বাংলার বিদ্রোহী লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
বাংলার বিদ্রোহী লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

সোমবার, ৪ মার্চ, ২০১৯

গ্যাসের চাপ কম থাকলেও গ্যাসের দাম কিন্তু কম নয় গ্যাসের দাম নেয়া হয় দ্বিগুণেরও বেশি

সমাবেশে নেতৃবৃন্দ বলেন, রাজধানী ঢাকায় প্রতিদিন বেশ কিছু এলাকায় দিনের বেলায় পর্যাপ্ত চাপে চুলায় গ্যাস পাওয়া যায় না। রান্না করতে যে কী কষ্ট করতে হয় তা ভুক্তভোগীরা জানেন। গ্যাসের চাপ কম থাকলেও গ্যাসের দাম কিন্তু কম নয়। এক বার্নারের ক্ষেত্রে ৮৫ ঘনমিটার এবং দুই বার্নারের ক্ষেত্রে ৯২ ঘনমিটার গ্যাস ব্যবহারের দাম নেয়া হয়। কিন্তু তিতাস গ্যাস কোম্পানির হিসেব অনুযায়ী ১ বার্নারে গ্যাস সরবরাহ হয় ৪৫ ঘনমিটার এবং ২ বার্নারে গ্যাস সরবরাহ হয় ৪৭ ঘনমিটার। অর্থাৎ গ্যাসের দাম নেয়া হয় দ্বিগুণেরও বেশি। সারা দেশে সব স্থানে গৃহস্থালিসহ অন্যান্য শিল্প কারখানার জন্য গ্যাস সরবরাহ নাই। তারা সিলিন্ডারের গ্যাস ব্যবহার করে। কিন্তু সিলিন্ডার ব্যবসায়ীদের উপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ নাই। ফলে জেলায়, উপজেলায় বেশি দামে গ্যাস কিনতে বাধ্য হচ্ছে সাধারণ মানুষ। ১২ কেজির ১টি সিলিন্ডারে গ্যাস থাকে ১৬ ঘনমিটার। বর্তমানে সিএনজি পাম্পে প্রতি ঘনমিটার গ্যাস বিক্রি হয় ৩৮ টাকায়। তাহলে ১ সিলিন্ডার গ্যাসের দাম হওয়ার কথা ৬০৮ টাকা। কিন্তু বাজারে ক্রেতাদের কিনতে হচ্ছে ১১০০/ ১২০০ টাকায়। এসব বিষয়ে সরকার ও বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) নীরব। অথচ রেগুলেটরি কমিশন এর দায়িত্ব জনগণের স্বার্থ রক্ষা করা। কিন্তু কমিশন সরকার ও কোম্পানির স্বার্থে গ্যাসের দাম বাড়ানোর ক্ষেত্রে তৎপর। কোন যুক্তি ছাড়াই আবারও গ্যাসের দাম দুই চুলায় ৮০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১২০০ টাকা করার এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে গ্যাসের দাম বাড়ানোর পাঁয়তারা করছে। জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী ইতিমধ্যেই এই দাম বাড়ানোর কথা ঘোষণা করেছেন। অতীত অভিজ্ঞতা বলে, গণশুনানিতে সাধারণ মানুষের স্বার্থ রক্ষা না করে সরকারের দাম বাড়ানোর ইচ্ছাই কার্যকর করা হয়। ১১ মার্চ ২০১৯ গণশুনানিতে দাম বাড়ানোর এই প্রক্রিয়া শুরু হতে যাচ্ছে।
নেতৃবৃন্দ অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধির পাঁয়তারার বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়ে নিন্মোক্ত দাবিসমূহ উত্থাপন করেন।
১. গ্যাসের দাম বাড়ানোর পাঁয়তারা বন্ধ কর। বাসাবাড়িতে প্রিপেইড মিটার সরবরাহ কর।
২. চুলায় নিয়মিত সর্বক্ষণ পর্যাপ্ত গ্যাস দাও। সারাদেশে ন্যায্যমূল্যে গ্যাস সিলিন্ডার চাই।
৩. গ্যাস খাতে দুর্নীতি, অপচয় বন্ধ কর। দুর্নীতির সাথে জড়িতদের শাস্তি দাও।
৪. শতভাগ মালিকানা নিশ্চিত করে স্থলভাগে ও সমুদ্রে গ্যাস উত্তোলনে ব্যবস্থা নাও।
৫. বিদেশি কোম্পানিকে দেয়া গ্যাসক্ষেত্র ইজারা চুক্তি বাতিল কর। বেসরকারিভাবে এলএনজি আমদানির নামে সাধারণ মানুষের পকেট কেটে ব্যবসায়ী ও কমিশন ভোগীদের পকেট ভারী করার চক্রান্ত বন্ধ কর।
ছবি: গতকাল ঢাকার রাজপথে গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধির প্রতিবাদে বাসদের বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ

রবিবার, ২০ মে, ২০১৮

ভগবান অর্থ কি?

ভগ অর্থ হল যোনি। যা যে কোন মেয়েরই আছে। বান অর্থ হল যার মধ্যে আছে। তো ভগবান অর্থ হল যার শরীরে ভগ অর্থাৎ যোনি আছে সেই হল ভগবান। শব্দটির যেই অর্থ তাতে বুঝা যায় মেয়েরাই ভগবান। কিন্তু না। মেয়েদেরকে এখানে ভগবান চিন্তা করা হয়নি।
সাধারণত হিন্দুরা 'ভগবান এ নামটিকে ঈশ্বর-এর উদ্দেশ্যেই ব্যবহার করে থাকে। আসলে ভগবান, ঈশ্বর, পরমেশ্বর bv বা নিরাকার ব্ৰহ্ম এক কথা নয়। ভগবান হচ্ছে দেবরাজ ইন্দ্রের একটি কুখ্যাত উপাধি মাত্র।
ইন্দ্র ছিলেন শৌর্য-বীর্য ও জ্ঞান-বিজ্ঞানে অতি উন্নত এবং সর্বশ্রেষ্ঠ দেবতা। তাই তাঁর একনাম ‘দেবরাজ। কিন্তু দেবরাজ হলে কি হবে, তাঁর যৌন চরিত্র ছিলো নেহায়েত মন্দ। তিনি তাঁর গুরুপত্নী অহল্যার সতীত্ব নষ্ট করায় গুরুর অভিশাপে তাঁর সর্বাঙ্গে এক হাজার ‘ভগ (যোনি) উৎপন্ন হয় এবং তাতে ইন্দ্রের নাম 'ভগবান (ভগযুক্ত) হয়। অতঃপর উক্ত ভগ চিহ্নগুলো চক্ষুরূপ লাভ করলে ইন্দ্রের আর এক নাম হয় সহস্ৰলোচন। ভগবান শব্দটি হচ্ছে ইন্দ্রের অনৈতিক একটি স্মারকলিপি, নিন্দনীয় বিশেষণ। কিন্তু কুখ্যাত ভগবান আখ্যাটি পেয়েও তিনি তাঁর ব্যভিচারে ইস্তফা দেননি। কিকিন্ধ্যার (মধ্যভারত) অধিপতি রক্ষরাজের পত্নীর গর্ভে ‘বালী রাজের জন্ম হয়েছিলো ভগবান ইন্দ্রের ব্যভিচারের ফলে।

বুধবার, ১৬ মে, ২০১৮

আমি বেঁচে ছিলাম অন্যদের সময়ে

রাঢ়িখাল আগে থেকেই বিখ্যাত একটি গ্রাম । কারণ এখানে জন্মগ্রহণ করেছিলেন বিখ্যাত বিজ্ঞানী স্যার জগদীশ চন্দ্র বসু। ১৯৪৭ সালের ২৮ এপ্রিল (১৪ই বৈশাখ, ১৩৫৪ বঙ্গাব্দ), মুন্সিগঞ্জ জেলার বিক্রমপুরে রাঢ়িখালে অধ্যাপক হুমায়ন আজাদ জন্মগ্রহণ করেন। বাবা আবদুর রাশেদ এবং মা জোবেদা খাতুন।যদিও হুমায়ুন আজাদের জন্ম তাঁর নানাবাড়ি কামারগাঁও কিন্তু রাঢ়িখালকে হুমায়ুন আজাদ মনে করতেন তাঁর জন্মগ্রাম। গ্রামটি পানির গ্রাম নামেও পরিচিত ছিল। কারণ গ্রামে অনেকগুলো পুকুর ছিল। যা বর্ষাকালে পানিতে পরিপূর্ণ হয়ে উঠত। আর গ্রামটিকে সেই পানির ওপর ভাসতে থাকা কচুরিপানার মনে হতো।

পড়াশুনা শুরু গ্রামেই, পড়াশোনার শুরু নিজ গ্রামেই, স্যার জে. সি. বোস ইন্সস্টিটিউশন বিদ্যালয়কেই তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠ বিশ্ববিদ্যালয় বলে মনে করতেন হুমায়ুন আজাদ, যেখান থেকে মাধ্যমিক পাশ করেন ।
হুমায়ুন আজাদের আসল নাম ‘হুমায়ুন কবীর’। লেখার জন্য নাম বদল করে শপথপত্রের মাধ্যমে তা স্থায়ী করে নেন। তাঁর অন্যতম প্রণোদনা ছিল প্রথা-বিরোধিতা।

জীবন, জগত ও মানুষকে নিয়ে ভাবতে শুরু করেছিলেন স্বাধীনচেতা মানবতাবাদী হিসেবে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ধারক ও বাহক হয়ে নিজের মধ্যে জন্ম দিয়েছিলেন প্রগতিমুখী মুক্ত চিন্তাধারার দর্শনের। তিনি জীবনের সম্পূর্ণ রূপ, সৌন্দর্য, কদর্য-অসৌন্দর্যের রূপ চিত্রায়ণ করেছেন তাঁর লেখায়।

ধর্ম, প্রথা, প্রতিষ্ঠান ও সংস্কারবিরোধিতা, নারীবাদিতা, রাজনৈতিক বক্তব্য এবং নির্মম সমালোচনামূলক বক্তব্যের জন্য তিনি ১৯৮০'র দশক থেকে ব্যাপক পাঠকগোষ্ঠীর দৃষ্টি আর্কষণ করতে সক্ষম হয়েছিলেন।

