আল কাদেরি জয় লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
আল কাদেরি জয় লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

রবিবার, ২৬ মে, ২০১৯

ভ্রমনগড়ের কেচ্ছা(২)- মহাস্থান গড়ঃ

অনেকদিন পর উত্তরবঙ্গে গিয়েছিলাম।একসময়ের বঙ্গ জনপদের রাজধানীখ্যাত বগুড়ায়..! আজ্ঞে না বেড়াইতে নয়, দই খাইতেও নই! গেছিলাম বক্তৃতা দিতে ও নেতৃত্ব ঠিক করতে।তই আইসাই যেহেতু পড়ছি তাইলে আর খালি সাতরাস্তার মোড়ে ক্যান! আগে থেইক্যা যেহেতু Shamol বুঝছিলো- এইলোকরে নিয়া না ঘুরতে গেলে কি যে আকথা আর কুকথা কইবো- তাই প্রোগ্রামের পর রাখা হইলো বেড়ানোর আর চড়কির মতন ঘুরানোর ইভেন্ট!

দক্ষিন-পূর্বাঞ্চলের মানুষ হিসেবে এই উত্তরের জনপদ নিয়া চাক্ষুস জ্ঞান এক্কেবারে গোড়ালিতে। তাই ভাবলাম একবার যদি বেড়াই লইতে পারি তইলে গুরু ভানুর মতন একখানা কেচ্ছাও বানান যাইবো! তাই শেষমেশ শুরু হইলো মহাস্থান গড়ের দিইকা মহাযাত্রা...!
সাথে ছিলো নব্য সভাপতি ধনঞ্জয়, সাধারণ সম্পাদক শহিদুল্লা,বিদায়ী ও সদ্য  বিবাহিত(!) সম্পাদক মাসুকুর🤣সহ আরো কয়েকজন সহযাত্রী!

শুরুতেই ছিলো কিছু বড় মিসটেক!ক্লান্তি ও ব্যস্ততাজনিত কারণে সময়টাকে ঠিক ধরা যায় নাই। যখন পৌঁছাইলাম দেখি মিউজিয়ামটাই বন্ধ! ফলে মহাস্থান গড়ের সংগ্রহীত ও গবেষণার প্রত্নতাত্ত্বিক বিষয়গুলো জানা হয় নাই! তাইলে কি অভিযান ব্যর্থ ঘোষিত হয়বেক! না এ হইতেই পারে না!
" বিনা দর্শনে নাহি দিবো সূচাগ্র পুণ্ড্রনগরী!" কিন্তু হায় সামর্থ্যতিরিক্ত দর্শনীর বিনিময়েই কেবল তাহা সম্ভব! অবশেষে অনেক কসরত কইরা আর পাশের জমির আঁইল দিয়া এবং বেড়াবেষ্টনী টপকাইয়া ঢুইকা পড়লাম আড়াই হাজার বছরের পুণ্ড্ররাজ্যে!

মহাস্থানগড় বাংলাদেশের একটি অন্যতম প্রাচীন পুরাকীর্তি। প্রসিদ্ধ এই নগরী ইতিহাসে পুণ্ড্রবর্ধন বা পুণ্ড্রনগর নামেও পরিচিত ছিল।এক সময় মহাস্থানগড় বাংলার রাজধানী ছিল। যিশু খ্রিষ্টের জন্মেরও আগে অর্থাৎ প্রায় আড়াই হাজার বছর পূর্বে এখানে সভ্য জনপদ গড়ে উঠেছিল প্রত্নতাত্ত্বিক ভাবেই তার প্রমাণ মিলেছে।
প্রাচীর বেষ্টিত এই নগরীর ভেতর রয়েছে বিভিন্ন আমলের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন। কয়েক শতাব্দী পর্যন্ত এ স্থান পরাক্রমশালী মৌর্য, গুপ্ত, পাল ও সেন শাসকবর্গের প্রাদেশিক রাজধানী ও পরবর্তীকালে হিন্দু সামন্ত রাজাদের রাজধানী ছিল। তৃতীয় খ্রিষ্টপূর্বাব্দ থেকে পঞ্চদশ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত অসংখ্য হিন্দু রাজা ও অন্যান্য ধর্মের রাজারা রাজত্ব করেন।
মহাস্থানগড়ের অবস্থান বগুড়া জেলার শিবগঞ্জ উপজেলায় ।বগুড়া শহর থেকে প্রায় ১৩ কি.মি. উত্তরে করতোয়া নদীরপশ্চিম তীরে গেলে এই শহরের ধ্বংসাবশেষ দেখা যায়৷ মহাস্থানগড় বাংলাদেশের একটি প্রাচীনতম প্রত্নতাত্ত্বিক নগরী। খ্রিষ্টপূর্ব ৭০০ অব্দে এটি পুণ্ড্র রাজ্যের প্রাচীন রাজধানী ছিল।

