বুধবার, ১৬ মে, ২০১৮

ওরা ভার‌তে চ‌লে গে‌ছে, ওরা আছে আছে

১৯৮৭  সাল,ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার (বর্তমান বিজয়নগর উপজেলা) নিদারাবাদ গ্রাম, অপহৃত হয়েছিলেন  শশাঙ্ক দেবনাথ । তার আর খোঁজ মিলেনি। এরপরে ১৯৮৯ সাল, গ্রামের প্রায় আড়াই কিলোমিটার দূরে ধুপাজুড়ি বিল। নৌকায় করে সেই বিল দিয়ে প্রতিদিনই বিদ্যালয়ে যাওয়া-আসা ছিল ওই গ্রামের শিক্ষক আবুল মোবারকের।

একদিন বিকালে স্কুল থেকে ফেরার পথে বিলের পানিতে দুর্গন্ধযুক্ত তেল ভাসতে দেখেন। তিনি নৌকার গতিপথটা একটু ঘুরিয়ে নেন। হঠাৎ নৌকার তলদেশে কী একটা আটকে যাওয়ায় ঢুলে ওঠে তার নৌকা! এবার মাঝির বৈঠায় খটখট শব্দ! সন্দেহ হয় শিক্ষক আবুল মোবারকের। তার নির্দেশমতো মাঝি বৈঠা দিয়ে পানির নিচে খোঁচাখুঁচি করতেই ভেসে ওঠে ড্রাম!

তিনি ইউপি চেয়ারম্যান, মেম্বার ও এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিদের খবর দিলেন। ড্রাম খুলতেই স্তব্ধ সবাই। তিন তিনটি লাশ! সন্ধান চলে আরও। মিলেও যায়। আরেকটি ড্রামে টুকরো টুকরো করে রাখা আরও তিনজনের লাশ! লাশ ছয়টি শনাক্ত হলো।

এরা আর কেউ নন, একই গ্রামের নিরীহ শশাঙ্ক দেবনাথের স্ত্রী ও পাঁচ অবুঝ সন্তানের লাশ এগুলো। শশাঙ্কের স্ত্রী বিরজাবালা (৪৫), মেয়ে নিয়তি বালা (১৭), প্রণতি বালা (১০), ছেলে সুভাস দেবনাথ (১৪), সুপ্রসন্ন দেবনাথ সুমন (৫) ও দুই বছরের সুজন দেবনাথ।  শশাঙ্কের এক মেয়ে সুনিতী শ্বশুরবাড়ি থাকায় তিনি বেঁচে যান প্রাণে।

ব্রাম্মন বাড়ীয়ার বিরজা বালার জ‌মি দখল কর‌তে এক রা‌তে পু‌রো প‌রিবার‌কে নৌকায় তু‌লে নি‌য়ে মে‌রে ড্রা‌মে ভ‌রে বর্ষার বি‌লে পু‌তে ফে‌লে। দি‌নে প্রচার ক‌রে, বিরজা বালা প‌রিবার ভার‌তে চ‌লে গে‌ছে।

শশাঙ্কের সম্পত্তির ওপর লোভ ছিল পাশের গ্রামের কসাই তাজুল ইসলামের। এ কারণেই প্রথমে অপহরণ করে শশাঙ্ককে হত্যা করে সে। দুই বছর পর তার স্ত্রী-সন্তানসহ ছয়জনকে হত্যা করে ড্রামে চুন মিশিয়ে তাতে লাশ ভরে বিলে ফেলে দেওয়া হয়। সে সময় দুই বছরের শিশুকেও হত্যা করতে হাত কাঁপেনি খুনিদের।

অতঃপর খুনি ধরা পড়ে। খুনি কসাই তাজুলের প্রতি মানুষের ঘৃণা-ক্ষোভ এতটাই ছিল যে, তার ফাঁসি কার্যকরের পর ঘরে ঘরে মিষ্টি বিতরণ করা হয়। তার লাশ কারাগার থেকে বের করার সময় ক্ষুব্ধ মানুষ থুথু দিয়েছে। ছুড়ে মেরেছে জুতা।

এরকম ই একটি ট্রাজেডি হতে যাচ্ছিলো ২০১৮ সালের মার্চ মাসে,  ৩রা মার্চ ভোরবেলায় রাজধানীর শ্যামলীর ২ নং সড়‌কের ৮ কাঠা জ‌মির উপর সে‌মিপাকা ঘর ক‌রে থাকা মি‌হির বিশ্বাসের  প‌রিবার‌কে একদল সন্ত্রাসী ঝ‌টিকা অাক্রম‌ণে কালো গ্লা‌সের মাই‌ক্রো‌তে তু‌লে নেয়। ঘ‌রে অা‌গের দিন অাসা মি‌হির বিশ্বা‌সের এক মুস‌লিম বন্ধুও  ছিলেন ।