কবি হুমায়ন আজাদ কবিতার গঠনরূপ সম্পর্কে লিখেছেন, “যা পুরোপুরি বুঝে উঠবো না, বুকে ওষ্ঠে হৃদপিণ্ডে রক্তে মেধায় সম্পুর্ণ পাবো না; আমি অনুপস্থিত হয়ে যাওয়ার পরও রহস্য রয়ে যাবে রক্তের কাছে, তাঁর নাম কবিতা; -যদিও আমি কবিতা লিখেছি, লিখেছি তাঁর ভাষ্য, এবং আজো গদ্যের এ-পরাক্রান্ত কালে, কবিতা লিখতে চাই”।

তিনি লিখেছেন -

‘তোমাকে মিনতি করি কখনো তুমি বাঙলাদেশের কথা তুলে কষ্ট দিয়ো না।
জানতে চেয়ো না তুমি নষ্টভ্রষ্ট ছাপ্পান্নো হাজার বর্গমাইলের কথা; তাঁর রাজনীতি,
অর্থনীতি, ধর্ম, পাপ, মিথ্যাচার, পালে পালে মনুষ্যমণ্ডলি, জীবনযাপন, হত্যা, ধর্ষণ,
মধ্যযুগের দিকে অন্ধের মতোন যাত্রা সম্পর্কে প্রশ্ন ক’রে আমাকে পীড়ন কোরো না;
আমি তা মুহূর্তও সহ্য করতে পারি না, -তাঁর অনেক কারণ রয়েছে’।

অথবা -
' আমার সন্তান আজো জন্মেনি। যদি জন্মে
সে কি জন্মেই পাবে স্বাধীনতা? আমার বাবার
স্বাধীনতা ব্যর্থ হয়েছিল আমার জীবনে।
আমার স্বাধীনতা কী রকম হবে আমার সন্তানের জীবনে
নাকি তাকেও বলতে হবে আমার মতোই কোনদিন
‘এতদিনে স্বাধীন হলাম।’

প্রথম উপন্যাস লিখলেন অনেকদিন পরে – ১৯৯৪ সালে। নাম ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইল। সামরিক শাসনের বিরোধিতা দিয়ে তার রাজনৈতিক লেখালিখির সূত্রপাত। ২০০৩ সালে প্রকাশিত আমরা কি এই বাঙলাদেশ চেয়েছিলাম গ্রন্থটি প্রধানত রাষ্ট্রযন্ত্রের ধারাবাহিক সমালোচনা। সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতিকেই তিনি মুক্ত মানবের মুক্ত সমাজ গড়ার পক্ষে অনুকূল বলে মনে করতেন।

সত্যনিষ্ঠ এ লেখক ২০০৪ সালের এই দেশের ক্রান্তিকালের সমাজ চিত্র তুলে ধরেন তাঁর 'পাকসার জমিন সাদবাদ' নামক বইয়ে। তার সাহস বুঝতে হলে সময়কাল তুলে ধরতেই হবে, যে সময় আজকের সময়ের জন্ম দিয়েছে !

বইটি এমন একটা সময় প্রকাশিত হয় যখন বিএনপি সমেত জামায়াত প্রথমবারের মতো ক্ষমতায়। স্বাধীন বাংলাদেশে এই ধর্মান্ধ-উগ্র জঙ্গি দল নিষিদ্ধ থাকলেও সেনা-স্বৈরশাসক জিয়াউর রহমান রাজনীতি করার জন্য বিদেশ থেকে গোলাম আযম, নিজামী গংদের নিয়ে আসেন এবং বিচারাধীন এগারো হাজার রাজাকারকে মুক্ত করে দেন।
তাছাড়া সংবিধান থেকে সেক্যুলারিজম বাদ দিয়ে পাকিস্তান ও সৌদি-পন্থী উগ্র ইসলামী চিন্তাধারা প্রবর্তন করে। এরপর আরেক সেনা-স্বৈরশাসক এরশাদ ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম করে ধর্মীয় উন্মাদনা আরও কয়েক গুন বাড়িয়ে দেন। হুমকির মুখে পড়ে সেক্যুলারিজম ও উদার বাঙ্গালী সংস্কৃতি।

এরপর তথাকথিত গণতান্ত্রিক আমলে খালেদা জিয়া আফগান যুদ্ধ ফেরত মাদ্রাসার শিক্ষক-ছাত্র ও ধর্ম ব্যবসায়ীদের হরকাতুল জিহাদ আল-ইসলামী নামক দলে গঠন করতে সুযোগ করে দেয়। আর জামায়াতের হাত ধরে এরপর গঠিত হয় ইসলামী সমাজ, হিজবুত তাওহীদ আর জেএমবি।

কিছুদিন পর আন্তর্জাতিক উগ্রপন্থী দল হিজবুত তাহরীর বাংলাদেশে শাখা খুলে বসে। সবার লক্ষ্য একই , ইসলামী সমাজ ব্যবস্থা কায়েম করা। তাই সমস্ত অমুসলিম, ধর্মনিরপেক্ষ গোষ্ঠী এবং শিয়া ও আহমদিয়াদের খুন করে আর ভয় দেখিয়ে তাড়িয়ে দেয়াকেই তারা তাদের লক্ষ্য পূরণের হাতিয়ার মনে করলো।

উর্দু ভাষার কবি হাফিজ জলন্ধরি রচিত পাকিস্তানের জাতীয় সঙ্গীত থেকে নেয়া “পাক সার জমিন জমিন সাদ বাদ” শিরোনামে লেখা উপন্যাসে মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী ও জামায়াতে ইসলামীর ধর্মকে ব্যবহার করার বিষয়টিকে সামনে নিয়ে আসাই তার জীবনে কাল হয়েছিল।

গ্রন্থাকারে প্রকাশের পূর্বে ২০০৩ সালে এটি দৈনিক ইত্তেফাকের ঈদ সংখ্যায় ছাপা হয়। দেলোয়ার হোসাইন সাঈদী জাতীয় সংসদে এই বইয়ের বিরুদ্ধে হুমকি দিয়েছিল। এছাড়াও সাঈদী ইত্তেফাক ভবনও পুড়িয়ে দেয়ার বিষয়ে মত দিয়ে উগ্রবাদীদের স্পষ্ট উস্কানি দেয়। হুমায়ুন আজাদ সম্পর্কে এর বাইরে, ওয়াজ মাহফিলে বা পার্টি ফোরামে, সাঈদী কি কি বলে থাকতে পারে সেটা অনুমান করে নেওয়া যায়।

বই এর ফ্লপ ভূমিকাটির একাংশ ছিল এইরূপ - ১৯৭১-এ মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে আমরা সৃষ্টি করি একটি স্বাধীন দেশ: বাংলাদেশ । কিন্তু প্রতিক্রিয়াশীল অন্ধকারের শক্তিরাশি আমাদের সামনের দিকে এগোতে দেয় নি, বরং নিয়ে চলছে মধ্যযুগের দিকে; বাংলাদেশ কে ক’রে তুলছে একটি অপপাকিস্তান। মৌলবাদ এখন দিকে দিকে হিংস্ররূপ নিয়ে দেখা দিচ্ছে; ত্রাসে ও সন্ত্রাসে দেশকে আতঙ্কিত ক’রে তুলছে।

মৌলবাদীরা তাঁর উপর ক্রোধান্বিত হয়ে ওঠে । রাজপথ থেকে একসময় ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটে সংসদে। মৌলবাদীরা প্রকাশ্যে তাঁকে হত্যার হুমকি দেয়। মিথ্যা বিভ্রান্তি ছড়িয়ে বলা হয়,
এই বইয়ে আল্লাহ, রাসুল (সাঃ), তার সমধর্মিনীদেরসহ জান্নাত-জাহান্নাম ও মুজাহিদীনদের নিয়ে ঠাট্টা, বিদ্রূপ, চরম অশ্লীল ও কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করা হয়েছে বইটিতে !
বইটির কিঞ্চিৎ অংশ -

''দেশ মুরতাদ ও ইহুদিতে ভ’রে গেছে, দেশ নাপাক হয়ে গেছে, একে আবার পাক করে তুলতে হবে। পাক পবিত্র স্তানকে ফিরিয়ে আনতে হবে। স্থান নেই ব’লে আমাদের দিলে শান্তি নেই; আমরা সব সময় স্তানের স্বপ্ন দেখি; স্তান থেকে খেজুর, বাশমতি চাউল এনে খাই, তাদের সঙ্গে ক্রিকেট খেলি, আমাদের লকলকে যুবতীগুলো তাদের দাড়িঅলা দাড়িছাড়া খেলোয়াড়দের চুমো খাওয়ার, দেহ দেয়ার জন্যে পাগল হয়, তাদের হোটলে গিয়ে চিৎ হয়।

তাদের দুই চারটি মেজর-লেফটেন্যান্ট জেনারেল মাসে মাসে ছফরে না এলে আমরা দিলে সুখ পাই না।এভাবে আমরা একটু পাকের পরশ পাই। নাপাক ওয়াতানে বাস করা শুয়োরের গোস্ত খাওয়ার থেকেও হারাম। নাউজুবিল্লা। আমরা একলা নই; আমাদের ভাইয়েরা আছে দুনিয়া জুড়ে, তাদের কাজ ক’রে চলেছে; কোথাও যদি কোন দালানের ওপর এরোপ্লেন ঝাঁপিয়ে পরে। যদি কোন গাড়ি হাসপাতালে হোটেলে ঢুকে সব কিছু চুরমাচুর ক’রে দেয়, যদি কোন প্রমোদকেন্দ্রে বোমায় ৩০০ জন মরে, তখন বুঝি সেটা আমাদের ভাইদের কাজ। এক অর্থে আমাদেরই কাজ। এটা জিহাদ। আমরা আমাদের কাজ ক’রে চলেছি; দেশ এক রকম দখলই করে ফেলেছি, পুরোপুরি করতে বাকি নেই''।

উল্লেখ্য যে, হুমায়ুন আজাদ থেকে শুরু করে পরবর্তীতে “ধর্ম অবমাননার দায়ে” খুন হওয়া ব্যক্তিরা সবাই জামায়াত-শিবিরের রাজনীতি ও ধর্ম ব্যবসার ঘোর-বিরোধী ছিলেন, বিজ্ঞানমনস্ক ছিলেন । সাধারণ মুসলমানদের সহমর্মীতা পাওয়ার জন্য এদের সম্পর্কে অনেক অসত্য তুলে ধরা হয় । এবং তারা তাতে সফল ই একরকম।

