তাঁর মেয়ে মঞ্জুশ্রীদেবী। যত দূর মনে পড়ছে, তিনি মেচেদা থেকে লোকাল ট্রেনে ফিরছিলেন। ট্রেনের বসার সিটের তলায় রাখা সুটকেসেই জীবনানন্দের অপ্রকাশিত পাণ্ডুলিপি ছিল। অনেক খাতা ছিল। যখন হাওড়া স্টেশনে নামেন, তখন দেখেন ওই সুটকেসটি নেই। সুটকেসচোর ভেবেছিল গয়না বা টাকাপয়সা আছে। কিন্তু সে সব কিছু না পেয়ে রদ্দি কাগজ হিসেবে বেচে দিয়েছিল। তবে হারানো পাণ্ডুলিপির কিছু অংশ উদ্ধার করা গিয়েছিল। পুরোটা পাওয়া যায়নি!’’ জীবনানন্দের অপ্রকাশিত পাণ্ডুলিপির একটা অংশ বাক্স করে আর ফেরত আনা যায়নি। ফলে জানা যায়নি, চিরদিনের মতো হারিয়ে যাওয়া পাণ্ডুলিপিতে আরও কী কী অলৌকিক-শব্দবিস্ময় অপেক্ষা করে ছিল!
কাউকে দেখানোর জন্য নয়, নিজের জন্যই যেন লেখাগুলো লিখতেন। লিখে ট্রাঙ্কভর্তি করে রাখতেন। ছাপাতে দেওয়ার আগে ওখান থেকেই বার করে দিতেন। ছোটবোন সুচরিতা খুব স্নেহের পাত্রী ছিলেন তাঁর। কখনও কখনও তাঁর সামনে তিনি বার করতেন ওই ট্রাঙ্কের লেখা। বাকিরা সেই অর্থে কিছু জানতেনই না। তাঁর জীবদ্দশায় সব ক’টি কাব্যগ্রন্থ ও পত্রপত্রিকা মিলিয়ে বড়জোর সাড়ে তিনশো লেখা প্রকাশিত হয়েছিল। বাকি ট্রাঙ্কভর্তি সব লেখাই তো তাঁর মৃত্যুর পরে উদ্ধার করা হয়েছে। সেগুলো যেন একটা আলাদা জগৎ,’’ রাসবিহারী অ্যাভিনিউয়ের বাড়িতে বসে কথাগুলো বলছিলেন অশোকানন্দের পুত্র অমিতানন্দ দাশ। জীবনানন্দের স্ত্রী লাবণ্য, পুত্র সমরানন্দ, কন্যা মঞ্জুশ্রী অনেক আগেই প্রয়াত হয়েছেন। প্রসঙ্গত, দেশভাগের ক্ষত নিয়ে এ দেশে আসার পরে রাসবিহারী অ্যাভিনিউয়ের এই বাড়িতেই জীবনানন্দ কিছু দিনের জন্য আশ্রয় নিয়েছিলেন। পরে ল্যান্সডাউন রোডের (বর্তমানে শরৎ বসু রোডের) এক ভাড়াবাড়িতে তিনি চলে যান। রাসবিহারী অ্যাভিনিউয়ের এই বাড়িতেই ট্রাম-দুর্ঘটনার দু’দিন আগে হন্তদন্ত হয়ে এসে জীবনানন্দ জানতে চেয়েছিলেন, সকলে ঠিক আছেন কি না। কারণ, রাস্তায় কার কাছ থেকে যেন শুনেছেন, পরিবারের কারও ট্রাম অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে। সকলে ঠিক আছেন শুনে নিশ্চিন্ত হয়েছিলেন।
আকাশে মেঘ দেখে বালক জীবনানন্দ ভাইকে বলতেন, তিনি একটা মনপবনের নৌকা তৈরি করবেন। সে দিনও কি জীবনানন্দ আকাশে মেঘ দেখে মনপবনের নৌকার কথা ভাবছিলেন? না হলে কেন ট্রামের অবিরাম ঘণ্টা বাজানোর আওয়াজ, ট্রাম চালকের চিৎকার শুনতে পাবেন না তিনি! ট্রামের ধাক্কায় গুরুতর জখম জীবনানন্দকে রাস্তা থেকে তুলে শম্ভুনাথ পণ্ডিত হাসপাতালে ভর্তি করিয়েছিলেন অপরিচিতেরা। সেখানেই আট দিনের লড়াই।
মৃত্যুর আগে তাঁর শেষ উক্তি ছিল, ‘ধূসর পাণ্ডুলিপির রং সারাটা আকাশ জুড়ে’।
সেই ট্রামটি এখন আর নেই! এক সময়ে আগুন লেগেছিল। তাতেই পুড়ে ছারখার হয়ে গিয়েছিল ট্রামটি।
নেমেসিস? হবে হয়তো। না হলে কবির ‘ঘাতক’ ট্রাম নিজেই আগুনে কেন ভস্মীভূত হবে!
শহরের প্রাণঘাতী ট্রামলাইনে তাঁর পথ হাঁটা থেমেছিল, আবহমানের শব্দস্রোত থামেনি!
‘সব পাখি ঘরে আসে— সব নদী’, কিন্তু হয়তো সেই আবহমানের খোঁজে বেরিয়েই জীবনানন্দ আর ফেরেননি! বাংলা কবিতার নির্জন চরাচর ধরে জীবনানন্দ হেঁটে গিয়েছেন দূরে, দূরতম দ্বীপে, একাকী, নিঃসঙ্গ অবস্থায়। তাঁর গা থেকে খসে খসে পড়েছে বাংলা কবিতার অবিশ্বাস্য সব লাইন, অসম্ভব সব শব্দ। তার পর সে সব শব্দ মিশে গিয়েছে আলপথে,
মাঠের ধারে, ধানসিড়ি নদীর কিনারে। আর তিনি ছড়িয়ে পড়েছেন এ বাংলায়, দুই বাংলার বিস্তীর্ণ চরাচরে— মাটির ভিতর মাটি হয়ে, ফসলের ভিতর ফসল হয়ে, পাখির ভিতর পাখি হয়ে...