ছিলেন মি‌হির বিশ্বা‌সের বৃদ্ধা  ফুফু, তার স্ত্রী ও সন্তান। গাড়ী যা‌চ্ছিল বর্ডা‌রের দি‌কে অা‌রিচা রো‌ডে বা গা‌য়েব কর‌তে। অপহরণকারীরা শুনলো যে ছে‌লে স্কু‌লে। উল্লেখ্য তাদের আসার আগে মি‌হির বিশ্বা‌সের ছে‌লে ধানম‌ন্ডি বয়েজ স্কু‌লে চলে যায় ক্লাস করতে, তা সন্ত্রাসী‌দের জানা ছিল না। গাড়ী ফি‌রি‌য়ে ধানম‌ন্ডি ঘুর‌তে থা‌কে, স্কুল ছু‌টি হ‌লে ছে‌লে‌কে তু‌লে নি‌বে।

বাপার নেতা গোলাম রসু‌লের সা‌থে মি‌হির বিশ্বাস একটা প্র‌তিবাদ সমা‌বে‌শে যা‌বেন সকাল দশটায়। ফো‌নে না পে‌য়ে বাসায় যান গোলাম রসুল বাবু। তিনি দে‌খেন মি‌হির বিশ্বাসের  ঘ‌রের মালামাল ট্রা‌কে উঠ‌ছে। তা‌কে বাড়ী‌তে ঢুক‌তে দি‌চ্ছে না। বলা হচ্ছে,  মি‌হির বিশ্বাস প‌রিবারসহ রা‌তে ই‌ন্ডিয়া চ‌লে গে‌ছে।

স‌ন্দেহ হয় গোলাম রসু‌লের। তি‌নি ৯৯৯ তে ফোন কর‌লে পু‌লিশ অা‌সে। ডি‌সি এ‌সে পরিস্থিতি বু‌ঝে থানা থে‌কে ফোর্স পাঠা‌তে ব‌লেন । এক এসঅাই মি‌হির‌কে চিনতেন । সন্ত্রাসীরা এক যুব ম‌হিলা লী‌গের নেত্রীর নাম ব‌লে যার দাপ‌টে শ্যামলী এলাকা প্রক‌ম্পিত, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সা‌থে সখ্যতার কথা বলে । ব‌লে অা‌রেক লোকাল অাওয়ামী নেতার নাম।

এসঅাই  ছিলেন সাহসী,  ওসব হুমকির তোয়াক্কা  না করে তিনি বলেন, ও‌দের ফেরত না দি‌লে একটা‌কেও ছাড়‌বো না।  মাই‌ক্রো ফেরত অা‌সে, মি‌হির বিশ্বাস প‌রিবার বে‌চে যায়। মামলা হয়, অাসামীরা সব টাকা ও ক্ষমতার জো‌রে জা‌মিনও পে‌য়ে যায়।

অাওয়ামী সরকা‌রের সময় খোদ রাজধানী ঢাকা‌তে বাপা'র (বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন) যুগ্ম সম্পাদক, বু‌ড়িগঙ্গা বাচাও অা‌ন্দোল‌নের সে‌ক্রেটারী, গ্রীণ ভ‌য়ে‌সের উপ‌দেষ্টা, যুব ইউ‌নিয়ন সা‌বেক নেতা মিহির বিশ্বাস ও তার পরিবারের এহেন পরিস্থিতির অভিজ্ঞতা হলে  গ্রামে মফস্বলে অন্য সংখ্যালঘু‌দের বাচার উপায় কি ?

২০০১ সালের নির্বাচনের পর প্রথম সপ্তাহেই বরিশাল ও ফরিদপুর অঞ্চলে স্মরণকালের ভয়াবহ নির্যাতন হয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর। বিজয়ী বিএনপি-জামায়াত নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোটের নেতা-কর্মীরা সংখ্যালঘুদের উপর ভয়াবহ অত্যাচার, নির্যাতন ও নিপীড়ন শুরু করে।