একই সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি বাংলা একাডেমীতে অনুষ্ঠিত বইমেলা থেকে বেরিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে নিজের বাসায় যাওয়ার পথে জমিয়াতুল মুজাহিদিনের জঙ্গিদের দ্বারা যে সন্ত্রাসী আক্রমণের শিকার হন তিনি, নৃশংসভাবে তার ঘরে কাঁধে গলায় কোপানো হয়।
ওই হামলার পর হুমায়ুন আজাদ ২২ দিন সিএমএইচে এবং ৪৮ দিন ব্যাংককে চিকিৎসারত ছিলেন।

তখনকার বিরোধী দলীয় নেত্রী বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাকে দেখতে সিএম এইচ এর উদ্দেশ্যে রওনা দিলে তৎকালীন প্রশাসন তার গাড়ি আটকে দেয়, গাড়ি থেকে নেমে দুই মাইল হেটে গিয়ে অধ্যাপক হুমায়ন আজাদকে দেখে এসেছিলেন শেখ হাসিনা ।

১৩ বছরেও শেষ হয়নি প্রথাবিরোধী লেখক,গবেষক, দার্শনিক ড. হুমায়ুন আজাদ হত্যা মামলার বিচার। জামিন অযোগ্য গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির পরও সাক্ষীরা আদালতে হাজির হচ্ছে না। এ কারণে মামলার বিচার কার্যক্রম শেষ করতে পারছে না রাষ্ট্রপক্ষ। সাক্ষীর অভাব কিংবা বিচারক ছুটিতে এমন নানা অজুহাতে এক যুগ পরেও দেশের এই আলোচিত হত্যাকাণ্ডের বিচার থমকে আছে। জার্মানিতে তাঁর মৃত্যু কীভাবে হয়েছিলো তাও রহস্যাবৃত।

‘পাক সার জমিন সাদ বাদ’ উপন্যাসের লেখকের ওপর হামলায় কারা ইন্ধন দিয়েছিলো, এমন জবাব নিজেই দিয়েছিলেন চাপাতি-কুড়ালের আঘাতে মারাত্মক জখমে ক্ষতবিক্ষত হলেন হুমায়ুন আজাদ। হামলার দীর্ঘ ২৪ দিন পর তাঁর জ্ঞান ফিরলে আক্রমণকারীদের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি তৎকালীন সংসদ সদস্য যুদ্ধাপরাধী দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীকেই ( বর্তমানে সাজাপ্রাপ্ত যাবজ্জীবন দণ্ডাদেশে কারান্তরীণ) প্রশ্ন করতে বলেছিলেন।

২০০৪ সালের ২৫ জানুয়ারি তৎকালীন সংসদ সদস্য কুখ্যাত রাজাকার দেলোয়ার হোসাইন সাঈদী জাতীয় সংসদে হুমায়ুন আজাদের পাক সার জমিন সাদ বাদ (২০০৩) বইটিকে ইসলাম বিরোধী আখ্যায়িত করে এক লম্বা বক্তব্য দেন এবং এ ধরনের লেখকদের লেখা বন্ধ করতে ব্লাসফেমি আইন প্রণয়নের জন্য তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।

২৩ মার্চ জ্ঞান ফিরলে ড. আজাদ এক সংবাদ সম্মেলনে দুটি সংবাদ পত্র ও সাঈদীকে তাঁর ওপর হামলার জন্য দায়ী করেন। সংবাদ সম্মেলনে তিনি তখন বলেছিলেন, ‘যেভাবে দৈনিক ইনকিলাব ও দৈনিক সংগ্রাম আমার বিরুদ্ধে লিখছিল এবং সাঈদী সংসদে আমার বিরুদ্ধে যা বলেছেন তা এই হামলার সঙ্গে তাদের সংযোগের ইঙ্গিত দেয়। জানিনা রাষ্ট্র এ বিষয়ে সংগ্রাম, ইনকিলাব বা সাঈদীর বিরুদ্ধে কি ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন’।

বিদেশে নিবিড় চিকিৎসার মাধ্যমে অধ্যাপক হুমায়ন আজাদ কিছুটা সুস্থ হন। এই সময় অভিজিৎ রায়ের সাথে তার কথা হয় ( যে অভিজিৎ রায়কেও আরো কয়েক বছর পরে ধর্মান্ধ জঙ্গিদের চাপাতিতে দেশে বেড়াতে এসে জীবন দিতে হয়েছিল) !

অভিজিতের জবানিতেই তুলে ধরা যাক - ''৩০শে জুলাই ২০০৪ তারিখে । এই প্রথমবার তার সাথে কথা (কিন্তু তখন কি জানতাম সে টাই হবে শেষ কথাও?)। মিনিট দশেকের কথোপকথোনে উঠে এসেছিল ধর্ম, রাজনীতি সমাজ নিয়ে নানা চালচিত্র। আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলাম তিনি কোন অ্যাসাইলামের কথা ভাবছেন কিনা। সে রকম হলে আমরা মুক্তমনার পক্ষ থেকে চেষ্টা করে দেখতে পারি।

অধ্যাপক আজাদ স্পষ্ট করে বললেন যে তিনি বাংলাদেশে থেকেই যুদ্ধ চালিয়ে যেতে চান। কোন ধরণের অ্যাসাইলামের কথা তিনি ভাবছেন না। বললেন, রিসার্চের কাজে এক বছরের জন্য জার্মানী যাচ্ছেন। তারপর আবার ফিরবেন। বললেন ‘জার্মানী গিয়ে তোমার সাথে যোগাযোগ করব ।’ কিন্তু সে যাওয়াই তার শেষ যাওয়া হল।
আমাকে অনন্ত প্রহেলিকার মধ্যে রেখে হারিয়ে গেলেন হুমায়ুন আজাদ। আমি ১৪ কিংবা ১৫ তারিখে তার মৃত্যুর খবর পাই। হতবিহবল অবস্থায় লিখলাম – এ লাশ আমরা রাখবো কোথায়, তেমন যোগ্য সমাধি কই?

জার্মান সরকার তাকে গবেষণা বৃত্তি প্রদান করে। ২০০৪-এর ৭ আগস্ট জার্মান কবি হাইনরিখ হাইনের ওপর গবেষণা বৃত্তি নিয়ে জার্মানি যান। ২০০৪ সালের ১২ আগস্ট ফ্ল্যাটের নিজ কক্ষে তাকে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়।

উল্লেখ্য, আলোচিত এই মামলাটি বর্তমানে ঢাকার চতুর্থ অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালতে বিচারাধীন। মামলায় ৫৮ সাক্ষীর মধ্যে এ পর্যন্ত তদন্তকারী কর্মকর্তাসহ ৩৮ জন সাক্ষ্য প্রদান করেছেন। তবে গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী দুই ডাক্তারসহ ২০ জন বাকী রয়েছেন। তারা সাক্ষ্য দিলেই মামলার কার্যক্রম শেষ করবে রাষ্ট্রপক্ষ।

পরে জার্মানির মিউনিখে একই বছরের ১২ আগস্ট তাকে তার ফ্ল্যাটে মৃত পাওয়া যায় । অধ্যাপক হুমায়ুন আজাদের লাশ দীর্ঘদিন জার্মানির মিউনিখে একটি মরচুয়ারিতে পড়ে ছিল। একজন বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাপকের মরদেহ ফেরত আনার জন্য তৎকালীন খালেদা জিয়া সরকারের দিক থেকে উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। শিক্ষক সমিতি ও পরিবারের ব্যবস্থাপনায় তাঁর লাশ ফেরত আনা হয়।

মামলার অভিযোগপত্রভুক্ত আসামিরা হলেন, জেএমবির শুরা সদস্য মিজানুর রহমান ওরফে মিনহাজ ওরফে শফিক, আনোয়ার আলম ওরফে ভাগ্নে শহিদ, সালেহীন ওরফে সালাহউদ্দিন, হাফিজ মাহমুদ ও নূর মোহাম্মদ ওরফে সাবু। এদের মধ্যে আসামি নুর মোহাম্মদ ওরফে সাবু পলাতক।

তার লেখা দিয়েই শুরু তাকে দিয়েই শেষ করছি, কিংবা সেই বিখ্যাত চুম্বকাংশ ''“আমি জানি সব কিছু নষ্টদের অধিকারে যাবে/নষ্টদের দানব মুঠোতে ধরা পড়বে মানবিক সব সংঘ পরিষদ”!

অর্থাৎ স্যার হয় এটা হবে নাহলে ওটা হবে, একটা কিছু হবে কিন্তু কোনটা হবে স্যার ?

''তুমি আসবে ব'লে, হে স্বাধীনতা, সাকিনা বিবির কপাল ভাঙলো, সিঁথির সিঁদুর মুছে গেল হরিদাসীর''