‘বিপ্লবের সবচেয়ে বড় উপকার হচ্ছে, আমাদের যৌনকর্মীরাও গ্র্যাজুয়েট।’

২০০৩ সালে পরিচালক অলিভার স্টোনকে এ কথা বলেন ফিদেল। তিনি বিপ্লবের সুবিধাভোগী নন,বিপ্লবের প্রতিশব্দ।
আদর্শ মানুষকে একত্রিত করে,আদর্শ আমাদের সংগ্রামী জনতায় পরিণত করে,আদর্শ শুধু ব্যক্তিকেই নয়, সমষ্টিকেও বিপ্লবী করে তোলে।
-ফিদেল ক্যাস্ট্রো
সাম্রাজ্যবাদী হিংসার বিরুদ্ধে একটা নীল আকাশের নাম। সেই নীল আকাশ কালো মেঘে ছেয়েছে। আমেরিকার সিআইএ কাস্ত্রোকে খুন করার চেষ্টা করেছে বহু বার। পারেনি। আর পারবেও না। চলে গিয়েও কাস্ত্রো আরও এক বার আমেরিকাকে হারিয়ে দিলেন।
তার নামে কোনো রাস্তা নেই কিউবায়, নেই কোনো মূর্তিও; এসবের প্রয়োজনও অবশ‌্য নেই ফিদেল কাস্ত্রোর; দেশের সীমানা ছাড়িয়ে কোটি মানুষের মনে তার নাম।
দেশে বিরোধীদের চোখে তিনি ‘স্বৈরাচার’, কট্টর পুঁজিবাদী দেশগুলোর কাছে তার পরিচয় ‘একনায়ক’; বিপরীতে বন্ধু রাষ্ট্রগুলোর কাছে তিনি ‘আস্থার প্রতীক’,  কাছে তিনি ‘এল কমান্দান্তে (দি কমান্ডার)’, মুক্তি সংগ্রামী সাধারণ মানুষের কাছে তিনি ‘কিংবদন্তি’।
ক‌্যারিবীয় সাগরের যুক্তরাষ্ট্রের ধনীদের অবকাশ যাপনের একটি বিনোদন কেন্দ্র কিউবাকে পুরোপুরি বদলে দিয়ে, ওয়াশিংটনের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে সেখানে লাল পতাকা উড্ডীন রেখে ৫ দশকজুড়ে বিশ্ববাসীর আগ্রহের কেন্দ্রে ছিলেন ফিদেল কাস্ত্রো।
“১৯৫৯ সালে যখন ক্ষমতা দখল করেন, তখন খুব কম লোকই ভাবছিল ফিদেল ক‌াস্ত্রো কিছু করতে পারবেন,” বলছেন কিউবা বিষয়ক আমেরিকান বোদ্ধা ড‌্যান এরিকসন।
কিন্তু থেমে থাকেননি ফিদেল; বিপক্ষ মত,
ভগ্নস্বাস্থ‌্য নিয়ে চলতে চলতে ৯০ বছর বয়সে  বিদায়  সব কিছু বাদ দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় কোলের মধ‌্যে একটি কমিউনিস্ট রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে তা টিকিয়ে রাখার জন‌্য রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের গবেষণার বিষয়ও হয়ে থাকবেন ফিদেল কাস্ত্রো।
ফিদেলের জন্ম এক অতীব সাধারণ পরিবারে। পেশায় চাষি মায়ের ছেলে যে বন্দুক হাতে বিদ্রোহ ঘোষণা করবে, তা কেই বা জানত। দরিদ্র পরিবারের একরত্তি ছেলে যে একদিন ‘দ্য গ্রেটদের’ আসনে সবার প্রথম দিকে বসবেন তা একমাত্র ইতিহাসই জানত না। ইতিহাস তো নিজে হাতেই লিখেছেন কাস্ত্রো। কখনও বন্দুকের নলে, কখনও কলমের খোঁচায়, কখনও আবার একটানা সাত ঘণ্টার ভাষণে।
ফিদেল আজ সশরীরে নেই, তবে রয়ে গিয়েছে তাঁর রক্তবীজেরা, রয়ে গিয়েছে তাঁর আদর্শ। তাই ফিদেল নামের আগে একটা শব্দ “অমর” অনায়াসেই লিখে দেওয়া যায়, বলা যায় “অমরত্ব” যোগ্য সম্মান পাবে ফিদেলের সঙ্গে জুড়ে গিয়ে। কারণ, ৬৩৪ বার যাঁর বিরুদ্ধে খুনের চক্রান্ত করেও তাঁর কিঞ্চিত কেশও ছিড়তে পারেনি শক্তিধর মার্কিন দেশের দশ শক্তিশালী রাষ্ট্রপতি, তাঁকে আর অমরত্বের পরীক্ষায় বসতে হয় না। তাই একথা বলতেই হয়, ফিদেল আর তাঁর জীবনের পার্টনারশিপ “সিক্স থ্রি ফোর, উইদআউট নো লস” (৬৩৪ বার জয় ফিদেলের, শূন্য শূন্যই থেকে গিয়েছে)।
বিপ্লবীর মৃত্যু নেই,এই দিন শুধু তোমার দেহত্যাগ হয়েছে।তুমি রবে বিপ্লব যতদিন পৃথিবীতে থাকবে।