তাদের ঘরবাড়ি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও উপাসনালয় ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও লুটতরাজ, শারীরিক হামলার মাধ্যমে জখম, হত্যা, ধর্ষণ, জোরপূর্বক ধর্মান্তর ও বিয়ে, জায়গা-জমি দখল, মিথ্যা মামলায় জড়ানো ইত্যাদি এমন কোনো অমানবিক ও পাশবিক নির্যাতন নেই যা তখন সংখ্যালঘুদের উপর পরিচালনা করা হয়নি। ২০০৬ ও পরবর্তীতে ২০০৮-এর নির্বাচনেও এ দেশের সংখ্যালঘুরা কমবেশি নির্যাতনের শিকার হয়েছে।

২৮শে ফেব্রুয়ারি, ২০১৩ ৷ যুদ্ধাপরাধের দায়ে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ফাঁসির রায় হওয়ার পর যখন আনন্দের বন্যায় ভেসে যাচ্ছে শাহবাগ, ঠিক তখনই দেশের বিভিন্ন প্রান্তে জামায়াত-শিবিরের সশস্ত্র ক্যাডাররা রাস্তায় নেমে পড়ে ধ্বংসযজ্ঞ চালানোর জন্য৷

কোনো কারণ ছাড়াই অবর্ণনীয় অত্যাচারের শিকার হলো অমুসলিম জনগোষ্ঠী৷ ভেঙে ফেলা হলো প্রতিমা, জ্বালিয়ে দেয়া হলো মন্দির৷
মাত্র ৯ দিন পরে চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে হামলা করেছে জামায়াত-শিবির৷ সর্বস্বান্ত হয়ে গেছে শিল পাড়ার মানুষগুলো৷ ঘর-বাড়ি, হাঁড়ি-পাতিল, কাপড়-চোপড়সহ সব কিছু জামায়াত-শিবির কর্মীদের ধরিয়ে দেয়া আগুনে পুড়ে ছাই ৷ 

খুলনার কয়রায়৷ প্রায় ২০ দিন পরে  আমাদী গ্রামের ধোপাপাড়ার মানুষরা জানিয়েছিলেন, জামাত-শিবির হামলা চালিয়ে তাঁদের সব কিছু লুট করে তারপর আগুনে পুড়িয়ে দিয়েছে বাড়িঘর৷ হিন্দু নারীদের একা পেয়ে মারধর করে ঘরে আটকে বাইরে থেকে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়েছিল এবং বাচ্চাগুলোকে আগুনে ছুঁড়ে ফেলার চেষ্টাও করেছিল হামলাকারীরা ৷

অমিয় দাশের চার বছরের বাচ্চা মেয়েটাকে আগুনে ছুঁড়ে মারতে গেলে ওর মা এসে কেড়ে নিয়ে বাঁচিয়েছিল৷ তারপর মা-কেই বেঁধে পেটানো হয়৷ বৃদ্ধা শ্বাশুড়িকেও ছাড়েনি জামায়াত-শিবির৷ হামলার সময় হামলাকারীরা চিৎকার করে বলেছে,
‘‘পুজা মারাও শুয়োরের বাচ্চারা,পুজা মারাও৷ পুজা করিয়ে দিচ্ছি তোদের জন্মের মতো ৷''
এরপর একে একে যশোরের অভয়নগর, পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জ ও ঠাকুরগাঁওয়ের রাণীশংকৈল ৷

তারপর দশম নির্বাচন, যশোর, সাতক্ষীরা, দিনাজপুর, লালমনিরহাট, গাইবান্ধা, সীতাকুণ্ড, বগুড়া, মাগুরা, সাতক্ষীরা ও সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জসহ বহু জায়গাতে আবার হয়েছিল নৃশংস হামলা, ।
হাজারাইলের ঋষি পাড়ার খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষেরা। যেখানে নির্বাচনে ভোট দেওয়ার কারণে স্বামী ও শ্বশুরকে বেধে রেখে চোখের সামনেই ধর্ষণ করেছে সদ্য বিবাহিত বউকে। শাশুড়ি ধর্মের বাপ ডেকেও বাচাতে পারে নাই ছেলের বউকে। ঠিক একই কায়দায় আরেক পরিবারের ছেলে ও বাবাকে বেধে রেখে ধর্ষণ করা হয় শাশুড়ি আর বউকে।

‘নৌকা’য় ভোট দেওয়ার ‘পাপের শাস্তি’ ভোগ করতে হয়েছে । নৌকায় ভোট না দেওয়ার অপরাধেও । ‘শুধুমাত্র জামায়াত শিবির বিএনপি নয়, পরবর্তী বিভিন্ন সময়ে দেখা গেছে, আওয়ামী লীগের প্ল্যাকার্ডধারীরাও আছেন নির্যাতকের তালিকাতে ।