জন্ম ১৯৪৭ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি, খুলনায় নানার বাড়িতে। তাঁর বাবার নাম সৈয়দ মাহবুবুল হক এবং মায়ের নাম রওশন হাসিনা। ''“আমার মা মাস্টার দা সূর্যসেন, প্রীতিলতাদের দলে কাজ করেছেন। তার মুখে শুনে প্রীতিলতাকে আমি ছোটবেলা থেকেই অনুভব করে আসছি''।
তাঁর বাবার নাম সৈয়দ মাহবুবুল হক, যশোর মাইকেল মধুসূদন মহাবিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারিক ছিলেন, প্রচুর পড়াশুনা করা লোক ছিলেন, অনেকগুলি ভাষাও জানতেন, বাংলা ছাড়াও ইংরেজি, উর্দু, হিন্দী, ফারসি, সংস্কৃত ও আরবী, এবংবা ভাষায় তিনি গল্প বলতে পারতেন, কবিতা আবৃতি করতে জানতেন, কথা বলতে পারতেন  । 
১১ সন্তানের মধ্যে প্রিয়ভাষিণী সবার বড়। ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণীর নানা অ্যাডভোকেট আব্দুল হাকিম কংগ্রেস করতেন। ১৯৫৪ সালে যুক্ত ফ্রন্টের শাসনকালে স্পিকার হয়েছিলেন তিনি। ১৯৫২ সালে তার নানা সুপ্রিম কোর্টে কাজ করার জন্য ঢাকা চলে আসেন। প্রিয়ভাষিণীও নানার পরিবারের সঙ্গে ঢাকায় আসেন। ভর্তি হন টিকাটুলির নারী শিক্ষা মন্দিরে। পরবর্তীতে নানা মিন্টু রোডের বাসায় চলে এলে প্রিয়ভাষিণী ভর্তি হন সিদ্ধেশ্বরী গার্লস স্কুলে। তখন শহীদ জননী জাহানারা ইমাম ছিলেন ওই স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা। তিনি খুলনার পাইওনিয়ার গার্লস স্কুল থেকে এসএসসি এবং খুলনা গার্লস স্কুল থেকে এইচএসসি ও ডিগ্রি পাস করেন।
ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী কিছুদিন স্কুলে শিক্ষকতাও করেছেন। তিনি ইউএনডিপি, ইউএনআইসিইএফ, এফএও, কানাডিয়ান দূতাবাস প্রভৃতি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেছেন। শেষ বয়সে এসে নানা শিল্পকর্ম সৃষ্টিতে মনোনিবেশ করেন ।
দামী জিনিসের পরিবর্তে সহজলভ্য জিনিস দিয়ে কিভাবে ঘর সাজানো যায় তার সন্ধান করা থেকেই তাঁর শিল্পচর্চার শুরু। নিম্ন আয়ের মানুষেরা কিভাবে অল্প খরচে সুন্দরভাবে ঘর সাজাতে পারে সে বিষয়গুলো তিনি দেখিয়েছেন। ঝরা পাতা, মরা ডাল, গাছের গুড়ি দিয়েই মূলত তিনি গৃহের নানা শিল্প কর্মে তৈরি করতেন।
একাত্তরে  তিন ছেলের মা প্রিয়দর্শিনীর   বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটে, তারপর মুক্তির জন্যে যুদ্ধে ঝাঁপ দেয় বাংলাদেশ, মানুষ আহুতি দেয় জীবন ও সম্ভ্রম, কেউ দু ই,  একাত্তরের দুঃসহ অন্ধকারের চাদর যখন তার জীবনকে মুড়িয়ে ফেলেছিলো, যুদ্ধ শেষে কেউ ছিলোনা তার পাশে, না স্বদেশ না স্বজন, উনিশ শ বাহাত্তরে  তিন ছেলে সমেত তাকে বিয়ে করে করেন রাজঘাট যশোরের পাটকলের লেবার অফিসার আহসানউল্লাহ আহমেদ, এই দুজন সাহসী মানুষ নিজেদের খুঁজে পেয়েছিলেন,ব্যক্তিজীবনে দুজনে খুব ভালো রবীন্দ্রসংগীত গাইতেন ।
সবসময় কপালে বড় একটি গোল টিপ, কখনো আবার কপালে সবুজ জমিনের মাঝে লাল সূর্য্য, দেশকে ঐতিহ্যকে ধরে রাখতেন তথাকথিত রক্ষণশীল ও মৌলবাদীদের সমালোচনা ভ্রূকুটির তোয়াক্কা না করে !
বসুন্ধরা পূর্বাচলে তার বাসা ।  মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে অনেক পরে স্বীকৃতি পেয়েছিলেন, সেটা ২০১৬ সালে, মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি দিয়ে ২১ জুলাই গেজেট জারি করেছিলেন সরকার। রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ের উপ-সচিব মো. মাহবুবুর রহমান ফারুকী এতে স্বাক্ষর করেন। জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলের (জামুকা) ৩৫তম সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রিয়ভাষিনীকে মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি দেওয়া হয়। জানা গেছে  তিনি মুক্তিযোদ্ধার ভাতা পাননি ।
২০১৭ সালের ৮ ই নভেম্বর  ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিনী বাথরুমে পড়ে গিয়ে পায়ে গোড়ালিতে ব্যাথা পেয়েছিলেন। পরে পায়ের অবস্থা আরো খারাপ হয়, এছাড়া শিল্পী ডায়াবেটিস, ব্লাড প্রেশার, হৃদরোগসহ বেশ কয়েকটি অসুখে নানা জটিলতায় ভুগেছেন । এ অবস্থায় তার মাইল্ড স্ট্রোক হয়ে গেছে। ।তার আরও উন্নত চিকিৎসা তার দরকার ছিল । দেশে সম্ভবপর চিকিৎসা করিয়েছেন তাঁর ছেলে মেয়েরাই ।  সরকারের উচ্চ পর্যায়ের অনেকেরই তাকে দেখতে যাওয়া উচিত ছিল। উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশ পাঠানোর ব্যাপারে সরকারের উচ্চমহল থেকে কোন উদ্যোগ নেয়া হয়নি।
মুক্ত মানসিকতার চর্চার জন্যই স্বাধীন বাংলাদেশ চেয়েছিলেন, মুক্তমন ও প্রগতিশীল মানুষদের হত্যার বিরুদ্ধে ছিলেন সোচ্চার, ধর্মীয় গোড়ামির বিরুদ্ধেও দৃঢ় অবস্থান ছিল তাঁর, যুদ্ধাপরাধের বিচারের পক্ষে জনমত তৈরিতে ব্যাপক ভূমিকা রয়েছে একাত্তরের এই সম্ভ্রম আহুতি দেয়া মুক্তিযোদ্ধার, যিনি  ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির কেন্দ্রীয় কমিটিতে সক্রিয় থেকেছেন । বিভিন্ন সময়ে তাকে হত্যার হুমকি দেয়া হয়েছিল । 

