সোমবার, ৬ নভেম্বর, ২০১৭

আমি মেজর হায়দার বলছি -মুক্তিবাহিনীর প্রতি নির্দেশ .....

দরাজ কণ্ঠে এরকম করেই ১৬ ডিসেম্বর প্রথম ঢাকা বেতারে ও টিভি থেকে ঘোষণা পাঠ করেন লেফট্যানেন্ট কর্নেল এ.টি.এম হায়দার। সেদিন পাকবাহিনীর আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে তিনি উপস্থিত ছিলেন।
প্রথম পাক সেনাবাহিনীর কমান্ডো ব্যাটেলিয়নের কর্মকর্তা হায়দার কুমিল্লা সেনানিবাস থেকে পালিয়ে ২৬ মার্চ মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন এবং শুরু থেকেই ২নং সেক্টরের কমান্ডার মেজর খালেদ মোশাররফ এর সেকেন্ড ইন কমান্ড হিসেবে মেলাঘরে অবস্থিত প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে সকল মুক্তিযোদ্ধাকে কমান্ডো বিস্ফোরক ও গেরিলা ট্রেনিং করাতেন। মুক্তিবাহিনীতে সর্বাধিক ৩০,০০০ গেরিলা প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত হয় এই ২ নং সেক্টর থেকেই। অক্টোবরের ৭ তারিখে খালেদ নিয়মিত ব্রিগেড কে' ফোর্সের কমান্ড গ্রহণ করলে তিনি সেক্টর অধিনায়কত্ব লাভ করেন।
এ.টি.এম. হায়দারের ছোট বোন ক্যাপ্টেন সেতারা বেগম (যিনি পরবর্তীতে বীর প্রতীক খেতাব প্রাপ্ত হন) ও একমাত্র ছোট ভাই এ.টি.এম সফদার (জিতু) মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। এপ্রিল মাসে ৬/৭ জন সৈন্য নিয়ে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে আসেন এবং ময়মনসিংহ-কিশোরগঞ্জ মহাসড়কের উপর তারের ঘাট পুল এবং মুসুল্লি রেলওয়ের পুল দু'টি বিস্ফোরক দিয়ে উড়িয়ে দেন। এই অপারেশনের পর হায়দার সহ গোটা দল তেলিয়াপাড়া হতে প্রথমে ভারতের মতিনগর ও পরে সেখান থেকে আগরতলার মেলাঘরে চলে যান। পরবর্তীতে ঢাকা-চট্টগ্রামের রাস্তায় ফেনিতে অবস্থিত বড়পুল ধ্বংস সহ একাধিক অপারেশনের নেতৃত্ব দেন মেজর হায়দার।
একাত্তরে পাকিস্তানী সেনাবাহিনী তাঁর কেশাগ্র স্পর্শ করতে পারেনি। কিন্তু তাঁকে আমরা বাঁচিয়েও রাখিনি। স্বাধীন ও সার্বভৌম সেই রাষ্ট্রেই তাঁকে হত্যা করা হয়, যে রাষ্ট্র অর্জনের জন্য তিনি প্রবল বিক্রমে লড়েছিলেন ও লড়াই করিয়েছিলেন অগণিত দুঃসাহসী গেরিলা যোদ্ধাকে।
প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণের পর ১৯৫৮ সালে কিশোরগঞ্জ রামানন্দ হাইস্কুল থেকে ম্যাট্রিক, ১৯৬১ সালে কিশোরগঞ্জ গুরুদয়াল সরকারি কলেজ থেকে আইএ এবং ১৯৬৩ সালে লাহোর ইসলামিয়া কলেজ থেকে বিএসসি পাস করেন।কমান্ডো ট্রেনিংয়ে ৩৬০ জনের মধ্যে মাত্র দুজন বাঙালি অফিসার ছিলেন। কমিশন প্রাপ্তির পর ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত তিনি, তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানের মুলতান ক্যান্টনমেন্টে কর্মরত ছিলেন। ১৯৬৯ সালের শেষের দিকে তৃতীয় কমান্ডো ব্যাটালিয়নের একজন ক্যাপ্টেন হিসেবে তাঁকে কুমিল্লা সেনানিবাসে পাঠানো হয়। ১৯৭১ সালের জানুয়ারিতে তাঁকে ঢাকায় নিয়ে আসা হয়। ১৫-২০ দিন পর পুনরায় কুমিল্লায় নিয়োগ করা হয়।
আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে তাঁর অবদান নিয়ে আমাদের বলার কিছু নেই। সেক্টর ২ এর অধীনে পরিচালিত গেরিলা অপারেশনগুলো এবং তাঁর হাতে গড়া গেরিলা'গণ সেই উজ্জ্বলতম অবদানের সাক্ষ্য হিসেবে ইতিহাসের পাতায় জাজ্বল্যমান।  