তই এই রাজধানী দেখতে এইভাবে টিকেট না কাইটা কেবল আমরাই ফার্স্ট আইছি বিষয়টা ঠিক না; তারও আগে বিখ্যাত চীনা পরিব্রাজক হিউয়েন সাঙ ৬৩৯ থেকে ৬৪৫ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যবর্তী সময়ে পুন্ড্রনগরে আসছিলেন!তিনিও সেসময় টিকেট কাটেন নাই!
তাঁর ভ্রমণের ধারাবিবরণীতে তিনি তখনকার প্রকৃতি ও জীবনযাত্রার উল্লেখ করে বর্ণনা দেন। বৌদ্ধ শিক্ষার জন্য প্রসিদ্ধ হওয়ায় চীন ও তিব্বত থেকে ভিক্ষুরা তখন  মহাস্থানগড়ে আসতেন লেখাপড়া করতে৷ এরপর তাঁরা বেরিয়ে পড়তেন দক্ষিণ ও পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে। সেখানে গিয়ে তাঁরা বৌদ্ধ ধর্মের শিক্ষার বিস্তার ঘটাতেন৷

এই পুন্ড্রনগরের প্রাচীন ইতিহাস কেবল ক্ষমতা বদলের ও রাজ্য দখলের...!
সেন বংশের শেষ রাজা লক্ষ্মণসেন (১০৮২-১১২৫) যখন গৌড়ের রাজা ছিলেন তখন এই গড় অরক্ষিত ছিল।সে সময় মহাস্থানের রাজা ছিলেন নল যার বিরোধ লেগে থাকত তার ভাই নীল এর সাথে। এসময় ভারতের দাক্ষিণাত্যের শ্রীক্ষেত্র নামক স্থান থেকে এক অভিশপ্ত ব্রাহ্মণ এখানে আসেন। তিনি পরশু বা কুঠার দ্বারা মাতৃহত্যার দায়ে অভিশপ্ত ছিলেন। পরবর্তীতে তিনিই এই দুই ভাইয়ের বিরোধের অবসান ঘটান এবং রাজা হন। এই ব্রাহ্মণের নাম ছিল রাম। ইতিহাসে তিনি পরশুরাম নামে পরিচিত।
তবে ক্ষমতা চিরকালই হয় পদ ও হাতবদলের যাত্রার মতন।এখানেই ঘটে ইতিহাসের কিছু তুঘলকি ও ভীমরতি কাজকারবার। পরশুরামের এই রাজত্বকালে ইসলাম ধর্ম প্রতিষ্ঠা করতে আসেন ফকিরবেশী আধ্যাত্মিক শক্তিধারী দরবেশ হযরত শাহ সুলতান মাহমুদ বলখী (র:) এবং তার শীষ্য। ধর্ম প্রচারক শাহ্ সুলতান বলখী (রঃ) সম্পর্কে রয়েছে আশ্চর্য কিংবদন্তি।কথিত আছে, তিনি মহাস্থানগড় অর্থাৎ প্রাচীন পুন্ড্রনগরে প্রবেশ করার সময় করতোয়া নদী পার হয়েছিলেন একটা বিশাল মাছের আকৃতির নৌকার পিঠে চড়ে। তাই তাঁর আরেক নাম মাহী সওয়ার! মহাস্থানগড় পৌছে তিনি ইসলামের দাওয়াত দিতে থাকেন, প্রথমে রাজা পরশুরামের সেনাপ্রধান, মন্ত্রি এবং কিছু সাধারণ মানুষ ইসলামের বার্তা গ্রহণ করে মুসলিম হয়।এভাবে পুন্ড্রবর্ধনের মানুষ হিন্দু ধর্ম থেকে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করতে থাকলে রাজা পরশুরামের সাথে শাহ সুলতানের বিরোধ হয়।

পুণ্ড্রবর্ধনের রাজধানী মহাস্থানগড়ের অবস্থান বগুড়া শহর থেকে থেকে ১৩ কিলোমিটার(৬.৮ মাইল) উত্তরে বগুড়া রংপুর মহাসড়কের পাশে। মনে করা হয় এখানে শহর পত্তনের মূল কারণ এটি বাংলাদেশের একটি অন্যতম উচ্চতম অঞ্চল।'গড়' শব্দের অর্থ হলো 'উঁচু জায়গা'।এখানের ভূমি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৩৬ মিটার (১১৮ ফুট) উঁচু, যেখানে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে মাত্র ৬ মিটার (২০ ফুট) উঁচু। এছাড়া এই স্থানটি বেছে নেওয়ার আরেকটি কারণ হল করতোয়া নদীর অবস্থান ও আকৃতি।নদীটি ১৩ শতকে বর্তমান গঙ্গা নদীর তিনগুণ বেশি প্রশস্ত ছিল।মহাস্থানগড় বরেন্দ্র অঞ্চলের লাল মাটিতে অবস্থিত যা পলিগঠিত অঞ্চল হতে কিছুটা উঁচু। ১৫-২০ মিটার উপরের অঞ্চলগুলোকে বন্যামুক্ত ভূপ্রাকৃতিক অঞ্চল বলে ধরা যায়।

প্রাচীন শহরের কেন্দ্রেস্থিত দুর্গটি উপর থেকে দেখতে আয়তাকার ছিল যা উত্তর-দক্ষিণে ১.৫২৩ কিলোমিটার (০.৯৪৬ মাইল) ও পূর্ব-পশ্চিমে ১.৩৭১ কিলোমিটার (০.৮৫২ মাইল) পর্যন্ত বিস্তৃত। এর প্রতি পাশে উঁচু ও প্রশস্ত সুরক্ষা প্রাচীর ছিল। দুর্গের আয়তন প্রায় ১৮৫ হেক্টর।এককালের প্রশস্ত নদী করতোয়া এর পূর্বপার্শ্বে প্রবাহিত হত। ১৯২০ সাল পর্যন্ত খননকার্যের পূর্বে দুর্গের উচ্চতা আশেপাশের অঞ্চলের চেয়ে ৪ মিটার বেশি ছিল এবং বেশ কয়েকটি উঁচু মাটির আস্তরে দাগাঙ্কিত ছিল। রক্ষাপ্রাচীরটি কাদামাটির তৈরি প্রাচীরের মতো দেখতে যা বহু স্থানে বলপূর্বক ভাঙার চেষ্টা দেখা যায়।