যুদ্ধশেষে শেখ মুজিবুর রহমান ধর্ষিতা নারীদের সমাজে পুনর্বাসনের জন্য কীভাবে তাদের ‘বীরাঙ্গনা’ উপাধিতে ভূষিত করেন সে কথা শুনিয়েছেন ডা. জিওফ্রি ডেভিস। কিন্তু সেই দৃষ্টিভঙ্গি সেভাবে কাজে লাগেনি। পকিস্তানি সেনাদের দ্বারা নির্যাতন ও গর্ভধারণের পর স্বাধীন দেশের   ওই নারীরা সমাজের চোখে পুরোপুরি অস্পৃশ্য হয়ে যান।
বাংলাদেশে গণহত্যার বিচার’ শীর্ষক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে  গণহত্যাবিষয়ক বিশেষজ্ঞ হেলেন জারভিস বলেছিলেন , ''যুদ্ধের বিশেষ অস্ত্র হিসেবে ধর্ষণকে পদ্ধতিমূলকভাবে ব্যবহার করার ঘটনা  বিশ্বে প্রথম।
“২৬ মার্চ ১৯৭১,বিভিন্ন স্কুল,কলেজ,বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মেয়েদের ধরে আনা হয়।আসা মাত্রই সৈনিকরা উল্লাসে ফেটে পড়ে।তারা ব্যারাকে ঢুকে প্রতিটি যুবতী,মহিলা এবং বালিকার পরনের কাপড় খুলে সম্পূর্ণ উলঙ্গ করে লাথি মেরে মাটিতে ফেলে ধর্ষণে লিপ্ত হতে থাকে।রাবেয়া খাতুন নামক একজন ছিল ঐ স্থানে  কমরত সুইপার । ড্রেন পরিস্কার করতে করতে এই ঘটনা প্রত্যক্ষ করেন।পাকসেনারা ধর্ষন করেই থেকে থাকেনি,সেই মেয়েদের বুকের স্তন ও গালের মাংস কামড়াতে কামড়াতে রক্তাক্ত করে দেয়,মাংস তুলে নেয়।
মেয়েদের গাল,পেট,ঘাড়,বুক,পিঠ ও কোমরের অংশ তাদের কামড়ে রক্তাক্ত হয়ে যায়। এভাবে চলতে থাকে প্রতিদিন।যেসব মেয়েরা প্রাথমিকভাবে প্রতিবাদ করত তাদের স্তন ছিড়ে ফেলা হত,যোনি ও গুহ্যদ্বা্রের মধ্যে বন্দুকের নল,বেয়নেট ও ধারালো ছুরি ঢূকিয়ে হত্যা করা হত।বহু অল্প বয়স্ক বালিকা উপুর্যুপুরি ধর্ষণে নিহত হয়।এর পরে লাশগুলো ছুরি দিয়ে কেটে বস্তায় ভরে বাইরে ফেলে দেয়া হত।হেড কোয়ার্টারের দুই,তিন এবং চারতলায় এই্ মেয়েদের রাখা হত,মোটা রডের সাথে চুল বেঁধে।এইসব ঝুলন্ত মেয়েদের কোমরে ব্যাটন দিয়ে আঘাত করা হত প্রায় নিয়মিত,কারো কারো স্তন কেটে নেয়া হত,হাসতে হাসতে যোনিপথে ঢুকিয়ে দেওয়া হত লাঠি এবং রাইফেলের নল।
কোন কোন সৈনিক উঁচু চেয়ারে দাঁড়িয়ে উলঙ্গ মেয়েদের বুকে দাঁত লাগিয়ে মাংস ছিড়ে নিয়ে উল্লাসে ফেটে পড়ত,কোন মেয়ে প্রতিবাদ করতে গেলে তখনই হত্যা করা হত।কোন কোন মেয়ের সামনের দাঁত ছিল না,ঠোঁটের দু’দিকের মাংস কামড়ে ছিড়ে নেয়া হয়েছিল,প্রতিটি মেয়ের হাতের আঙ্গুল ভেঙ্গে থেতলে গিয়েছিল লাঠি আর রডের পিটুনিতে।কোন অবস্থাতেই তাঁদের হাত ও পায়ের বাঁধন খুলে দেয়া হত না,অনেকেই মারা গেছে ঝুলন্ত অবস্থায়।“
২৭ মার্চ,১৯৭১,ঢাকা মিটফোর্ড হাসপাতালের লাশ ঘর থেকে লাশ ট্রাকে তুলতে গিয়ে একটি চাদর ঢাকা ষোড়শী মেয়ের লাশ দেখতে পান পরদেশী।সম্পূর্ণ উলঙ্গ লাশটির বুক এবং যোনিপথ ছিল ক্ষত বিক্ষত,নিতম্ব থেকে টুকরো টুকরো মাংস কেটে নেয়া হয়েছিল।
২৯ মার্চ শাখারীবাজারে লাশ তুলতে গিয়ে পরদেশী সেখানকার প্রায় প্রতিটি ঘরে নারী,পুরুষ,আবাল বৃদ্ধ বনিতার লাশ দেখতে পান,লাশগুলি পচা এবং বিকৃত ছিল।বেশিরভাগ মেয়ের লাশ ছিল উলঙ্গ,কয়েকটি যুবতীর বুক থেকে স্তন খামচে,খুবলে তুলে নেয়া হয়েছে,কয়েকটি লাশের যোনিপথে লাঠি ঢোকান ছিল।মিল ব্যারাকের ঘাটে ৬ জন মেয়ের লাশ পান তিনি,এদের প্রত্যেকের চোখ,হাত,পা শক্ত করে বাঁধা ছিল,যোনিপথ রক্তাক্ত এবং শরীর গুলিতে ঝাঝরা ছিল।
ঢাকা পৌরসভার সুইপার সাহেব আলীর ভাষ্যে ২৯ মার্চ তার দল একমাত্র মিটফোর্ড হাসপাতাল থেকে কয়েক ট্রাক লাশ উদ্ধার করে।তিনি আরমানীটোলার এক বাড়িতে দশ এগারো বছরের একটি মেয়ের লাশ দেখতে পান,সমস্ত শরীর ক্ষতবিক্ষত,জমাট বাঁধা ছোপ ছোপ রক্ত সারা গায়ে,এবং তার দেহের বিভিন্ন স্থানের মাংস তুলে ফেলা হয়েছিল।ধর্ষণ শেষে মেয়েটির দুই পা দু’দিক থেকে টেনে ধরে নাভি পর্যন্ত ছিড়ে ফেলা হয়েছিল (ডোম পরদেশীর বর্ণনা )
৭১ এ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়কে পাকবাহিনীর একটি বিরাট ক্যাম্পে পরিণত করা হয়।এখানে বন্দী ছিলেন রাজশাহী মেডিকেল কলেজের ছাত্রী মঞ্জিলা এবং তার দুই বোন মেহের বানু এবং দিলরুবা।।তাদেরকে আরো ৩০ জন মেয়ের সাথে একটি কক্ষে তালাবদ্ধ করে রাখা হয়,সার্বক্ষণিক প্রহরায় থাকতো দুজন সশস্ত্র গার্ড।এই মেয়েগুলোকে ওই ক্যাম্পের সামরিক অফিসারদের খোরাক হিসেবে ব্যবহার করা হত।প্রতি সন্ধ্যায় নিয়ে যাওয়া হত ৫/৬ জন মেয়েকে,এবং ভোরবেলা ফিরিয়ে দেয়া হত অর্ধমৃত অবস্থায়।প্রতিবাদ করলেই প্রহার করা হত পূর্বোক্ত কায়দায়।একবার একটি মেয়ে একজন সৈনিকের হাতে আঁচড়ে দিলে তখনই তাকে গুলি করে হত্যা করা হয়।
কুমারখালির বাটিয়ামারা গ্রামের মোঃ নুরুল ইসলামের বর্ণনায় একটি আপাত-অদ্ভুত ঘটনা জানা যায়।ঐ এলাকার একজন রাজাকারকে একদিন দুজন পাকসেনা মেয়ে যোগাড় করে দিতে বললে সে তাদেরকে তার বাড়ি নিয়ে যায়,খবর পেয়ে বাড়ির সব মেয়ে পালিয়ে গেলেও তার বৃদ্ধা মা বাড়িতে থেকে যান।সৈনিক দু’জন রাজাকারটির বুকে রাইফেল ঠেকিয়ে পালাক্রমে তার মাকে ধর্ষণ করে।এর পরে রাজাকারটির আর কোন খোঁজ পাওয়া যায়নি।
দেশে ফেরার পর এক ভাষণে বঙ্গবন্ধু  বলেছিলেন ' দেশের জন্য তারা ইজ্জত দিয়েছে, মুক্তিযোদ্ধার চেয়ে তাদের অবদান কম নয়, বরং কয়েক ধাপ উপরে, যা আপনারা সবাই জানেন, বুঝিয়ে বলতে হবেনা। তাই তাদের বীরাঙ্গনার মর্যাদা দিতে হবে, যথারীতি সন্মান দেখাতে হবে। আর সেই স্বামী বা পিতাদের উদ্দেশ্যে বলছি যে আপনারাও ধন্য। কেননা এমন ত্যাগী ও মহৎ স্ত্রীর স্বামী বা কন্যার পিতা হয়েছেন। '
কিন্তু যুদ্ধ আমাদের ভূখণ্ড দিয়েছে, আমাদের রক্ষণশীল, বদ্ধ অন্ধ সংস্কার পূর্ণ মন মানসিকতা পাল্টাতে পারেনি, এখনো আমরা একজন ধর্ষিতাকে বাঁকা চোখে দেখি, মন থেকে তাদের গ্রহণ করতে পারিনা, তাদেরকে নিজের পরিবারে ঠাঁই দেয়ার চিন্তা তো দূরের কথা,  ধর্ষণকারীকে ঘৃণা করতে জানে তাদের উপযুক্ত শাস্তি দিতে চায় আঙুলে গোনা কিছু মানুষ !
একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধে সম্ভ্রম আহুতি দেয়া ধর্ষিতা নারীদের স্বাধীন দেশে, সমাজে ও পরিবারে  দেখা হতো অসন্মানের চোখে। নিম্নবিত্ত মধ্যবিত্ত উচ্চবিত্ত পরিবারভুক্ত অধিকাংশ নারী তলিয়ে গেছেন আত্মমর্যাদার অভাবে, শিকার হয়েছেন ধর্মান্ধতার-অশিক্ষা-কুশিক্ষার-অপমানিত জীবন-জীবিকার অনলে, গ্রাম-গ্রামান্তরে ছড়িয়ে থাকা নির্যাতিতা নারীরা বিগত চার যুগ ধরে তাদের জীবন কাটিয়ে এখন অধিকাংশই  মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেছেন। সারা জীবন ধরে লাঞ্ছণা-গঞ্জনা সয়ে সমাজচ্যুত হয়ে অনাহারে থেকে জীবনের শেষ প্রান্তে চলে এসেছেন। অনেকেই সমাজের চোখে যা পাপ, তা  গোপন করে টিকে থেকেছেন বেঁচে থাকার সাথে সন্ধি করে, যেন কত না সীমাহীন পাপ তারা করেছিলেন ।
উল্লেখ্য, মুক্তিযুদ্ধের সময় ধর্ষণ ও গণধর্ষণকে গণহত্যার শামিল বলে উল্লেখ করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।
মহান মুক্তিযুদ্ধে সকল নির্যাতিতা নারীদের জন্য অনুপ্রেরনার নাম ভাস্কর ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিনী,  সমস্ত অলিখিত ট্যাবু  ভেঙে শিক্ষিত সমাজে সাহসী বীরাঙ্গনা ও মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন নিজেকে এমন নামটি একটিই । ১৯৯৯ সালে প্রথম জনসমক্ষে আসা বীরাঙ্গনা নারী হলেন মানবাধিকার কর্মী ভাস্কর্য শিল্পী ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিনী। তিনি বলেছিলেন, ''যুদ্ধের শিকার হয়েছে যে নারী তার তো নিজের কোনো লজ্জা নেই''।  তিনি আশা করেছিলেন; তার দেখা-দেখি হয়তো অনেকেই মুখ খুলবেন কিন্তু তিনি তেমন কাউকে পাশে পাননি।
একাত্তরের সেই ভয়াবহ ধর্ষণ সম্পর্কে একমাত্র জবানবন্দী -দানকারী  ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী তার সাক্ষাৎকারে জানান, “রাতে ফিদাইর (উচ্চ পদস্থ পাকিস্তানি সেনা কর্মকর্তা) চিঠি নিয়ে ক্যাপ্টেন সুলতান, লে. কোরবান আর বেঙ্গল ট্রেডার্সও অবাঙালি মালিক ইউসুফ এরা আমাকে যশোরে নিয়ে যায় । যাওয়ার পথে গাড়ির ভেতরে তারা আমাকে ধর্ষণ করে। নির্মম, নৃশংস নির্যাতনের পর এক পর্যায়ে আমার বোধশক্তি লোপ পায়। ২৮ ঘণ্টা চেতনাহীন ছিলাম”। (একাত্তরের দুঃসহ স্মৃতি, সম্পাদনা শাহরিয়ার কবির)
''আমি উর্দুতে একবার ইংরেজিতে একবার বলছিলাম প্লিজ আমাকে হত্যা কর।  আমাকে রেপ কর  তবে আমাকে হত্যা কর। তবু আমাকে ক্যাম্পে নিয়ে যেও না। তারপরেও ক্যান্টনমেন্টে তারা আমাকে নিয়ে গেল''।
স্মৃতিচারণে উল্লেখ করেছেন ''আমার মাও একজন প্রগতিশীল মহিলা ছিলেন। বলা চলে তিনি নিজেও একজন মুক্তিযোদ্ধা। কারণ তিনি ছোট্ট আকারে একটা হোম খুলে ছিলেন । মুক্তিযোদ্ধা দের খাবারের দাওয়াত দেওয়ার জন্য। আমার মা আর তার বান্ধবী মিলে যশোরের রেল রোডে একটা বাড়িতে চিলে কোঠায় মুক্তিযোদ্ধাদের নাস্তা দিতেন। তিনি তার ছেলেকে মুক্তিযুদ্ধে পাঠিয়েছিলেন। আমার ভাই শিবলি কোন দিন বিয়ে করেনি সেও পূর্ণদমে মুক্তিযুদ্ধ যোগ দিল টেলিফোনে চাকরি করাকালীন ।
তখন একটা সুবিধা ছিল অনেক কমুনিকেশন তার ছিল। ফলে সে অনেক খবর আনতে পারবে । ডিনামাইড আনা ও এগুলোতে লিড দেওয়ার মধ্যে আমার ভাই শিবলী একজন ছিল। বীর মুক্তিযোদ্ধাদের লিস্টেও তার নাম আছে। যুদ্ধের বিষয়ে তারা ঠিক ছিল কিন্তু আমার বিষয়ে তারা একটু নড়ে গিয়েছিল যে,আমাকে বাসায় গ্রহণ করা যাবে না। খুব অবাধে বাড়িতে যেতে পারিনি আসলে। আমার নিজের মধ্যেও সংকোচ ছিল যে, আসলে আমি বিশাল কলঙ্কের বোঝা নিয়ে কারো সামনে সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারতাম না যদিও আমার মা কোন কালেই এসব নিয়ে প্রশ্ন করেননি''।
''অপরিণত বয়সে যে বিষয়টি আমি সবার কাছ থেকে লুকাতে চেয়েছিলাম; ভাবতাম আমার ছোঁয়া লাগলে সব কিছু অপবিত্র হয়ে যাবে। এই সমাজ আমাকে আঙুল তুলে কথা বলছে আর আমি সেই অপমান গুলো সহ্য করছি। আমার মনে হয় আমার সেই দিনের অপমান-ই আমাকে অনুপ্রাণিত  করছে।''
''মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তীতে সমাজ অনেক ভাবে তাদের নিগৃহীত হতে হয়েছিল। বলা চলে তাদেরকে নতুন করে যুদ্ধ শুরু করতে হয়েছিল। সমাজ পরিবার তাদের গ্রহণ করে নি। অনেকে গ্রহণ না করার জন্য হিন্দু থেকে মুসলিম হয়ে বিয়ে করেছিলেন। তবে অনেক মুক্তিযোদ্ধাও বীরাঙ্গনাদের বিয়ে করেন''।
সুসান ব্রাউনি মিলার তার গ্রন্থের ৮৩ পাতায় উল্লেখ করেছেন, কোন কোন মেয়েকে পাকসেনারা এক রাতে ৮০ বারও ধর্ষণ করেছে। ওয়ার ক্রাইমস ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটির “যুদ্ধ ও নারী” গ্রন্থ থেকে জানা যায়, এক একটি গণ-ধর্ষণে ৮/১০ থেকে শুরু করে ১০০ জন পাকসেনাও অংশ নিয়েছে।
অস্ট্রেলীয় চিকিৎসক ড. জিওফ্রে ডেভিস উনি যখন রেড ক্রস থেকে বাংলাদেশের হাসপাতালে এসেছিলেন একাত্তরের পরবর্তী  বীরাঙ্গনাদের সহায়তা দেবার জন্য। দেশজুড়ে তার চিকিৎসা কার্যক্রম পরিচালনার অভিজ্ঞতায় এবং উত্তরাঞ্চলের কয়েকটি জেলায় চালানো নমুনা জরিপের মাধ্যমে পরিসংখ্যান তৈরি করে জানান, ৪ থেকে ৪ লাখ ৩০ হাজার নারী মুক্তিযুদ্ধে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন।
তিনি আরো জানান, অন্তঃসত্ত্বা মহিলার সংখ্যাই ২ লাখ।১৯৭২ সালে মার্চ থেকে ছয় মাস বাংলাদেশের হয়ে কাজ করেছেন অস্ট্রেলিয়ার চিকিৎসক ড. জেফ্রি ডেভিস। এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান- “ধনী ও সুন্দরী মেয়েদেরকে অফিসারদের জন্য রেখে দেয়া হতো আর বাকিদের অন্যান্য সাধারন সৈন্যদের মধ্যে বন্টন করে দেয়া হতো। আর মেয়েদেরকে দারুণ কষ্টে ফেলে দেয়া হতো। তাদেরকে পর্যাপ্ত খেতে দেয়া হতো না। অসুস্থ হয়ে পড়লে তাদের চিকিৎসা দেয়া হতো না। অনেকেই ক্যাম্পের মধ্যে মারা গেছে।”