১৬ই ডিসেম্বর, ২০১৪ ৷ রাঙামাটির নানিয়ারচর উপজেলায় আনারস বাগান নিয়ে বিরোধে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর অর্ধশতাধিক বাড়িঘর ও দোকানে অগ্নিসংযোগ করে একদল বাঙালি৷ বিভিন্নভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয় উপজেলার ৩টি গ্রামের মোট ৬১টি পরিবার ৷ রাঙামাটির ওই প্রত্যন্ত গ্রামগুলোতে পুড়িয়ে দেয়া হয় বাড়িঘর-দোকানপাট, নতুন তোলা আমন ধান ৷ এমনকি গুরুত্বপূর্ণ দলিল, সার্টিফিকেট এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রও রক্ষা করতে পারেনি অসহায় মানুষগুলো৷ অভিমানে, ক্ষোভে তাৎক্ষণিকভাবে সরকারি ত্রাণ ফিরিয়ে দেয় ! 

কিন্তু দুঃখজনক হলো, বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর ওপরে বিবেকবান মানুষ আশা করেছিল, সংখ্যালঘু সম্প্রদায় দুরু দুরু বুকে অনেক অপেক্ষাতে ছিল ! ভেবেছিলো, সকল নির্বাচনকালীন ও নির্বাচনের পরে সংগঠিত সকল অত্যাচার নির্যাতনের বিচার হবে, ২০১৪ প্রধানমন্ত্রীর  সেই দ্রুত ট্রাইবুনালে বিচারের আশ্বাস আলোর মুখ দেখেনি, আসছে আরেকটি নির্বাচন !

বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর কেবলমাত্র ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সালের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত সংখ্যালঘুদের দেশান্তরের ধারায় ছেদ পড়ে। কিন্তু ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু ও জাতীয় চারনেতাকে  নৃশংসভাবে হত্যার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের চরিত্র ১৮০ ডিগ্রি ঘুরিয়ে দিয়ে পাকিস্তানি ভাবধারায় দেশপরিচালনা শুরু হয়, শুরু হয় অমুসলিম বিতরণের প্রয়াস, যা কখনো সরবে কখনো নীরবে এখনো চলছে । 

সংগঠনের পাঠানো তথ্য ও গণমাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন তথ্য-প্রতিবেদনের আলোকে গোটা ২০১৭ সালে সারা দেশে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর ‘নির্যাতনের’ জাতীয় হিন্দু মহাজোট পরিসংখ্যান অনুসারে,  হত্যা ও লাশ উদ্ধার হয়েছে ১০৭টি, ২০১৬ সালে এই সংখ্যা ছিল ৯৮।

সম্পত্তি দখলের ঘটনা ঘটেছে ৮৬টি। এর মধ্যে ভূমি দখল ৬১টি, ঘরবাড়ি দখল ৫টি এবং দখলের তৎপরতার ঘটনা ঘটেছে ২০টি। উচ্ছেদে ঘটনা ঘটেছে ২১০টি, উচ্ছেদের তৎপরতার ঘটনা ঘটেছে ৩২৬টি, উচ্ছেদের হুমকি তিন হাজার ৪৩১টি, দেশ ত্যাগের হুমকি ৭১১টি।

মন্দিরে হামলা, ভাঙচুর, চুরি ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে ১৪১টি। বাড়িতে হামলা, ভাঙচুর, চুরি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে দুই হাজার ৩২৮টি। প্রতিমা ভাঙচুর ২০৯টি, প্রতিমা চুরি ২২টি, মন্দিরে পূজা বন্ধ করা হয়েছে ৩৬৬টি, অপহরণ ৩৮টি, অপহরণের চেষ্টা করা হয়েছে ৭টি। গণধর্ষণ হয়েছে ৪টি। জোরপূর্বক ধর্মান্তরিত বা ধর্মান্তরকরণের চেষ্টা এক হাজার ২৫১টি।

পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জে ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে গৌড়ীয় মঠের অধ্যক্ষ যজ্ঞেশ্বর রায়কে হত্যার মধ্য দিয়ে মন্দিরের পুরোহিত ও সেবায়েত হত্যাকাণ্ডের শুরু।  আইন ও সালিশ কেন্দ্র বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি ২০১৬ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল  । আটটি জাতীয় দৈনিক ও নিজেদের অনুসন্ধান থেকে প্রতিবেদনটি চূড়ান্ত করে আসক।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে ২০১৬ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত হিন্দুধর্মাবলম্বীদের ১৯২টি বাসস্থান, ২টি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, ১৯৭টি প্রতিমা, পূজামণ্ডপ ও মন্দিরে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ, ৫টি জমি ও বসতবাড়ি দখলের ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনায় ৬৭ জন আহত ও ৭ জন নিহত হন।