প্রাচীরটি আশেপাশের অঞ্চলের চেয়ে ১১-১৩ মিটার (৩৬-৪৩ ফুট) উঁচু। এর দক্ষিণ-পূর্ব কোণে একটি মাজার ছিল। এছাড়া পরবর্তীকালের (১৭১৮-১৯) নির্মিত একটি মসজিদও রয়েছে। বর্তমানে দুর্গের ভিতরে কয়েকটি ঢিবি ও নির্মাণ নিদর্শন দেখতে পাওয়া যায়।এগুলোর মধ্যে জিয়ত কুণ্ড (একটি কূপ যাতে জীবন প্রদানের শক্তি আছে বলে বিশ্বাস করা হয়)।সাইনবোর্ডের লেখায় শোনা যায়- এইখানে রাজা পরশুরামে মৃত সৈনিকদের পুনঃজীবিত করা হতো।কিন্তু সুলতান বলখী এইখানে নাকি একটুকরা গোরুর মাংস ফেইলা দিয়া এই কুপের শক্তি নষ্ট কইরা দেয়। ফলে পরশুরাম আর যুদ্ধে জিততে পারে না।
আহা রে! যদি এই গল্পখান সদ্য ভারতের লোকসভা বিজেতা নরইন্দ্র মোদী পায়তো(!) তাইলে নির্ঘাত তার শিবসেনাদের এই কূপে পাঠিয়ে দিয়া রাজা পরশুরামরেও ইলেকশনে খাড়া করায় দিতো..!✌
লোকশ্রুতি  আছে এই রকম আরেকটা জায়গা হয়লো গোকূলের মেধ। এইখানে বেহুলা-লক্ষীন্দরের বাসর ঘর ছিলো যেখানে সাপ ঢুইকা ছোঁ মারছিলো বইলা শোনা যায়।

বর্তমান মহাস্থান গড়ে আবিস্কৃত আরো বেশকিছু ধাপ বা খননকৃত জায়গা আছে, যেমন- (মানকালীর পবিত্র স্থান), পরশুরামের বাসগৃহ (রাজা পরশুরামের প্রাসাদ), বৈরাগীর ভিটা (সন্ন্যাসিনীদের আখড়া), খোদার পাথর ভিটা (ঈশ্বরকে অর্পিত প্রস্তরখণ্ড), মুনির ঘোন (একটি ক্ল্লো) প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য।
বিভিন্ন স্থানে কয়েকটি প্রবেশদ্বার রয়েছে যেমন কাঁটা দুয়ার (উত্তরে), দোরাব শাহ তোরণ (পূর্বে), বুড়ির ফটক (দক্ষিণে), তাম্র দরজা(পশ্চিমে )।উত্তর-পূর্ব কোণে কয়েকটি ধাপ (পরে সংযুক্ত) রয়েছে যা জাহাজঘাটা পর্যন্ত গিয়েছে।জাহাজঘাটার কিছুটা সামনে করতোয়া নদীর তীরে গোবিন্দ ভিটা (গোবিন্দের মন্দির) অবস্থিত। এর সামনে স্থানীয় জাদুঘর রয়েছে যেখানে উল্লেখযোগ্য কিছু নিদর্শন প্রদর্শিত হয়েছে।

নগরের চর্তুদিকের দুর্গকাঠামো ছাড়াও সেখানে প্রায় শখানেক ঢিবি ৯ কি.মি. ব্যাসার্ধের বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে ছড়িয়ে আছে। গোবিন্দ ভিটা, দুর্গের উত্তর পূর্ব কোণে অবস্থিত একটি মন্দির।মঙ্গলকোট, মহাস্থানগড় জাদুঘর থেকে ১.৬ কিলোমিটার দক্ষিণ বা দক্ষিণ পশ্চিমে অবস্থিত একটি মন্দির।গদাইবাড়ি ধাপ, খুল্লনার ধাপ থেকে ১ কিলোমিটার দক্ষিণে একটি মন্দির। তোতারাম পন্ডিতের ধাপ, দুর্গের ৪ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত একটি আশ্রম।নরপতির ধাপ (ভাসু বিহার), তোতারাম পণ্ডিতের ধাপ হতে ১ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত একগুচ্ছ আশ্রম।খুল্লনার ধাপে আছে আরেকটা মন্দির।