আবার এসেছে সেই মার্চ,  নৃশংস পাকিস্তানী জানোয়ারদের বাংলাদেশের নিরস্ত্র মানুষের ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়ার মাস, প্রতিরোধ  আর স্বাধীনতার মাস, এই মাসেই বিদায় নিলেন প্রজন্মের কাছে স্পষ্টবাদিতা ও সাহসিকতার নিদর্শক, আমাদের একজন পরম শ্রদ্ধেয় মা কিন্তু যতদিন এই বাংলাদেশ থাকবে তাদের আদতে কোনো মৃত্যু নেই ।

ইতিহাস কথা কয়, ইতিহাসকে কথা বলতে দাও

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের দলিলপত্রের অষ্টম খণ্ডে পাকিস্তানি সৈন্যদের নির্যাতনের বেশ কিছু বিবরণ নথিবদ্ধ করা হয়েছে প্রত্যক্ষদর্শী ও নির্যাতনের শিকারদের জবানিতে ।

নির্যাতনের জন্য অধিকাংশ ক্ষেত্রে যে পদ্ধতি পাকিস্তানি সামরিক কর্মকর্তা ও সাধারণ সৈন্যরা গ্রহণ করত তা হচ্ছে-১. অশ্লীল ভাষায় গালাগালি, সেই সঙ্গে চামড়া ফেটে রক্ত না বেরুনো পর্যন্ত শারীরিক প্রহার ২. পায়ের সঙ্গে দড়ি বেঁধে ঝুলিয়ে রাখা, বেয়নেট দিয়ে খোঁচানো ও রাইফেলের বাঁট দিয়ে প্রহার ৩. উলঙ্গ করে ঘণ্টার পর ঘণ্টা উন্মুক্ত স্থানে দাঁড় করিয়ে রাখা ৪. সিগারেটের আগুন দিয়ে সারা শরীরে ছ্যাঁকা দেওয়া ৫. হাত ও পায়ের নখ এবং মাথার ভেতরে মোটা সুচ ঢুকিয়ে দেওয়া

৬. মলদ্বারের ভেতরে সিগারেটের আগুনে ছ্যাঁকা দেওয়া, বরফ খণ্ড ঢুকিয়ে দেওয়া ৭. চিমটি দিয়ে হাত ও পায়ের নখ উপড়ে ফেলা ৮. দড়িতে পা বেঁধে ঝুলিয়ে মাথা গরম পানিতে বার বার ডোবানো ৯. হাত-পা বেঁধে বস্তায় পুরে উত্তপ্ত রোদে ফেলে রাখা ১০. রক্তাক্ত ক্ষতে লবণ ও মরিচের গুঁড়া ছড়িয়ে দেওয়া ১১. নগ্ন ক্ষতবিক্ষত শরীর বরফের স্লাবের ওপর ফেলে রাখা ১২. মলদ্বারে লোহার রড ঢুকিয়ে বৈদ্যুতিক শক দেওয়া ১৩. পানি চাইলে মুখে প্রস্রাব করে দেওয়া ১৪. অন্ধকার ঘরে দিনের পর দিন চোখের ওপর তীব্র আলোর বাল্ব জ্বালিয়ে রেখে ঘুমোতে না দেওয়া ১৫. শরীরের স্পর্শকাতর অংশে বৈদ্যুতিক শক প্রয়োগ প্রভৃতি।

অস্ট্রেলিয়ান ডাক্তার জিওফ্রে ডেভিস র মন্তব্যে পাওয়া যায়, তারা তাদের পদাতিক বাহিনীকে পেছনে রেখে গোলন্দাজ বাহিনীকে সামনে নিয়ে আসত। তারপর হাসপাতাল, স্কুল-কলেজে গোলা ছুড়ে গুড়িয়ে দিত। এরফলে শহরে নেমে আসত চরম বিশৃঙ্খলা আর তারপর পদাতিক বাহিনী শহরে ঢুকে পড়ে মেয়েদের বেছে বেছে আলাদা করত। শিশু ছাড়া যৌনভাবে ম্যাচিওরড সকল মেয়েকে তারা একত্রে জড়ো করত। আর শহরের বাকি লোকজনকে বন্দী করে ফেলত পদাতিক বাহিনীর অন্যরা। আওয়ামী লীগের সঙ্গে যুক্ত সবাইকে গুলি করে মেরে ফেলা হতো। আর তারপর মেয়েদের পাহারা দিয়ে কম্পাউন্ডে নিয়ে এসে সৈন্যদের মাঝে বিলিয়ে দেয়া হতো। অত্যন্ত জঘন্য একটা ব্যাপার ছিল এটা। বিশ্বের কোথাও কখনও এমন ঘটনার নজির পাওয়া যায় না। তবুও, এমনটাই ঘটেছিল।’

'পূর্বতন সিলেটে ৩০ হাজার বীরাঙ্গনার সন্ধান । এ অঞ্চলের চা বাগানগুলোর মহিলা শ্রমিক, তাদের যুবতী ও কিশোরী কন্যাগণ, মনিপুরী ও খাসিয়া মহিলারা ব্যাপক হারে নির্যাতনের শিকার হন। সিলেট শহর, বালাগঞ্জের বুরুঙ্গা, আদিত্যপুর, শ্রী রামসী, শেরপুর, পীরপুর, পীরনগর, করিমগঞ্জ সীমান্ত ও হাওড় এলাকা, সুনামগঞ্জের হাওড় এলাকা, মৌলভীবাজার শহর, রাজনগর, সাধুহাটি, কমলগঞ্জ থানার শমসের নগর, মনিপুরীদের বিভিন্ন গ্রামের অধিকাংশ বাড়ি এবং হবিগঞ্জের চুনারুঘাট, শায়েস্তাগঞ্জসহ বিভিন্ন থানার গ্রামের প্রতিটি বাড়িতে হামলা চালিয়ে পাকিরা অসংখ্য নারীকে ধর্ষণ করে।

এ ছাড়া টাঙ্গাইলের ভুয়াপুর থানার ছাব্বিশাসহ বিভিন্ন গ্রাম, বরিশালের গৌরনদী থানার প্রায় সব গ্রাম, আগৈলঝাড়ার রাজিহার, চেতনার কোলা গ্রামসহ সমগ্র বরিশালে পাকিস্তানী সেনাবাহিনী ব্যাপক নির্যাতন চালায়।’

“রাজাকাররা তাদের কর্মকাণ্ড এখন হত্যা ও চাঁদাবাজিতেই আটকে রাখেনি, এখন তারা বেশ্যালয়ও খুলেছে। চট্টগ্রামের আগ্রাবাদে তারা একটি শিবির খুলেছে যেখানে অল্পবয়সী সুন্দরী মেয়েদের আটকে রাখা হয়েছে, রাতে পাকবাহিনীর অফিসারদের সরবরাহ করা হয় তাদের। এছাড়াও প্রতিদিনই অনেক মেয়ে অপহরণ করছে তারা নিজেদের জন্যও, এদের অনেকেই আর ফিরে আসেনি…”
-সানডে টাইমসঃ ২০ জুন ১৯৭১