এর বাইরে পঞ্চগড়, গোপালগঞ্জ, টাঙ্গাইল, ঝিনাইদহ, পাবনা, যশোর ও বগুড়ায় মঠের অধ্যক্ষ ও সেবায়েতরা খুন হন। নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে যশোরের কেশবপুর থেকে প্রবীণ মল্লিক নামের একজন মন্দিরের সেবায়েত নিখোঁজ হওয়ার ১৩ দিন পর বাড়ির পাশ থেকে তাঁর লাশ উদ্ধার হয়।

এ ছাড়া ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের পর সহিংসতায় সাতক্ষীরার আশাশুনির চার গ্রামের ১০০ হিন্দু পরিবার ঘরছাড়া হয়। ২৯ মে কক্সবাজার সদরের খুরুশকুল ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে পরাজিত প্রার্থীর সমর্থকেরা হিন্দুধর্মাবলম্বীদের শতাধিক বাড়িঘর, মন্দির ভাঙচুর করাসহ পিটিয়ে ৩০ জনকে আহত করেন। ‘

ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানার অজুহাতে সংখ্যালঘু নির্যাতন সাম্প্রতিক সময়ে আরেক মাত্রা পেয়েছে, ভুয়া ফেসবুক অ্যাকাউন্ট তৈরি করে ধর্মীয় উত্তেজনা সৃষ্টি, তারপর দেশ দেখেছে রামুতে  হাজার বছরের ঐতিহ্যবাহক বৌদ্ধমন্দির ছাই হয়ে যেতে, দেখেছে  একই ধারায় যশোরের অভয়নগর ও পাবনার সাঁথিয়ায় ফেসবুকের ভুয়া অ্যাকাউন্টকে ভিত্তি করে নির্যাতন। দেখছে কয়েদখানাতে অমুসলিম ভিড় বাড়ছে !

ধর্মীয় অবমাননা’র ধুয়া তুলে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতনের সবচেয়ে বড় ঘটনাটি ঘটে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর উপজেলায়।

একই অভিযোগ তুলে নারায়ণগঞ্জে শিক্ষক শ্যামল কান্তি ভক্তকে সংসদ সদস্যের সামনে কান ধরে ওঠবস করানোর ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে শ্যামল কান্তির বিরুদ্ধে ধর্মীয় অবমাননার অভিযোগের কোনো সত্যতা পাওয়া যায়নি।

২০১২ সাল থেকে ২০১৭ পর্যন্ত ঘটে যাওয়া ১১টি ঘটনার বিশ্লেষণ করে এএলআরডি থেকে  ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা ও উচ্ছেদের একটি সারসংক্ষেপ তুলে ধরা হয়। বলা হয়, রাজনৈতিক ক্ষমতাসীন ও প্রভাবশালী ব্যক্তিরা নিজ স্বার্থের জন্য হামলা, হত্যা ও নির্যাতন করেছেন। প্রশাসন প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই নীরব ভূমিকা পালন করে। এসব ঘটনার বিচার না হওয়ার কারণে নিরাপত্তাহীনতা বাড়ছে ও ঘটনার পুনরাবৃত্তি হচ্ছে।

বেসরকারি সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন ফর ল্যান্ড রিফর্ম অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (এএলআরডি) গতবছরে ডিসেম্বরে আয়োজিত এক গোলটেবিলে ২০১২ সাল থেকে ২০১৭ পর্যন্ত ঘটে যাওয়া ১১টি ঘটনার বিশ্লেষণ করে এ কথা বলা হয়।

অর্থনীতিবিদ  অধ্যাপক আবুল বারকাত তাঁর ‘পলিটিক্যাল ইকোনমি অফ রিফরমিং এগ্রিকালচার-ল্যান্ড-ওয়াটার বডিস ইন বাংলাদেশ’ বইতে বলেছিলেন , প্রতিদিন গড়ে হিন্দু ধর্মাবলম্বী ৬৩২ জন দেশ ছাড়ছেন। তাঁর মতে, এ অবস্থা চলতে থাকলে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের অস্তিত্ব তিন দশক পর আর থাকবে না।

''চল মা, তোর ভগবান পুড়ছে, পুড়ুক
এই চন্দ্রমুগ্ধ মূর্খের উল্লাস থেমে গেলে
একাত্তরের মতো আবারও আমরা
ফিরে আসব আমাদের অগ্নিশুদ্ধ ঘরে''


EmoticonEmoticon