মহাস্থানগড়ের এই সকল ধ্বংসাবশেষ চিহ্নিত ও উদঘাটন করার ক্ষেত্রে একাধিক ব্যক্তির অবদান রয়েছে। ১৮০৮ খ্রিষ্টাব্দে ফ্রান্সিস বুকানন হ্যামিলটন প্রথম মহাস্থানগড়ের অবস্থান চিহ্নিত করেন।১৮৭৯খ্রিষ্টাব্দে ব্রিটিশ প্রত্নতত্ত্ববিদ আলেক্সান্ডার কানিংহাম প্রথম এই প্রাচীন ঐতিহাসিক নগরীকে পুন্ড্রবর্ধনের রাজধানীরূপে চিহ্নিত করেন। অনেক পর্যটক ও পন্ডিত ব্যক্তি,বিশেষত সি. জে. ও’ডোনেল, ই. ভি. ওয়েস্টম্যাকট ও হেনরী বেভারীজ এই শহরতলি এলাকাটি পরিদর্শন করেন এবং তাঁদের প্রতিবেদনে তা উল্লেখ করেন। ১৯৩১ খ্রিষ্টাব্দে প্রত্নতাত্ত্বিক খননে সন্ধান মেলে ব্রাহ্মলিপির। সেই লিপিতে পুণ্ড্রনগরের প্রাদেশিক শাসক সম্রাট অশোক দুর্ভিক্ষপীড়িত মানুষকে রাজভান্ডার থেকে খাদ্যশস্য ও অর্থ সহায়তা প্রদানের নির্দেশ দেন। এসব তথ্য উপাত্ত থেকে প্রসিদ্ধ এই নগরীর প্রাচীনতমের প্রমাণ মেলে।

এতোসব বলে তো গলাটাই শুকায় গেছে!শুকনা গলায় কি আর কটকটি ভিজে? তাই গড় প্রদক্ষিণ ও পর্যবেক্ষণ শেষে আমরা নেমে এলাম মাহী সওয়ার মাজার গেইট ধরে। সেইখানে ঘি-য়ে ভাজা মচমচে কটকটি খেয়ে রওনা দিবো বগুড়া শহরের দিকে।

ঘাড় ফেরাতেই মনে হলো কয়েকটি ছায়া হাত নাড়িয়ে বিদায় জানাচ্ছেন গড়ের দূরের ডিবিগুলো থেকে.. হঠাৎই মনে হলো এই ছায়াগুলো তো চেনা...!এতোক্ষণের বর্ণনার সেই চরিত্রগুলো.. রাজা পরশুরাম, সুলতান বলখী, সম্রাট অশোক,বেহুলা লক্ষীন্দর.. বিদায় পুণ্ড্রনগর!

রবিবার, ২৮ এপ্রিল, ২০১৯

ভ্রমণকেল্লার কড়চা-১ ঃ লালবাগের কেল্লা !

ঢাকায় ইদানিং প্রায়ই আসা হয়। তবে ঢাকা শহরে এই আসা-যাওয়া যতটা হয়,ততটা ঠিক দেখা ও বোঝা হয় না।সভা-সমাবেশের ব্যস্ততা,ট্রাফিক জ্যাম আর ঢাকা ছাড়ার তাড়ায় ঘাড়টা সোজাই থাকে আর ঘোরাফেরা করে না।একদিন হঠাৎই সুযোগ মিললো এই ঘাড়টা বাকাঁনোর,সাথে সাথে রগ দুইটাও কেমন জানি লাফিয়ে ও ফালিয়ে উঠলো।কিন্তু মুশকিল হলো-যাবো কই?আর কারেইবা কই?সবাই তো ব্যস্ত! বিকালবেলা টিউশনি,চাকরি, আর জানা-অজানা নানা কাজে ন্যস্ত! অনেক হাঁক ও ডাকের পর অবশেষে মিললো ঢাকা নগরের সভামণি রোকসানা আফরোজ আসা র সন্ধান।
তারে কইলাম-'চল! রাজধানী ঘুরি!'
সে কয়লো-'আহ!হা রে!এমন কইরা কয়লে কি আর করি!' আরো অনেকরে কল দিলাম।কিন্তু কাউরেই তো আর পাই না।বুঝলাম তাদের সন্ধান খোদাতায়ালাই পায় না আর আমি? অবশেষে সক্কলের কাছ থেইকা রিফিউজড হইয়া এই আমি রিফিউজি অভিমান আর অভিযান লইয়া চললাম।একমাত্র ভরসা পাশের আশা! কিন্তু ২য় প্রশ্নের উত্তর পাইলেও ১ম প্রশ্নের জবাব তো তখনো অজানা! অর্থ্যাৎ যাবো কই? একে তো ঢাকা শহর দেশের প্রধান কেন্দ্র তার সাথে আছে  জ্যামের যন্ত্র ও সময়ের যন্ত্রণা।অবশেষ দূরত্ব, সময় এবংতার সাথে সামর্থ্য-এই তিন বিবেচনাযোগে ঠিক হলো চার শতাব্দী আগে শায়েস্তা খাঁর আমলের তৈরি লালবাগ কেল্লায় একটা ঢুঁ লাগাইয়া আসি।এরমধ্যেই হঠাৎই আশার দূরালাপনি যন্ত্রে কান লাগাইয়া কথা হয়লো ইডেনের সেতুর সাথে। নাকি গলায় ক্যাঁনক্যাঁনে আওয়াজে সে দাগায়লো দূর্গে আগমনের ঘোষণা।বুঝলাম এই রিফিউজি মনের বিদ্রোহ ঠেকায়তে আজিমপুর থেইকা রওনা দিচ্ছেন!