ওয়ার ক্রাইমস ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটির তথ্য মতে, ধর্ষণ, গণধর্ষণ ও বন্দি নির্যাতিতের সংখ্যা ৪ লাখ ৬৮ হাজার। অন্তঃসত্ত্বা নারীর সংখ্যা ১ লাখ ৮ হাজার। নির্যাতিত নারীর মধ্যে ৫৬.৫০ শতাংশ ছিলেন মুসলিম, হিন্দু ৪১.৪৪ এবং খ্রিস্টান ও অন্যান্য ২.০৬ শতাংশ। গবেষণায় স্পট ধর্ষণ ও গণধর্ষণের হার ৭০ শতাংশ এবং ক্যাম্পে রেখে নির্যাতনের ১৮ শতাংশ বলা হয়েছে।

একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের  বিজয় কাহিনী যেভাবে মানুষের কাছে উঠে এসেছে তার সামান্য খন্ড হিসাবেও সমগ্র দেশের  নারী পুরুষের ওপরে পাশবিক নির্জনের ধরণ ধারণ উঠে আসেনি ,পুরুষের চাইতে হাজার গুন্ বেশি নারীর ওপরে নৃশংস নির্যাতনের ব্যাপকতা সেভাবে বিভাগ - জেলাওয়ারি - থানা পর্যায়ের ভিত্তিতে  কিছুই আসেনি ।

একাত্তর সালে পাকিস্তানী সৈন্যদের দ্বারা নারী ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনের বৈশিষ্ট্য পৃথিবীর তাবৎ অসুস্থ অত্যাচারীদের হার মানিয়েছিল, পাকিস্তানী সৈনিক ও অফিসাররা নারী ধর্ষণ করেই থেমে থাকেনি, ধর্ষণের পরে পায়ুপথ ও যোনিপথে বেয়োনেট দিয়ে খুঁচিয়ে এহেন নৃশংস ত্যাচার চালায় যে এই নারীদের অনেকেরই প্রজনন ক্ষমতাও নষ্ট হয়ে গিয়েছিল।

মুক্তিযুদ্ধ একাত্তর সালের  একমাত্র ঘটনা নয়, মুক্তিযুদ্ধে  এদেশের মানুষের  সত্তা যেমন আক্রান্ত হয়েছিল তেমনি নারীসত্তাকে দলিত ও ধ্বংস করাটাও লক্ষ্য ছিল। মুক্তিযুদ্ধে নারী আক্রান্ত হয়েছিলেন, যোদ্ধা হিসাবে, মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তাকারী হিসাবে, মুক্তিযোদ্ধাদের খোঁজ না পেয়ে পরাজয়ের গ্লানি  মেটানোর লক্ষ্যবস্তু হিসাবে,  মা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্মদাত্রী হিসাবে ।

নিউজ উইকের সাংবাদিক টনি ক্লিফটন উল্লেখ করেছেন, ‘আমি দেখতে পাই যে, আক্ষরিক অর্থে মানুষ বোবা হয়ে গেছে, যখন পাকিস্তানী সৈন্যরা তাদের চোখের সামনে বাচ্চাদের হত্যা করেছে এবং মেয়েদের উঠিয়ে নিয়ে গেছে তাদের ভয়ঙ্কর যৌন পরিতৃপ্তির জন্য। পূর্ব পাকিস্তানে শত শত মাইলাই এবং লেডিসির মতো নৃশংসতা সংঘটিত হয়েছে সে ব্যাপারে আমার কোনই সন্দেহ নেই।’

নিউজউইকের সিনিয়র সম্পাদক এ্যারমাউড ডি ব্রোচ গ্রেভ : ‘পাকিস্তান সেনাবাহিনী সাম্প্রতিক বিদ্রোহীদের খুঁজতে আসার ভান করে ডেমরা গ্রাম ঘেরাও করে। তারপর ১২ থকে ৩৫ বছর বয়সী সকল নারীকে ধর্ষণ করে এবং ১২ বছরের বেশি বয়সী সকল পুরুষকে হত্যা করে।’

নিউইয়র্ক টাইমসের সিডনি এইচ, শ্যেনবার্গ জানিয়েছিলেন  : ‘পাকিস্তানী সৈন্যরা প্রায় প্রতিটি সেক্টরেই বাঙালী মেয়েদের যৌনদাসী হিসেবে আটক রেখেছে। সৈন্যদের ব্যাংকারগুলিতে এসব মেয়েকে সারাক্ষণই নগ্ন অবস্থায় রাখা হতো। ডিসেম্বর মাসের ১৬ তারিখে পাকিস্তানী সেনারা আত্মসমর্পণের পর এসব নারীর অধিকাংশেরই ছিন্নভিন্ন দেহাবশেষ আবিষ্কৃত হয়।’

জন হেস্টিংস নামে এক মিশনারি বলেছিলেন, ‘পাকিস্তানী সৈন্যরা… মেয়েদের যোনিপথে বেয়নেট ঢুকিয়ে তাদের হত্যা করেছে।’ মেয়েদের মসজিদে আটকে রেখেও ধর্ষণ করা হয়েছে। সাতক্ষীরার একটি গ্রামের মসজিদ থেকে বেশ কিছু নগ্ন নারী উদ্ধারের পর এ ধরনের ঘটনা নজরে আসে।

সিলেট শহরে মূলত পাকিস্তানি বাহিনী ক্যাম্প স্থাপন করে শালুটিকরে অবস্থিত সিলেট এয়ারপোর্ট এবং রেসিডেন্সিয়াল কলেজেই (সিলেট ক্যাডেট কলেজ)। অনেকের মতে শুধুমাত্র শালুটিকরেই তিনশত লোকের ওপরে হত্যা করা হয়। সেখানকার নদী ঘাটটির নাম হয়ে গিয়েছিল ‘করাচি বন্দর’। নরহত্যার পাশাপাশি এই ক্যাম্পগুলো হয়ে ওঠে নারী নির্যাতনের প্রধান কেন্দ্রও। সাংবাদিকদের প্রতিবেদনে প্রকাশ, শালুটিকরে অবস্থিত এই ক্যাম্পগুলোতে পাকিস্তানি হেরেমের ছবিগুলো এখনো পাকিস্তানিদের বিকৃত রুচির পরিচয় বহন করে।

১৯৭১-এ মুজিবনগর থেকে অনেকগুলো পত্রিকা বের হতো। এই পত্রিকাগুলোতেও মেলে শালুটিকরে নারী ধর্ষণের ব্যাপকতার সাক্ষ্য। ‘সাপ্তাহিক বাংলা’র ১৬ সেপ্টেম্বর ইস্যুতে ‘আম্বরখানা কলোনী ও মডেল স্কুলে ৫ শতাধিক বাঙালী মেয়ে বন্দিনী’  শিরোনামে প্রকাশিত খবরেও স্পষ্ট পাওয়া যায় নারী নির্যাতনের দলিল।

“পাঁচ শতাধিক বাঙালী মেয়ে আজও সিলেট শহরের আম্বরখানা কলোনী ও শালুটিকর রেসিডেন্সিয়াল মডেল স্কুলে বন্দিনী হয়ে আছে। পাক সেনাদের সীমাহীন অত্যাচারে দুঃসহ তাদের জীবন। কিন্তু মরার কোন উপায় নেই। পরণের শাড়ীগুলি পর্যন্ত পশুরা ছিনিয়ে নিয়েছে। গলায় দড়ি দেবার পর্যন্ত উপায় নেই। পরণে সামান্য একটা জাইঙ্গা আর ব্রেসিয়ার।

অর্ধনগ্ন এই সব মেয়েদের উপর রোজই চলে পাশবিক বলাৎকার। দানবের পৌনঃপুনিক ধর্ষণে ওরা বিধ্বস্ত। দস্যুরা বস্ত্রের সঙ্গে সঙ্গে নিয়তই লুঠে নিচ্ছে ওদের মান সম্ভ্রম–কুমারীত্ব আর সতীত্বকে। বুকফাটা কান্না চার দেয়ালে বাধা পেয়ে ওদের কাছেই আবার ফিরে আসে। কে জানে তাদের মুক্তিকামী ভাই আর সন্তানেরা কবে তাদেরকে নরক যন্ত্রণা থেকে মুক্তি দিতে পারবে”। 

“শহরে পাক আর্মির প্রধান ঘাঁটি মডেল স্কুল, ক্যাডেট কলেজ প্রভৃতি জায়গায় আমরা অনুসন্ধানে গিয়েছি। আর্মির এই ঘাঁটি এবং ক্যাম্পগুলোতে আমরা গণহত্যার ও নারী নির্যাতনের আলামত পেয়েছিলাম। ক্যাম্পের একটা দেয়ালে রক্ত দিয়ে লেখা সেই বাক্যটি এখনও আমার চোখে ভাসে – “আমি আর বাঁচতে চাই না”। বিভিন্ন আলামত দেখে আমার মনে হয়েছে, মণিপুরী সম্প্রদায়ের মেয়েদেরই বেশী নির্যাতন করা হয়েছে। আমরা সেখানে মণিপুরী মেয়েদের প্রচুর স্কার্ট, টপস ও অন্যান্য পোশাক পড়ে থাকতে দেখেছি''। …

বালাগঞ্জের ইলাশপুর, কৈলাশপুর, শেরপুর, বুরুঙ্গা ও আদিত্যপুরে প্রতিটা জায়গায় নিরীহ মানুষদের হত্যা করার পর নারীদের ওপর পাকিরা শুরু করে তাদের বর্বরতা। রাজাকার সাদ মিয়ার সহযোগীতায় মাত্র আঠারো দিনের ব্যবধানে বুরুঙ্গাতে ৭৮ জন ও আদিত্যপুরে ৬৩ জন কে হত্যা করা হয়।

আদিত্যপুর গ্রামে গণহত্যা স্পটে তিনটি গুলি লাগা সত্ত্বেও বেঁচে যাওয়া শিবপ্রসাদ সেন চৌধুরী এক সাক্ষাৎকারে বলেন, “আমাদের প্রথমে যে ঘরে নিয়ে বন্দী করে রাখা হয়েছিল সেখান থেকে আমি মেয়েদের আর্তচিৎকার শুনেছি। বিভিন্ন নারী কন্ঠের চিৎকার শুনে মনে হয়েছে এখানে বহু নারীকে তারা নির্যাতন করেছে। এসব নির্যাতিত মেয়েদের মধ্যে এই গ্রামের সতীশের মেয়েরাও ছিল”।