১৯৭৫ সাল, স্বাধীন দেশের বয়স তখনো ৪ বছর হয়নি। ৬ই নভেম্বর (১৯৭৫) বাবার টেলিগ্রাম পেয়ে পারিবারিক কাজে বান্দরবানের রামু থেকে ঢাকায় এসেছিলেন হায়দার। সেদিন দুপুরে তিনি জেনারেল ওসমানী ও সেনাবাহিনীর কয়েকজন বন্ধুর সাথে দেখা করেন। একই দিন সন্ধ্যায় তাঁর প্রিয় সেক্টর কমান্ডার এবং নতুন সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল খালেদ মোশাররফের সাথে তার যোগাযোগ হয়। সে রাতে তাঁর সাথে বঙ্গভবনে যান।
তথাকথিত সিপাহী বিপ্লবের খবর পেয়ে ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর রাত ১২ টায় বঙ্গভবনে তথাকথিত সিপাহী বিপ্লবের খবর পেয়ে জেনারেল খালেদ কর্নেল হুদা ও কর্ণেল হায়দারকে সঙ্গে নিয়ে প্রথমে ব্রিগেডিয়ার নুরুজ্জামানের বাসায় যান। সেখান থেকে ভোর প্রায় ৩ টায় জেনারেল খালেদ কর্নেল হুদা ও কর্ণেল হায়দার শেরে বাংলা নগরে অবস্থিত ১০ম বেঙ্গল রেজিমেন্টে যান! উল্লেখ্য এই রেজিমেন্টের তৎকালীন কমান্ডিং অফিসার ছিলেন কর্নেল নওয়াজিস। 
৭ই নভেম্বর ভোরবেলা, কথিত সিপাহী বিদ্রোহের প্রবল ঢেউ ১০ম বেঙ্গলে এসে পড়ে। পরিস্থিতি কর্নেল নওয়াজিসের নিয়ন্ত্রনের বাইরে চলে যায়। আফিসার মেসে বসে খালেদ মোশাররফ,হায়দার  এবং হুদা সকালের নাস্তা করছিলেন।
এমন সময় মেজর জলিল (জাসদ নেতা ও মুক্তিযোদ্ধা মেজর জলিল নন), ক্যাপ্টেন আসাদ কয়েকজন উত্তেজিত সৈনিক নিয়ে মেসের ভিতর প্রবেশ করে। তার সাথে একজন হাবিলদারও ছিল।
ওই মেজর জলিল চিৎকার দিয়ে জেনারেল খালেদকে বলল-"আমরা তোমার বিচার চাই"!
জেনারেল খালেদ শান্তকণ্ঠে জবাব দিলেন," ঠিক আছে , তোমরা আমার বিচার করো। আমাকে জিয়ার কাছে নিয়ে চলো।"
স্বয়ংক্রিয় রাইফেল বাগিয়ে হাবিলদার চিৎকার করে বললো-"আমরা এখানেই তোমার বিচার করবো।"
ধীর স্থির জেনারেল খালেদ বললেন, " ঠিক আছে, তোমরা আমার বিচার করো"
খালেদ দু'হাত দিয়ে তার মুখ ঢাকলেন।
একটি ব্রাস ফায়ার।
মেঝেতে লুটিয়ে পড়লেন সেনাবাহিনীর চৌকস অফিসার বীর মুক্তিযোদ্ধা জেনারেল খালেদ মোশাররফ যার ললাটে ছিল বীরযোদ্ধার জয়টিকা, মাথায় ছিল মুক্তিযুদ্ধের বীর উত্তমের শিরোপা আর মাথার বাম পাশে ছিলো পাকিস্তানী গোলন্দাজ বাহিনীর কামানের গোলার গভীর ক্ষতচিহ্ন।
কামরার ভেতরেই গুলিবিদ্ধ হয়ে প্রাণত্যাগ করলেন আগরতলা ষড়যন্ত্রমামলার অন্যতম আসামী, মুক্তিযুদ্ধে ৮নং সেক্টরের সাবসেক্টর কমান্ডার  কর্নেল নাজমুল হুদা বীর বিক্রম ।
কর্নেল হায়দার ছুটে বেরিয়ে যান কিন্তু সৈনিকদের হাতে বারান্দায় ধরা পড়েন । উত্তেজিত সৈনিকদের হাতে তিনি নির্দয়ভাবে লাঞ্ছিত হন। তাকে সিপাহীরা কিল ঘুষি লাথি মারতে মারতে দোতলা থেকে নিচে নামিয়ে এনে ব্রাশ ফায়ারে হত্যা করে।”
এই কাপুরোষিত হত্যাকাণ্ডের কোনো বিচার আজো হয়নি। এমন জঘন্য ঘৃণ্য হত্যাকাণ্ডের বিচারে, সেনাবাহিনী ও বিচার বিভাগের কি কোন দায়ই নেই?
১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১, বিজয়ের মুহূর্তে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে ছিলেন মেজর হায়দার। যুদ্ধজয়ী মেজর হায়দার পরাজিত পাক বাহিনীর কর্মকর্তাদের নিরাপত্তা দিয়ে আত্মসমর্পন মঞ্চে নিয়ে যান, কিন্ত স্বাধীন দেশে নিজের সেনাসদস্যদের কয়েকজনই তাকে হত্যা করেছিলো। যিনি ছিলেন একজন “বীর উত্তম”।
জহিরুল ইসলাম, মেজর হায়দারের  গেরিলা বাহিনীর একজন বিখ্যাত ছাত্র। ইতিহাসের দায় মেটানোর স্বার্থে তিনি তুলে এনেছেন এই বীরগাঁথা।


EmoticonEmoticon