১০ টাকার সম্মানীর বিনিময়ে অবশেষে হানা দিলাম লালবাগের কেল্লায়।জীবনে এই প্রথম কোনো দূর্গ দেখার ইচ্ছাপূরণ হয়লো। সুন্দর জায়গা। চারপাশে বেশ গুছানো ও পরিপাটি করে রাখা ফুলের বাগান আর তার মাঝে এই ঐতিহাসিক স্থাপত্য। বিকেলবেলায় লম্বা করিডোরের মতন টানা ফুলগাছ, ঘন সবুজ ঘাস আর ছোট ছোট গুল্মের সারির রাস্তাগুলো দিয়ে হেঁটে বেড়াতে বেশ লাগে।
জানা যায়-লালবাগের কেল্লা (কিলা আওরঙ্গবাদ) ছিলো ঢাকার দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে অবস্থিত একটি অসমাপ্ত মুঘল দুর্গ।সম্রাট আওরঙ্গজেবের ৩য় পুত্র, মুঘল রাজপুত্র আজম শাহ বাংলার সুবাদার থাকাকালীন ১৬৭৮ সালে এটার নির্মাণকাজ শুরু করেন। তিনি বাংলায় ১৫ মাস ছিলেন। দুর্গের নির্মাণ কাজ শেষ হবার আগেই মারাঠা বিদ্রোহ দমনের জন্য আওরঙ্গজেব তাকে দিল্লি ডেকে পাঠান।এসময় একটি মসজিদ ও দরবার হল নির্মাণের পর দুর্গ নির্মাণের কাজ থেমে যায়। সুবাদার শায়েস্তা খাঁ ১৬৮০ সালে পুনরায় বাংলার সুবাদার হিসেবে ঢাকায় এসে দুর্গের নির্মাণকাজ পুনরায় শুরু করেন। ১৮৪৪ সালে এলাকাটি "আওরঙ্গবাদ'' নাম বদলে "লালবাগ" নাম পায় এবং দুর্গটি পরিণত হয় লালবাগ দুর্গে ।

দূর্গের প্রধান ফটক দিয়া ঢুকতেই প্রথমেই চোখে লাগে একটা সুরম্য প্রাসাদবাড়ী।প্রথমে মনে করছিলাম এটাই বুঝি মূল কেল্লা! কিন্তু না.. আশার বরাতে আর পাশের সাইনবোর্ডের ইশারাতে বুঝলাম এটা হইলো পরীবিবির সমাধি।১৬৮৪ সালে এখানে শায়েস্তা খাঁর কন্যা পরিবিবির মৃত্যু ঘটে। কন্যার মৃত্যুর পর শায়েস্তা খাঁ এ দুর্গটিকে অপয়া মনে করেন এবং ১৬৮৪ খ্রিস্টাব্দে অসমাপ্ত অবস্থায় এর নির্মাণকাজ বন্ধ করে দেন।লালবাগের কেল্লার তিনটি প্রধান স্থাপনার একটি হল এই পরীবিবির সমাধি।শায়েস্তা খাঁর কন্যা পরীবিবি যার অন্য নাম ইরান দুখত রাহমাত বানু।মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেবের পুত্র শাহজাদা আজম শাহের সাথে ১৬৬৮ সালে পরীবিবির বিয়ে হয়। ১৬৮৪ সালে পরী বিবির অকালমৃত্যুর পর তাঁকে নির্মাণাধীন লালবাগ কেল্লার অভ্যন্তরে সমাহিত করা হয়। তাঁর সমাধিস্থলকে চিহ্নিত করে পরীবিবির মাজার নির্মিত হয়।"লালবাগ কেল্লা" বলতে যেই ছবিটি বেশী পরিচিত সেটাই পরিবিবির সমাধিস্থল।এই স্থাপনাটি চতুষ্কোণ। মার্বেল পাথর,কষ্টিপাথর ও বিভিন্ন রং এর ফুল-পাতা সুশোভিত চাকচিক্যময় টালির সাহায্যে অভ্যন্তরীণ নয়টি কক্ষ অলংকৃত করা হয়েছে। মাঝের একটি ঘরে পরীবিবির সমাধিস্থল এবং এই ঘরটি ঘিরে আটটি ঘর আছে। স্থাপনাটির ছাদ করবেল পদ্ধতিতে কষ্টিপাথরে তৈরি এবং চারকোণে চারটি অষ্টকোণ মিনার ও মাঝে একটি অষ্টকোণ গম্বুজ আছে।

এই পরিবিবির সমাধি ঘুরতে ঘুরতেই আশা দেখালো দূর্গের প্রাচীর ও জলাধার। জলাধারের ধরণ ও নির্মাণকৌশল দেখতে দেখতে অবাক হচ্ছিলাম আর মনে হচ্ছিল কি অদ্ভুত নির্মাণশৈলী! কিন্তু সাথে সাথে মনের গোধূলীতে প্রশ্ন উদয় হলো- এই জলাধার না হয় ইট সুরকি দিয়া রচিত হয়লো কিন্তু জলের উৎসটা কই? নিশ্চয়ই সে সময় পাম্প মাইরা তা চলতো না! তবে এর উত্তর পেয়ে যাই অনেকক্ষণ পর।সেটা আরেকটু পরেই কই...!