স্বাধীনতার পর সুনামগঞ্জ পিটিআই-এর সম্মুখ প্রান্তরে যে বধ্যভূমির সন্ধান মিলে সেখানে শতাধিক কঙ্কাল পাওয়া যায়। এর মধ্যে ছিল বৃদ্ধ, যুবক, তরুণী ও যুবতীর লাশ। ক্যম্পের মধ্যেও পাওয়া যায় বিবস্ত্র অনেক মা-বোনের নিষ্প্রাণ দেহ।

সুনামগঞ্জের জয়কলস গ্রামের রাজাকার সাত্তার পুরো একাত্তর জুড়েই পাকিদেরকে প্রতিদিন একজন করে নারী সরবরাহ করত। তারা সে কাজকে বলত ‘খাসির চালান”। জামালগঞ্জ থানার পিস কমিটির সভাপতি আবুল মনসুর আহমদ ওরফে লাল মিয়ার একটা নিজস্ব প্রমোদতরী ছিল, নাম “ঝুনু এক্সপ্রেস”। এই তরী ব্যবহার করা হত পাকিদের লালসা নিবৃত্তির লক্ষ্যে। এর পর সে নারীদেরকে ভাসিয়ে দেয়া হত সুরমার পানিতে।

পাকিস্তানিরা বিয়ানীবাজারে ১৭ জন দালালের সমন্বয়ে গঠন করে মজলিশে শুরা, আবার সেই সদস্যদের আলাদা আলাদা দায়িত্ব ছিল। তবে এই ১৭ জনের মধ্যে পাকিস্তানীদের কাছে সবচেয়ে প্রিয় ছিল আবদুল হক ওরফে “কুটুমনা”। তার এই জনপ্রিয়তার কারণ একটাই, অবাধে নারী সরবরাহ এবং পাকিদের মতোই নারীভোগে আসক্তি।

সে এলাকার একজন মুক্তিযোদ্ধা জানিয়েছিলেন, ১৬ ডিসেম্বর দেশে ফিরে তিনি ৪০০ জন নির্যাতিতা নারীকে চিকিৎসা করান, যাদের বেশীরভাগই কুটুমনার হাতে নির্যাতিত। বিয়ানীবাজারের আরেক দালাল শান্তি কমিটির সদস্য মৌলানা ছমির উদ্দীন জানান, ‘বিয়ানীবাজারে অসংখ্য নারী নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে। আর এ সব কাজের নেতা ছিল কুটুমনা। নিজে সে নারীদেহ ভোগ করত, পাকিস্তানি মিলিটারীদের সরবরাহ করতো এবং সে ব্যবসায়ে টাকাও কামাতো দু’হাতে”।

২০১১ সালের তথ্য অনুসারে কুটুমনা বর্তমানে লন্ডনে থাকে এবং সেখানে এক মসজিদে নিয়মিত ইসলামের সবক প্রদান করে। 

সিলেটের প্রতিটা চা বাগানে গণহত্যার পাশাপাশি চালানো হয় ব্যাপক নারী নির্যাতন। তারাপুর চা বাগানে গণহত্যা চালানোর পর আর্মি এসে তুলে নিয়ে যায় বাগানের মালিক রাজেন্দ্রলাল গুপ্তের তিন মেয়েকে। পরে ক্ষতবিক্ষত দেহে তিন বোনকে নামিয়ে দিয়ে যায়।

পার্বতী বুনারজী তখন কালাগুল চা বাগানে স্বামী সন্তান সহ সবাইকে নিয়ে কাজ করতেন। এক মধ্যরাতে পাকি আর্মিরা তাদের ঘরে ঢুকে। তিনি বলেন,“সে রাতে একজন আর্মিই আমার ঘরে ঢুকেছিল। সে ঢুকেই ঘরের দরজা ঠেলে বন্ধ করে দিয়েছিল। … আমার স্বামীর সঙ্গে ঐ মিলিটারির খুব ধস্তাধস্তি হয়। …

শেষ পর্যন্ত আমার স্বামী আমার শরীরের ওপর শুয়ে পড়ে আমাকে আগলাতে চেষ্ট করেছেন। কিন্তু শেষ রক্ষা করতে পারেন নি। ওরা জোর করে আমাকে নির্যাতন করেছে।আমাকে ছাড়াও কালাগুল চা বাগানের আরও অনেক মহিলাকে পাকি আর্মিরা সে সময় নির্যাতন করেছিল। আমার সামনের ঘরের এক মহিলাকেও তারা বেইজ্জত করেছিল। দু’টো বউ ছিল ঐ বাড়িতে। একজন তো ভয়ে নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়ে  নিজের ইজ্জত রক্ষা করেছে। আর একজনকে তারা ধরে ঘরের ভেতর নিয়ে নির্যাতন করেছে…।”

শ্রীমঙ্গলের হরিণছড়া, খেজুরিছড়া ও ফুলছড়া- এই তিনটি বাগানেই কমপক্ষে একশ জন নারী পাকবাহিনীর হাতে ধর্ষিত হন।

চুনারুঘাটের সুপ্রিয়া নায়েক তখন লষ্করপুর বাগানের থাকতেন। ৭১-এ তার বয়স ছিল ১৬ বছর। পাকি জানোয়াররা তাদের বাড়িতে ঢুকে তাকে তুলে নিয়ে যায় ক্যাম্পে।“বিভিন্ন ক্যাম্পের আর্মি অফিসাররা এই বাংলোর ক্যাম্পে এসে আমাকে ধর্ষণ করতো। প্রতিরাতে চার-পাঁচজন করে পাকি আর্মি আমাকে উপর্যুপরি ধর্ষণ করেছে। কোন রাতেই তারা আমাকে নিষ্কৃতি দেয়নি।” বন্দী কয় মাসে অন্তত ৫০ জনের মতো পাকিস্তানি অফিসার তাকে ধর্ষণ করে।

ভাড়াউড়া চা বাগানে ভয়ংকর নারী নির্যাতন চালানো হয়। শুধুমাত্র এই চা বাগানেই ৪৫ জন নারী আর্মিদের ধর্ষণের শিকার হন। সেই ধর্ষণের বিভৎসতা ফুটে উঠে গণহত্যা থেকে সৌভাগ্যক্রমে বেঁচে যাওয়া কেদারলাল হাজরার কথায়, “এমনকি ৫০-৬০ বছরের বৃদ্ধাও তাদের হাত থেকে রেহাই পাননি।”

সাফিয়া খাতুন। তাঁর জন্ম কুমিল্লার শিদলাই গ্রামে; দারিদ্র্যের কষাঘাতে পিষ্ট সাফিয়া বাবা-মার সাথে শৈশবে পাড়ি জমান মৌলভীবাজারে। যুদ্ধের বছর সাতেক আগে বিয়ে হয় সাফিয়ার। স্বামী আর দেবরের সাথে যুদ্ধের সময় মুক্তিবাহিনীকে সাহায্য করতেন; রান্না করে খাওয়াতেন মুক্তিবাহিনীকে।

স্থানীয় দালালদের সহায়তায় তার বাড়িতে একদিন হাজির হয় পাকিস্তানী সেনাবাহিনী ,  আশ্বিন মাস। স্বামী সন্তানদের নির্যাতন করে ফেরার সময় গাড়িতে করে নিয়ে চলে যায় সাফিয়াকে।  ক্যাম্পে তাকে রাখা হয় আরো ১২ দিন। এতিনি নিজের মুখে বলেন,“কিতা কইতাম লজ্জার কথা। মনে অইলে গা শিউরে উঠে। ঐদিন রাত ১০ টায় পাঁচজন পাক সৈন্য এসে আমাকে উলঙ্গ হতে বলে। আমি দুই হাত দিয়ে শাড়ি সমেত শরীরডারে শক্ত কইরা ধরি। আমারে লাত্থি দিয়া একজন মাটিতে ফালাই দেয়। এদের সবাই আমার সাথে সেই রাতে খারাপি করে। আমারে রক্তাক্ত কইরা চইলা যায়। সেই রাতে আমি চোখের জলে বুক ভাসাইছি। আর আল্লারে ডাকছি, আল্লাহ আমারে নেওনা কেনেরেবা। হেরা বুলে পাকিস্তানি, হেরা বুলে মুসলমান!”

নারীর মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ পর্যন্তই আমরা কিছুটা জানি, কিন্তু নারী নির্যাতন - ধর্ষণ গণধর্ষণের আকার প্রকার বিস্তারিত নিয়ে খুব কম জানি, কম  ভাবি, এজন্যেই  স্বাধীনতা শব্দটি নতুন প্রজন্মের কাছে যতটা বিজয় আর নতুন ভূখণ্ড প্রাপ্তি ততটা নয় বিষাদ আর ঘেন্নায় মোড়া, রক্ষণশীল সমাজ সেই ত্যাগের চিত্র কম তুলে ধরেছে, ফলে প্রজন্মের মানুষের কাছে অচেনা থেকে গেছে পাকিস্তানী সেনাবাহিনী আর তাদের এদেশীয় দোসর রাজাকার আল বদর, আলশামস, শান্তিবাহিনী  আর জামাতি ইসলামীর একাত্তরের জঘন্যতম বর্বরতার কোটি কাহিনী আর তাদের প্রকৃত চেহারা  !

সেই হেতু প্রশ্ন তৈরী করার রাস্তা তৈরী করে দেয়া হয়েছে লক্ষ লক্ষ নারীর আত্মত্যাগ নিয়ে, নারী পুরুষের ওপরে সেই সময়কার নির্যাতনের চেহারা যত স্পষ্ট হবে তত গভীরতা পাবে একাত্তরের মূল্য এবং তত চেনা যাবে পাকিস্তানী হানাদার ও হানাদার প্রেমিকদের মন মানসিকতার  পরিচয় !

তথ্যসূত্র  : ডক্টর নীলিমা ইব্রাহিমের 'আমি বীরাঙ্গনা বলছি', অধ্যাপক মুনতাসির মামুনের ‘বীরাঙ্গনা একাত্তর’, অপূর্ব শর্মা’র ‘বীরাঙ্গনা কথা’- তাজুল মোহাম্মদ ‘সিলেটে গণহত্যা’, যুদ্ধ ও নারী - ডা. এম এ হাসান, নিউজ আর্কাইভ