হাটঁতে হাঁটতে পুরো দূর্গটা দেখতে হয়তো
ঘন্টাখানেকের বেশি লাগে না। বিকেল কাটানোর জন্য চমৎকার একটা জায়গা।স্থাপত্য দর্শন ও ইতিহাসচর্চা - দুইয়ের মাঝে সেতু সংমিশ্রণ নিয়ে কথা বলতে বলতেই আমাদের মাঝে স্বশরীরে হাজির হইলো স্বয়ংসেতু!এমনিতেই তার বাড়ী হচ্ছে নোয়াখালী তার উপর আসা মাত্র একের পর এক হাসির গোলায় আমরা দুজন বিধ্বস্ত হয়ে পড়ছিলাম।আর সে দিচ্ছিলো কেল্লাফতের হাসি!

যাই হোক আবার আসি দূর্গের কিচ্ছায়। ধারণা করা হয়- লালবাগের দুর্গটি হচ্ছে তিনটি ভবন স্থাপনার সমন্বয়(মসজিদ,পরী বিবির সমাধি ও দেওয়ান-ই-আম), সাথে দুটি বিশাল তোরণ ও আংশিক ধ্বংসপ্রাপ্ত মজবুত দুর্গ প্রাচীর।
দেওয়ান-ই-আম ও হাম্মাম খানা মূলত সুবেদারের বাস ভবন হিসেবে ব্যবহার হত। কেল্লার এই দালান কে দুটি কাজে ব্যবহার করা হত।এক. হাম্মাম খানা(বাস ভবন হিসেবে) দুই.দেওয়ান-ই-আম (বিচারালয় হিসেবে)। এই দালানের নিচ তলায় ছিল বাস ভবন তথা হাম্মাম খানা আর উপরের তলা ছিল কোর্ট তথা দেওয়ানে-ই-আম। শায়েস্তা খাঁ এই ভবনে বাস করতেন এবং এটাই ছিল তার কোর্ট। এখান থেকে তিনি সমস্ত বিচার কার্য পরিচালনা করতেন।
শায়েস্তার খাঁর ভাবনা ভাবতে হঠাৎ দেখি আশা জানি কার লগে কথা কয়! শুনলাম দূর প্রান্ত থেইকা Rahatজীর গলা! সে কয়-"মিয়া আমারে ছাড়া তুমি ঢাকা শহরে ঘুইরা বেড়াও! খাড়াও আইসা লই..!"
মনে হইলো ৪০০ বছর আগের কামানটা কে জানি আবার চালু কইরা দিছে..রে!

বর্তমানে এই হাম্মামখানাটি একটা জাদুঘর হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এখানে আছে মুঘল আমলের বিভিন্ন দর্শনীয় সামগ্রী। দেয়ালে আছে হাতে আঁকা শায়েস্তার খাঁ ছবি, যুদ্ধের অস্ত্র, তীর,গোলা, বর্ম-শিরস্ত্রান, হাতে লেখা কোরআন শরীফের কপি।ঘরের ভেতরে রয়েছে গরম বাতাস ও জলে গোসল করার ঘর,প্রসাধনী ও বিশ্রামের ঘর। বুঝলাম মুঘলরা কেবল যুদ্ধ আর বিলাসিতা করতোই তা না ; এরজন্য বুদ্ধি খাটানোর কাজটাও করেছিলো সফলভাবে। এই জাদুঘরের দেয়ালে পুরান কেল্লার একটা ছবি দেখে হঠাৎই উত্তর পেয়ে গেলাম জলাধারের উৎসের প্রশ্নটি!
সেটা হলো-পুরান ঢাকার এই দূর্গের প্রাচীর ঘেঁষেই ছিলো আজকের সদরঘাটের বুড়িগঙ্গা নদী। এখান থেকেই সরাসরি অথবা পরিখা কেটে দূর্গের ভেতরে পানি সরবরাহের ব্যবস্থা চলতো! কালের বিবর্তনে তা দূরে সরে গেছে আর শুষ্ক করে দিয়েছে এর ইতিহাস ও জলাধার।

এই ইতিহাস বের করে অবশেষে কেল্লার তৃতীয় স্থাপনা তিন গম্বুজওয়ালা দুর্গ মসজিদ দেখার জন্য তিনজনই হাঁটতে লাগলাম। সূর্য তখন প্রায়ই হেলে পড়েছে পশ্চিমে। দূর থেকে পরিবিবির সমাধির গম্বুজে আলতো করে ছুঁয়ে পড়া সূর্যাস্তটা যেন জানিয়ে দিচ্ছে সেই ফুরিয়ে যাওয়া দিনগুলোর কথা।মসজিদের গঠনশৈলী প্রাচীন মুঘল স্থাপনারীতির এক আদর্শ উদাহরণ। শাহজাদা আজম বাংলার সুবাদার থাকাকালীন এই মসজিদ নির্মাণ করেছিলেন ১৬৭৮-৭৯ খ্রিষ্টাব্দে। আয়তাকারে নির্মিত তিন গম্বুজ বিশিষ্ট মসজিদটি।বর্তমানেও মসজিদটি নামাজের জন্য ব্যবহৃত হয়ে আসছে।

দূর্গের বর্ণনাটা পূর্ণ হবে না যদি না বলা হয় এর দূর্গপ্রাচীরের কথা।অসাধারণ স্থাপত্যের এই দুর্গ প্রাচীরের দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে একটি বিরাট বুরূজ ছিল। দক্ষিণস্থ দুর্গ প্রাচীরের উত্তরে ছিল কয়েকটি ভবন, আস্তাবল, প্রশাসনিক ভবন, এবং পশ্চিম অংশে জলাধার ও ফোয়ারা সহ একটি সুন্দর ছাদ-বাগানের ব্যবস্থা ছিল। আর আবাসিক অংশটি ছিল দুর্গ প্রাচীরের পশ্চিম-পূর্বে, প্রধানত মসজিদটির দক্ষিণ-পশ্চিমে।
বুরুজগুলোর ছিল একটি ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গ। কেল্লাটির কেন্দ্রীয় এলাকা দখল করে ছিল তিনটি প্রধান ভবন। পূর্বে দেওয়ান-ই-আম ও হাম্মাম খানা, পশ্চিমে মসজিদটি এবং পরী বিবির সমাধি দুটোর মাঝখানে এক লাইনে কিন্তু সমান দূরত্বে নয়। নির্দিষ্ট ব্যবধানে কয়েকটি ফোয়ারাসহ একটি পানির নালা ভবন তিনটাকে পূর্ব থেকে পশ্চিমে ও উত্তর থেকে দক্ষিণে সংযুক্ত করেছে।

দক্ষিণের দুর্গ প্রাচীরে নির্দিষ্ট ব্যবধানে ৫ টি বুরুজ ছিল উচ্চতায় দুই তালার সমান, এবং পশ্চিমের দুর্গ প্রাচীরে ছিল ২ টি বুরুজ যার সবচেয়ে বড়টি ছিল দক্ষিণস্থ প্রধান প্রবেশদ্বারে। এই বিষয়ে স্থপতি Subrata Sarker একটা অসাধারণ মন্তব্য করেন। তাঁকে ফেসবুকে ছবি দেখানোর পর বলেন-হাল আমলের প্রাচীরের চারপাশে তৈরি হওয়া ভবনগুলোর উচ্চতা নির্দ্ধারন করে দেয়া উচিত ছিলো। ভালো করে দেখলে বোঝা যাবে এসব বহুতল ভবনের কারণে প্রাচীরের সৌন্দর্যটাই মিইয়ে পড়েছে...।
স্থপতির চোখ বলে কথা!

অবশেষে সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসতে আসতে মাইকে বেজে উঠলো দর্শনার্থীদের বিদায়ের বাণী।হয়তো কোনো একদিন এমনই সন্ধ্যায় এই দূর্গে অস্তরাগের বিউগল বেজে উঠতো।চারশ বছর আগের সেই দিনগুলোর মতন আস্তে আস্তে আমরাও বের হয়ে এলাম- লালবাগ কেল্লার ইতিহাসের পাতা থেকে...!

বুধবার, ২০ মার্চ, ২০১৯

রোডমার্চ

তিস্তার পানির ন্যায্য হিস্যা আদায় করা ও মরুকরণের হাত থেকে উত্তরবঙ্গকে রক্ষা করার দাবিতে বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল-বাসদ-এর উদ্যোগে ২০-২১ মার্চ ২০১৯ দুইদিনব্যাপী বগুড়া থেকে তিস্তা ব্যারেজ পর্যন্ত রোডমার্চের উদ্বোধনী সমাবেশ ২০ মার্চ বেলা ১১ টায় বগুড়ার সাতমাথায় বাসদ বগুড়া জেলা আহ্বায়ক অ্যাড.সাইফুল ইসলাম পল্টুর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত হয়।

রোডমার্চের উদ্বোধন করেন বাসদ কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক সংগ্রামী জননেতা কমরেড খালেকুজ্জামান।আরো বক্তব্য রাখেন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ শ্যামল ভট্টাচার্য, বাসদ কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য কমরেড বজলুর রশিদ ফিরোজ,কমরেড রাজেকুজ্জামান রতন।নওগাঁ জেলার বাসদ সমন্বয়ক জয়নাল আবেদিন মুকুল,সিরাজগঞ্জ জেলা আহ্বায়ক নবকুমার কর্মকার,বগুড়া জেলা সদস্য সচিব সাইফুজ্জামান টুটুল,বাসদ নাটোর জেলা নেতা দেবাশীষ রায়,রাজশাহী জেলা সমন্বয়ক আলফাজ হোসেন যুবরাজ,শহিদুল ইসলাম,দিলরুবা নূরী,শ্যামল বর্মন,রাধা রানী বর্মনসহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ।

কমরেড খালেকুজ্জামান বলেন,“১২০০ নদীর দেশ বাংলাদেশ ভারতের ক্রমাগত পানি আগ্রাসন এবং সরকারের ভুল পানি ব্যবস্থাপনার কারণে আজ মরুভূমিতে পরিণত হওয়ার উপক্রম হয়েছে। ৫৭টি আন্তর্জাতিক নদী বাংলাদেশের ভিতর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে বঙ্গোপসাগরে পতিত হয়েছে যার মধ্যে ৫৪ টি এসেছে ভারতের মধ্য দিয়ে। ভারত ইতিমধ্যে ৫১ টি নদীতে বাঁধ দিয়ে পানি প্রত্যাহার শুরু করেছে এবং আন্ত:নদী সংযোগ প্রকল্পের নামে বাংলাদেশে চারদিকে বাঁধের মালা তৈরী করতে যাচ্ছে। ফারাক্কার প্রভাবে পদ্মা অববাহিকা পানির তীব্র সংকটে পড়েছে এখন আন্তর্জাতিক সমস্ত নীতিমালা একের পর এক লংঘন করে যাচ্ছে ভারত। বাংলাদেশ গড়ে উঠেছিল গঙ্গা ব্রহ্মপুত্রের পানি ও পলির প্রভাবে। ভারত কর্তৃক একতরফা পানি প্রত্যাহারের ফলে বাংলাদেশের ভূপ্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য আজ ধ্বংসের পথে।ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ার ফলে খাবার পানিতে আর্সেনিক দূষণ,কৃষিকাজ,মৎস্য সম্পদ ও নৌপরিবহন আজ হুমকীর মুখে।আমাদের দেশের সরকার ভারত কর্তৃক এই আন্তর্জাতিক নদী ও পানি নীতি এবং প্রকৃতি পরিবেশ বিনাশী কর্মকান্ডের যথাযথ প্রতিবাদ করতে শুধু ব্যর্থ হচ্ছে তাই নয় নতজানু নীতি নিয়ে চলছে যা বাংলাদেশের প্রকৃতির জন্য ভয়াবহ আর জাতি হিসেবে লজ্জার।”

তিনি আরো বলেন,“উত্তর বঙ্গের প্রধান নদী এবং বাংলাদেশের চতুর্থ বৃহত্তম নদী তিস্তা ও ভারতের পানি আগ্রাসনের শিকার। উজানে অসংখ্য বাঁধ, ব্যারেজ, জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করে ক্রমাগত একতরফা পানি প্রত্যাহারের ফলে খরস্রোতা তিস্তা আজ মৃতপ্রায়, পানি প্রবাহ সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁচেছে। ভারত কখনো কেন্দ্র কখনো রাজ্যের দোহাই দিয়ে প্রতারণামূলক আশ্বাসে বাংলাদেশকে পানিচুক্তি থেকে বঞ্চিত করছে।
বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল-বাসদ-সহ বিভিন্ন বাম প্রগতিশীল দল সমুহ দীর্ঘদিন ধরে অভিন্ন নদীর পানি বণ্টনে আন্তর্জাতিক উদ্যোগ গ্রহণের দাবি জানিয়ে আসছে। শাসক দলগুলোর কাছে ক্ষমতা দখল, অর্থনৈতিক লুটপাট ও রাজনৈতিক দমন পীড়নের বাইরে দেশ, জনগণ, নদী, বন এবং জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার কোনটাই গুরুত্ব পায় না। ফলে এই সর্বনাশ রুখতে জনগণকে ঐক্যবদ্ধভাবে লড়াই করতে হবে।”

উদ্বোধনী সমাবেশে বক্তারা বলেন “ভারত বাংলাদেশ সম্পর্ক নাকি সর্বকালের সবচেয়ে উন্নত পর্যায়ে আছে বলে শাসকবর্গ দাবি করছে কিন্তু ভারতের পানি আগ্রাসনে বাংলাদেশ বিপর্যস্ত। সীমান্তে কাটাতারের বেড়া,গুলিবর্ষণ আর আন্তঃসীমান্ত নদীর পানি থেকে বঞ্চিত করা কি বন্ধুত্বের নিদর্শন? বাংলাদেশের কৃষি, শিল্প, প্রকৃতি পরিবেশ বিনাশী তৎপরতা বন্ধে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন। মোদীর সাথে টেলিফোনে কথা হয় কিন্তু পানি নিয়ে কথা হয় না কেন তা জাতি জানতে চায়। বাংলাদেশের নদী ও পানি সংক্রান্ত সংকট মোকাবিলায় অববাহিকা ভিত্তিক তৎপরতা চালানো প্রয়োজন।
তিস্তার পানি ব্যবহার করে ১ লাখ ১০ হাজার হেক্টর জমিতে কৃষি উৎপাদনের যে পরিকল্পনা নেয়া হয়েছিল ভারতের পানি প্রত্যাহার করার ফলে তা আজ ভেস্তে যেতে চলেছে। ভারত বাংলাদেশের কাছ থেকে সব নেবে অথচ ন্যায্য পানির হিস্যা দেবে না এ অন্যায় মেনে নেয়া যায় না।"
বক্তারা সারাদেশের মানুষকে আজ ঐক্যবদ্ধভাবে পানির দাবিতে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।

উদ্বোধনী সমাবেশ শেষে একটি মিছিল বগুড়া শহর প্রদক্ষিণ করে রোডমার্চটি তিস্তা ব্যারেজ অভিমুখে যাত্রা শুরু করে। পথিমধ্যে রোডমার্চ মহাস্থানগড়, মোকামতলা, গোবিন্দগঞ্জ, পলাশবাড়ি, পীরগঞ্জ, শঠীবাড়ী, মিঠাপুকুর, সমাবেশ করে রংপুরে রাত্রীযাপন এবং ২১ মার্চ সকাল ১০টায় রংপুর পাবলিক লাইব্রেরি মাঠ, পাগলাপীর, বড়ভিটা, জলাঢাকা, চাপানীরহাট এ পথসভা শেষে তিস্তা ব্যারেজ সাধুর বাজার গিয়ে সমাপনী সমাবেশ অনুষ্ঠিত হবে।